ঢাকা   , ,     

সর্বশেষ সংবাদ

কর বিরোধ ঝুলিয়ে রাখাকে ড. ইউনূসের ‘কর ফাঁকির ধ্রুপদি উদাহরণ’ বলছেন হাইকোর্ট

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ কল্যাণের কাছে ৬৬৬ কোটি টাকার বেশি বকেয়া আয়কর আদায়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। পাঁচ করবর্ষের আয়কর পুনর্নির্ধারণের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে প্রতিষ্ঠানটির করা পৃথক দুটি রিট আবেদন খারিজ করে দেওয়া রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপিতে এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালত করসংক্রান্ত একটি নিষ্পত্তিযোগ্য বিষয় দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখার ঘটনাকে ‘কর ফাঁকির ধ্রুপদি উদাহরণ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে আদালত বলেছেন, সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী গ্রামীণ কল্যাণের নিজের আয়কর পরিশোধের দায় রয়েছে। গ্রামীণ টেলিকমের দেওয়া উৎসে করকে গ্রামীণ কল্যাণের নিজের কর পরিশোধ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই।
গত ১০ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রায় দেন। সোমবার (১২ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়।
রায়ের দুটি অনুলিপির একটি ১৫ পৃষ্ঠা, অন্যটি ৩২ পৃষ্ঠার। এতে সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষকে বকেয়া কর আদায়ে আইন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একটি রায়ে দ্রুত বকেয়া কর আদায়ের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে এবং অন্যটিতে প্রয়োজনীয় দাবিনামা নোটিশ জারির মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
পাঁচ করবর্ষের কর নিয়ে বিরোধ:
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পুনর্মূল্যায়নের পর গ্রামীণ কল্যাণের কাছে ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ করবর্ষের জন্য মোট ৬৬৬ কোটি ৯১ লাখ ৫২ হাজার ৩৭০ টাকা আয়কর দাবি করা হয়। এই দাবির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালে হাইকোর্টে পৃথক দুটি রিট আবেদন করে প্রতিষ্ঠানটি।
মামলার মূল বিরোধ গ্রামীণ কল্যাণের আয় এবং গ্রামীণ টেলিকমের কাছ থেকে পাওয়া অর্থের বিপরীতে আয়কর পরিশোধের দায় নিয়ে। রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ টেলিকমের মধ্যে একটি আর্থিক চুক্তি ছিল। ওই চুক্তির আওতায় গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে গ্রামীণ টেলিকম গ্রামীণফোনের শেয়ার কিনেছিল। এর বিপরীতে গ্রামীণ টেলিকম গ্রামীণ কল্যাণকে লভ্যাংশ থেকে অর্জিত মুনাফার ৪২ দশমিক ৫০ শতাংশ দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়।
এনবিআরের পুনর্মূল্যায়নে ওই আয় এবং তার বিপরীতে কর পরিশোধের বিষয়টি বিবেচনায় আসে। কর কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট আয়কে ভিত্তি করে নতুন করে কর নির্ধারণ করে। এরপর কর কমিশনারের সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয় গ্রামীণ কল্যাণ।
আয়কর অধ্যাদেশের ১৭৩ ধারার ব্যাখ্যা:
পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪-এর ১৭৩ ধারার কথা উল্লেখ করেছেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ওই ধারায় কর কমিশনারকে পূর্ববর্তী আদেশে ভুল সংশোধনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে যথাযথ নোটিশ দেওয়া এবং করদাতাকে শুনানির সুযোগ দেওয়ার পর কমিশনার সংশোধিত আদেশ দেন।


আদালত আরও উল্লেখ করেন, শুনানির সময় গ্রামীণ কল্যাণের পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি সংশ্লিষ্ট করবর্ষগুলোর আয়কর রিটার্নের বিপরীতে প্রদেয় কর পরিশোধের প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি।
আদালতের যুক্তি হলো, গ্রামীণ টেলিকমের পক্ষ থেকে কর কর্তন বা পরিশোধ করা হয়ে থাকলেও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রামীণ কল্যাণের নিজস্ব আয়কর পরিশোধের প্রমাণ হয়ে যায় না। দুই প্রতিষ্ঠানের করদায় এবং সংশ্লিষ্ট আয়ের হিসাব পৃথকভাবে বিবেচনা করতে হবে।
একই বিষয়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থানের পর্যবেক্ষণ:
পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত গ্রামীণ কল্যাণের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, একই ধরনের করসংক্রান্ত বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি একাধিক সময়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। আদালত আরও উল্লেখ করেছেন, ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ করবর্ষের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি অনুরূপ কর পরিশোধ করেছিল এবং পরে এ বিষয়ে করা পৃথক একটি মামলা প্রত্যাহার করেছিল।
আদালতের মতে, আগে নিষ্পত্তি হওয়া বা নিষ্পত্তিযোগ্য বিষয় দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখার মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রাপ্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এ কারণেই আদালত বিরোধটিকে ‘কর ফাঁকির ধ্রুপদি উদাহরণ’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
তবে আদালতের এই পর্যবেক্ষণ নির্দিষ্ট কর বিরোধ ও সংশ্লিষ্ট রিট আবেদনের প্রেক্ষাপটে দেওয়া। একে ড. ইউনূসের ব্যক্তিগত আয়করসংক্রান্ত কোনো পৃথক ফৌজদারি দণ্ডাদেশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
২০২৪ সালের রায় প্রত্যাহারের পর নতুন করে শুনানি:
এ মামলায় এর আগেও হাইকোর্টে রায় হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট একটি হাইকোর্ট বেঞ্চ গ্রামীণ কল্যাণের রিট আবেদন খারিজ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে ওই বেঞ্চের একজন বিচারপতি সংশ্লিষ্ট মামলায় আগে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে সরকারের পক্ষে দায়িত্ব পালন করেছিলেন—এমন বিষয় সামনে আসার পর ২৯ আগস্ট ২০২৪ ওই রায় প্রত্যাহার করা হয়। মামলার নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়।
পরবর্তী সময়ে নতুন বেঞ্চে মামলাটি শুনানির জন্য পাঠানো হয়। শুনানি শেষে ২০২৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের বেঞ্চ পৃথক দুটি রিটের রুল খারিজ করে দেন। এর ফলে এনবিআরের পুনর্নির্ধারিত কর দাবির বিরুদ্ধে গ্রামীণ কল্যাণের চ্যালেঞ্জ সফল হয়নি।
আপিলের সুযোগ থাকছে:
হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যাওয়ার কথা জানিয়েছে গ্রামীণ কল্যাণের আইনজীবীপক্ষ। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর আইন অনুযায়ী আপিলের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা তারা জানিয়েছে।
এর আগে ১৪ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে আবেদন করা হয়েছিল। তবে সে পর্যায়ে হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করা হয়নি। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর আপিলের বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
আইনগতভাবে, হাইকোর্টের রায় বর্তমানে বহাল থাকায় এনবিআরকে বকেয়া কর আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে আপিল বিভাগে পরবর্তী কোনো আদেশ বা রায় এলে মামলার অবস্থান পরিবর্তিত হতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সবচেয়ে আলোচিত