
রাশিয়া থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ইউরেনিয়াম জ্বালানি বহনকারী বিশেষ কার্গো বিমান ঢাকায় পৌঁছেছে। শুক্রবার, ২ অক্টোবর রাত প্রায় ১১টা ৪৫ মিনিটে রুশ নির্মিত ইলিউশিন-৭৬ উড়োজাহাজটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। পরদিন কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে বিশেষ ব্যবস্থায় চালানটি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নেওয়া হয়।
কিন্তু এই চালানটির বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা ছিল আরও আগে—২৪ সেপ্টেম্বর। নির্ধারিত সময়ে বিমানটি বাংলাদেশে আসতে পারেনি। কারণ হিসেবে সামনে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: পাকিস্তান কেন রুশ বিমানটিকে তার আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি?
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম তখন জানান, রাশিয়া থেকে আসা বিমানটির নির্ধারিত রুটে পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহার করার অনুমতি পাওয়া যায়নি। মন্ত্রী বলেন, বিষয়টি তখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। পরে পাকিস্তান হাইকমিশন ঢাকায় জানায়, বিষয়টি রাজনৈতিক নয়; বরং বিমান চলাচলের রুট ও আকাশসীমার অনুমোদনসংক্রান্ত কারিগরি ও পদ্ধতিগত বিষয়।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—একটি নিয়মিত আন্তর্জাতিক কার্গো ফ্লাইটের ক্ষেত্রে এমন সমস্যা হলো কেন? বিশেষ করে যখন একই ধরনের রুশ বিমান এর আগে রূপপুরের পারমাণবিক জ্বালানি বাংলাদেশে নিয়ে এসেছে?
যে রুটে আসার কথা ছিল:
রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য রাশিয়া থেকে জ্বালানি পরিবহনের পরিকল্পনায় বিমানটির সম্ভাব্য রুট ছিল রাশিয়া থেকে কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান, পাকিস্তান ও ভারত হয়ে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে এমন রুটের কথা জানিয়েছেন।
অর্থাৎ রাশিয়া থেকে বাংলাদেশে আসার পথে পাকিস্তানের আকাশসীমা ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ।
বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে কোনো দেশের আকাশসীমা ব্যবহার স্বয়ংক্রিয় অধিকার নয়। সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের অনুমতি প্রয়োজন হয়। আর পারমাণবিক জ্বালানি বহনকারী বিশেষ কার্গো বিমানের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই নিরাপত্তা, রুট, কার্গোর ধরন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ের বিষয় থাকে।
এই জায়গাতেই তৈরি হয় জটিলতা।
২৪ সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত ফ্লাইটটি পাকিস্তানের ওভারফ্লাইট ক্লিয়ারেন্স না পাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে উড্ডয়ন করতে পারেনি। ফলে বাংলাদেশে জ্বালানি পৌঁছানোর সময়সূচি পিছিয়ে যায়।
ঘটনার পর পাকিস্তান সরাসরি বলেনি যে কোনো রাজনৈতিক কারণে বিমানটিকে আটকে দিয়েছে।
ঢাকায় পাকিস্তান হাইকমিশনের প্রেস কাউন্সেলর শাবিদ উল্লাহ ওয়াজির লিখিত বক্তব্যে বলেন, পাকিস্তান কূটনৈতিক ও ওভারফ্লাইট অনুমোদনের আবেদন নির্ধারিত নিয়ম এবং বেসামরিক বিমান চলাচলের প্রটোকল অনুযায়ী বিবেচনা করে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, আলোচিত ঘটনাটি সম্ভবত বিমান চলাচলের রুট এবং আকাশসীমার অনুমতি সংক্রান্ত কারিগরি ও পদ্ধতিগত ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। এ ধরনের বিষয়ে বিভিন্ন বিমান চলাচল ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন হতে পারে এবং এর ফলে ফ্লাইটের সময়সূচিতে পরিবর্তনও হতে পারে।
পাকিস্তান একই সঙ্গে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে ঘটনাটিকে অতিরিক্ত রাজনৈতিক অর্থ না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার: পাকিস্তান প্রকাশ্যে বলেনি যে ইউরেনিয়াম বহন করার কারণে তারা বিমানটিকে নিষেধ করেছে।
তাহলে আসল কারণ কী?
