
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। -সূত্র জাগো নিউজ।
প্যানেলের দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে রায় পড়া শুরু হয়। প্রায় ৩০ মিনিট ধরে ৫৫৭ পৃষ্ঠার রায়ের সংক্ষিপ্ত অংশ পাঠ করেন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান।
রায় পড়ার শুরুতেই ওবায়দুল কাদেরের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়। এরপর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলেরও মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন আদালত।
সবশেষ নিষিদ্ধ ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানেরও মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল। এ মামলার সব আসামিই পলাতক।
এর আগে গত ১৭ আগস্ট শুনানি শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মোহাম্মদ মিজানুল ইসলাম ও গাজি এমএইচ তামিম। মামলায় আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী ছিলেন আইনজীবী এম হাসান ইমাম ও আইনজীবী ইসরাত জাহান।
এর আগে মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি ও তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ চেয়েছেন প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষ)। আসামি পক্ষ থেকে তাদের খালাস চাওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে এই মামলায় আসামি ওবায়দুল কাদের, নাছিম ও আরাফাতের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী এম হাসান ইমাম। ছাত্রলীগ সভাপতি-সম্পাদক ও যুবলীগ সভাপতি-সম্পাদকের পক্ষে শুনানি করেন ইশরাত জাহান।
উভয় পক্ষের শুনানি ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ থাকার পর আজ রায় ঘোষণা হলো।
রায়ের পর চিফ প্রসিকিউটর ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া
চিফ প্রসিকিউটর জানান, রায়ে বলা হয়েছে, ‘আমাদের রুলস অ্যান্ড স্ট্যাটিউটসে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত করার বিধান আছে। এবারই প্রথম আমাদের ট্রাইব্যুনাল তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্ত করে। সেই ৫০ শতাংশ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে জুলাই ফাউন্ডেশন বা বিধিবদ্ধ কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শহীদ ও আহতদের মধ্যে বিলি-বণ্টনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
এরপর রায়ের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘আমরা এ রায়ে সন্তুষ্ট এবং মনে করি, এটি একটি প্রত্যাশিত রায় হয়েছে। আজ প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন, ২৫ হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। এই শহীদ ও আহতদের প্রতি আজ ন্যায়বিচার করা হয়েছে বলে আমরা মনে করি।’
আসামিপক্ষের আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া
রাষ্ট্রনিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী ইসরাত জাহান অনি বলেন, ‘সব সাক্ষ্য-প্রমাণ ও ডকুমেন্টের ওপর ভিত্তি করে আসামিদের খালাস করানোর জন্য আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি।’
আইন অনুযায়ী যেভাবে এগোনো যায়, সেভাবেই আর্গুমেন্ট ও জেরা করেছি। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল আমার চার আসামির বিভিন্ন অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড ও আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন।’
সাদ্দাম, ইনান, নিখিল ও পরশের আইনজীবী সাংবাদিকদের বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালের রায় মানতে আইনজীবী হিসেবে আমরা বাধ্য। ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার মতো ধৃষ্টতা আমাদের নেই। ট্রাইব্যুনালের রায় মানি, মান্য করি। কিন্তু আমি এই রায়ে সন্তুষ্ট নই।’
কাদের, নাছিম ও আরাফাতের আইনজীবী হাসান ইমাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা সর্বোচ্চভাবে চেষ্টা করেছি। জেরা করেছি, আর্গুমেন্ট করেছি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে প্রিন্সিপাল অব কমন রেসপনসিবিলিটির সুবিধা-অসুবিধা সবকিছু ট্রাইব্যুনালে ব্যাখ্যা করেছি। রায়ে আমাদের এসব বক্তব্য নেওয়া হয়েছে কি না, রায় না দেখে বলতে পারব না।’
আইনজীবী হাসান ইমাম বলেন, ‘আমি একজন জজ ছিলাম। সেই হিসেবে বলছি, বিচারপতিদের জাজমেন্টের বিরুদ্ধে কথা বলার কোনো এখতিয়ার আমাদের নেই, কিংবা বলার মতো ধৃষ্টতাও নেই। তবে আমিও এই রায়ে সন্তুষ্ট হতে পারিনি।’
আসামিদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ থাকলে হয়তো আরও ভালো করা যেত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। আইনজীবী বলেন, আসামিরা পলাতক, তাই ‘আপিলের সুযোগ নেই।’ তাই মন্তব্য করারও কোনো সুযোগ নেই।
মামলার বিবরণ
মামলায় ২০২৫ সালের ১৮ জুন থেকে তদন্ত শুরু হয়। একই বছরের ৭ ডিসেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করার পর ১৮ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে মোট সাতটি অভিযোগ আনা হয়। এরপর ওই দিনই আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল।
এরপর ২০২৬ সালের ২২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেন আদালত।
চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউশনের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের আনা মোট ২৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ২ আগস্ট শেষ করা হয়। এরপর মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয় ৪ আগস্ট।
এরপর ১৭ আগস্ট পর্যন্ত নয় কার্যদিবস মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আজ রায় ঘোষণা করা হলো।

