
প্রধান বিচারপতির এজলাস ছাড়ার ঘটনায় আলোচিত সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি মাহবুব উদ্দিন খোকন এবার দেশের সব আদালতকে দুর্নীতিমুক্ত করা এবং সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ‘বস্তি’ উচ্ছেদের দাবি জানিয়েছেন ।
তিনি বলেছেন, “মামলার তদবিরের দুর্নীতি, লিস্টে আনতে দুর্নীতি, শুনানির দুর্নীতি, কিছু কিছু জুডিশিয়াল অফিসারের দুর্নীতি এবং সুপ্রিম কোর্টে সব জায়গায়, হাই কোর্টেও লিস্টে আনতে দুর্নীতি—এসব আইনজীবীদের বক্তব্য।
“আপিল ডিভিশন এবং হাই কোর্ট ডিভিশনে এবং সারা বাংলাদেশে প্রত্যেকটা কোর্টের মধ্যে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে আগামী এক মাসের মধ্যে।”
দুর্নীতিবাজ বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, “অন্য জায়গায় দুর্নীতি থাকলেও দুর্নীতির বিচার সুপ্রিম কোর্টেই হয়।
“সেখানে বিচারপ্রার্থীদের মামলা করার সময় যদি তদবির করতে হয়, সব জায়গায় টাকা দিতে হয়, তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক।”
বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
পাশাপাশি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া ‘রাজনৈতিক’ বিচারপতিদের সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে পাঠানোর দাবি জানান এ জ্যেষ্ঠ আইনজীবী। আর সমালোচনা করেন অ্যাটর্নি জেনারেলের সাম্প্রতিক বক্তব্যের।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার বিচারপতিদের প্রসঙ্গ টেনে মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, “গত ১৭ বছর আওয়ামী লীগের সময়ে অনেক বিচারপতির আচরণ ছিল রাজনৈতিক।
“তারা এখনো সুপ্রিম কোর্টে বহাল তবিয়তে আছে। তাদের প্রতিটা আচরণ কন্ডাক্ট করে আমি দাবি করি, তাদের সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে প্রেরণ করা হোক।”
সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে থাকা ‘বস্তি’ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে খোকন বলেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালতে বস্তি থাকতে পারে না।
আইনজীবীদের বসার ও হাঁটার জায়গা নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আগামী এক মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের এই প্রিমিজেস থেকে বস্তি উচ্ছেদ করতে হবে এবং আইনজীবীদের বসার জন্য, কর্মপরিবেশ সৃষ্টির জন্য আপাতত টেম্পোরারি শেড হলেও করে দিতে হবে।”
এক মাসের মধ্যে এসব দাবি পূরণ না হলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন মন্তব্য করে তিনি বলেন, এর দায়-দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি বহন করবে না।
মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে সুপ্রিম কোর্টের আসন্ন অবকাশকালীন ছুটির পর আপিল বিভাগে কমপক্ষে তিনটি বেঞ্চ গঠন এবং প্রয়োজনে নতুন বিচারপতি নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান খোকন।
সম্প্রতি এক জুনিয়র আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার আদেশ প্রত্যাহার না হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করে খোকন বলেন, এ বিষয়ে আইনজীবীরা আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন।
মঙ্গলবার আপিল বিভাগ একটি মামলায় আদেশ দেয়। একই বিষয়ে একাধিক রিট আবেদন এবং আগের মামলার তথ্য গোপনের অভিযোগে রিট আবেদনকারী মো. নূর আলম ও তার আইনজীবী সুফিয়া আহামেদকে পাঁচ লাখ টাকা করে মোট ১০ লাখ টাকা জরিমানা (কস্ট) করা হয়।