পাকিস্তান ‘কারিগরি ও পদ্ধতিগত’ কারণের কথা বললেও ঠিক কোন কারিগরি সমস্যা হয়েছিল, সেটি বিস্তারিত জানায়নি।
ফ্লাইট রুটের সমস্যা ছিল?
ক্লিয়ারেন্সের আবেদন দেরিতে হয়েছিল?
কার্গোর প্রকৃতি নিয়ে অতিরিক্ত অনুমোদনের প্রয়োজন হয়েছিল?
নির্দিষ্ট রুটে কোনো বিমান চলাচল-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ ছিল?
নাকি পাকিস্তানের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ও অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় হয়নি?
প্রকাশ্যে পাওয়া তথ্য দিয়ে এসব প্রশ্নের কোনো একটির উত্তর নিশ্চিতভাবে দেওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের কর্মকর্তারাও প্রথম দিকে বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, রুশ কর্তৃপক্ষও ফ্লাইট পিছিয়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
তবে ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন মহলে রাজনৈতিক প্রশ্ন উঠেছে।
রূপপুর প্রকল্প রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কৌশলগত ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতাগুলোর একটি। প্রকল্পটি রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক প্রতিষ্ঠান রোসাটম বাস্তবায়ন করছে। ফলে রাশিয়া থেকে পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহনের একটি বিমানকে পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহার করতে না দেওয়ার ঘটনা কূটনৈতিক বিশ্লেষণের বিষয় হয়ে ওঠে।
তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বর্তমান আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি। রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের টানাপোড়েন, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক এবং বাংলাদেশ-রাশিয়া পারমাণবিক সহযোগিতা—সব মিলিয়ে ঘটনাটি নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
যদিও এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত বা অন্য কোনো রাষ্ট্র পাকিস্তানকে রুশ বিমানটির আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না দিতে চাপ দিয়েছিল।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রীও তখন এমন কোনো নির্দিষ্ট কারণ জানাতে পারেননি। বরং তিনি বলেছিলেন, পাকিস্তানের অনুমতি না পাওয়ার সঠিক কারণ তখনও জানা যায়নি।
২৪ সেপ্টেম্বরের ফ্লাইট নির্ধারিত সময়ে আসতে পারেনি। কিন্তু পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং ২ অক্টোবর রাতে ইউরেনিয়ামবাহী রুশ বিমান বাংলাদেশে পৌঁছে যায়।
সাম্প্রতিক বাংলাদেশি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমানটি পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহার করেই বাংলাদেশে এসেছে।
অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের ঘটনাকে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে রাশিয়া বা বাংলাদেশের জন্য স্থায়ী আকাশসীমা নিষেধাজ্ঞা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বরং ঘটনাটি থেকে আপাতত যে চিত্র পাওয়া যায় তা হলো—একটি নির্দিষ্ট ফ্লাইটের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন সময়মতো পাওয়া যায়নি; পরে বিষয়টি সমাধান হয়েছে।
এই তথ্য পাকিস্তানের ‘কারিগরি ও পদ্ধতিগত’ ব্যাখ্যাকে অন্তত আংশিকভাবে সমর্থন করে। কারণ যদি এটি কোনো স্থায়ী রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা হতো, তাহলে কয়েক দিন পর একই ধরনের রুশ পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহনকারী বিমান পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহার করে বাংলাদেশে পৌঁছাতে পারত না।
তবে এখানেও একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—প্রথম ফ্লাইটের অনুমোদন কেন আটকে গেল এবং পরের ফ্লাইট
রূপপুর প্রকল্পে দুটি VVER-1200 রিঅ্যাক্টর রয়েছে এবং মোট উৎপাদনক্ষমতা ২,৪০০ মেগাওয়াট। প্রথম ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহ ২০২৩ সালে সম্পন্ন হয়েছিল। এখন দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহের ধাপ চলছে।