জরিমানার টাকা ৩০ দিনের মধ্যে ঢাকা শিশু হাসপাতালে জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
আদেশ দেওয়ার সময় আইনজীবী সুফিয়া আহামেদ আদালতে ছিলেন। তবে তার সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে এসব মামলায় যুক্ত ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন তখন আদালতে ছিলেন না।
দুপুরের পর এজলাসে গিয়ে ব্যারিস্টার খোকন প্রধান বিচারপতির কাছে ওই নারী আইনজীবীর পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা মওকুফের অনুরোধ করেন।
তার ভাষ্য ছিল, একজন জুনিয়র ল’ইয়ার হিসেবে ৫ লাখ টাকা ‘কস্ট’ অনেক বেশি হয়ে গেছে, এটা মাফ করে দেওয়া দরকার।
ওই কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি আপিল বিভাগে মামলা কমে যাওয়া এবং এর ফলে আইনজীবীদের আয় কমে যাওয়ার প্রসঙ্গ তোলেন।
সেই ঘটনা বর্ণনা করে ব্যারিস্টার খোকন সেদিন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “আমি মাননীয় প্রধান বিচারপতিকে বললাম, যে আপনি মাননীয় প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরে আসলে মামলা-টামলা খুব একটা হচ্ছে না আপিল বিভাগে। আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে।”
খোকনের দাবি, তার বক্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল আপিল বিভাগে বেঞ্চের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে মামলার শুনানি কমে যাওয়ার বিষয়টি বোঝানো।
তবে প্রধান বিচারপতি তখন খোকনের কাছে জানতে চান, তিনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরই আইনজীবীদের আয় কমে গেছে–এমন কিছু খোকন বোঝাতে চাইছে কি না।
খোকন একই বক্তব্য আবার বলার চেষ্টা করলে প্রধান বিচারপতি তাকে বলেন, তার ওই বক্তব্য ‘অ্যাবসোলিউটলি আদালত অবমাননার শামিল’।
এরপর প্রধান বিচারপতি জানান, তিনি আর আদালতে দিনের কার্যক্রমে অংশ নেবেন না। এরপর তিনি এবং বেঞ্চের অন্য বিচারকরা এজলাস ছেড়ে উঠে যান।
এ ঘটনার বর্ণনা দিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল সেদিন বলেছিলেন, আদেশ দেওয়ার সময় ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। তবে আইনজীবী সুফিয়া আহামেদ তখন তার পাশে বসেছিলেন এবং বারবার বলছিলেন, “খোকন ভাই আমাকে কী বিপদে ফেলল।”
রাষ্ট্রের প্রধান আইনজীবীর বক্তব্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি খোকন বৃহস্পতিবার বলেন, প্রধান বিচারপতির কাছে আইনজীবীদের কথা তুলে ধরা নিজের দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের, এসব বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের কোনো কাজ নেই।
“হু ইজ হি হিয়ার? সে কে? তার বক্তব্যই ইরেলেভেন্ট। তার বক্তব্যটা অনভিপ্রেত, আনবিকামিং। আমি আশ্চর্যান্বিত হয়ে গেলাম, উনি সুপ্রিম কোর্ট বারের সেক্রেটারি ছিলেন না?
“উনি কীভাবে আইনজীবীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন! আই এম শকড অ্যান্ড সারপ্রাইজড।”
প্রধান বিচারপতির এজলাস ত্যাগের ঘটনা নিয়ে বুধবার জাতীয় সংসদে আলোচনা হয়েছে।
ওই ঘটনাকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ বর্ণনা করে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান প্রশ্ন তোলেন, জনগণের ন্যায়বিচার পাওয়ার শেষ আশ্রয়স্থল বিচার বিভাগে এমন ঘটনা কী বার্তা দিচ্ছে।
জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেছেন, ঘটনাটি রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের মধ্যে কোনো অঙ্গের সঙ্গে ঘটেনি। এটি একজন আইনজীবীর আচরণের বিষয়। তবে ওই আচরণকে তিনি সমর্থন করছেন না। সূত্র- বিডি নিউজ।

