দক্ষিণ আফ্রিকা একজন নারীর একসঙ্গে একাধিক পুরুষকে বিয়ে করার বৈধতা দেয়ায় এ নিয়ে সামাজিক শৃংখলা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। দেশটির রক্ষণশীল সমাজে প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছে। এই প্রস্তাবে এত ব্যাপক প্রতিবাদের ঝড় ওঠায় অনেক বিশ্লেষকই বিস্মিত নন। এ বিষয় নিয়ে কাজ করেন সুপরিচিত শিক্ষাবিদ কলিস মাচোকো বলেছেন, এই আপত্তির মূলে রয়েছে পুরুষদের ‘নিয়ন্ত্রণের’ সংস্কৃতি। আফ্রিকান সমাজ এখনো সমান অধিকারের জন্য তৈরি হয়নি। যে নারীকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না তার সাথে কী ধরনের আচরণ করা উচিত, সেটা আমরা জানি না। বিশ্বে খুবই উদারপন্থী সংবিধান যেসব দেশে রয়েছে তার একটি হলো দক্ষিণ আফ্রিকা। দেশটির সংবিধানে সমকামী নারী ও সমকামী পুরুষদের মধ্যে বিয়ে এবং পুরুষদের জন্য বহুবিবাহ বৈধ।
টিভি ব্যক্তিত্ব এবং ব্যবসায়ী মুসা এমসেলেকুর চার বউ। তিনি নারীদের বহুবিবাহের বিরোধী। তিনি বলেন, এটা আফ্রিকার সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দেবে। এদের সন্তানদের কী হবে? তারা কীভাবে জানবে তাদের পিতা কে? দক্ষিণ আফ্রিকায় রিয়ালিটি টিভির পর্দায় তার একাধিক স্ত্রীর সাথে সংসারবিষয়ক অনুষ্ঠান করে তারকা খ্যাতি পেয়েছেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, নারীরা এখন পুরুষের ভূমিকা নিতে পারে না। এমন কথা কেউ আগে কখনও শোনেনি। মেয়েরা কি এখন বিয়ে করার জন্য পুরুষদের লোবোলা (দেনমোহর) দেবে? পুরুষরা ওই নারীর পদবি (সারনেম) গ্রহণ করবে এমনটাই কি এখন আশা করা হবে?
গোপন বিয়ে
প্রফেসর মাচোকোর জন্ম প্রতিবেশী জিম্বাবুয়েতে। সেখানে নারীদের বহুবিবাহ নিয়ে তিনি গবেষণা করেছেন। তিনি এমন ২০ জন নারীর সাথে কথা বলেছেন, যাদের একাধিক স্বামী রয়েছে। এরকম ৪৫ জন স্বামীর সাথে তিনি কথা বলেছেন যারা অন্য স্বামীদের সাথে মিলে স্ত্রীর ঘর করেন। এ ধরনের বিয়ে জিম্বাবোয়ের সমাজে অগ্রহণযোগ্য এবং আইনগতভাবে স্বীকৃত নয় বলেছেন অধ্যাপক মাচোকো।
তিনি আরও বলেন, নারীদের বহুবিবাহ যেহেতু সমাজের একটা অংশ ভালো চোখে দেখে না, তাই সেখানে এ ধরনের বিয়ে হয় গোপনে, এ ধরনের সংসারের খবরও গোপন রাখা হয়। তিনি আরো বলেন, কেউ যদি এধরনের সংসার দেখলে প্রশ্ন তোলেন- বিশেষ করে এমন কেউ যাদের তারা চেনেন না বা বিশ্বাস করেন না, তারা এরকম কোনো বিয়ের কথা পুরোপুরি অস্বীকার করে যান। তাদের মধ্যে প্রতিশোধ বা নির্যাতন ও হয়রানির ভয় কাজ করে।
প্রফেসর মাচোকো যাদের ওপর তার গবেষণার কাজ করেছেন তাদের সবার ক্ষেত্রেই স্বামীরা স্ত্রীর ঘরে একসাথে থাকেন না। তারা থাকেন আলাদা আলাদাভাবে সমাজ যাতে তাদের বিয়ের কথা না জানে। কিন্তু তারা সবাই একই স্ত্রীর সাথে সংসর্গ করেন এবং স্বামীরা নিজেদের মধ্যে এ নিয়ে খোলাখুলিই কথাবার্তা বলেন।
তিনি আরো বলেন, এদের মধ্যে একজন নারী বলেন তার বয়স যখন ১২, যখন তিনি স্কুলের ছাত্রী, তখন থেকেই তিনি একাধিক পুরুষকে একসাথে বিয়ে করার চিন্তা লালন করতে শুরু করেন। লেখাপড়ার সময় তিনি জেনেছিলেন, মৌচাকে রানি মৌমাছি থাকে একজন আর তাকে ঘিরে থাকে বহু পুরুষ মৌমাছি। তারা সবাই একসাথে ওই রানির সঙ্গে সহবাস করে।
প্রাপ্তবয়স্ক হবার পর ওই নারী একাধিক পুরুষসঙ্গীর সাথে যৌন সংসর্গ শুরু করেন। ওই পুরুষরা সবাই পরস্পরকে চিনতেন এবং বিষয়টা জানতেন।
‘তার বর্তমানে যে ৯ জন স্বামী রয়েছেন, তাদের মধ্যে চারজন ওই পুরনো দলে ছিলেন।’
জিম্বাবুয়েতে অধ্যাপক মাচোকো দেখেছেন, নারীদের বহুবিবাহের ক্ষেত্রে সাধারণত নারীরাই সম্পর্ক শুরু করেন এবং পুরুষদের সবাইকেই বিয়ের পর তার সাথে সহবাসের আমন্ত্রণ জানান। কেউ কেউ বিয়ের জন্য নারী দেনমোহর দেন, কেউ আবার তা না দিয়ে ওই নারীর জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় খরচের অংশ বহন করেন।
ওই নারী যদি দেখেন তার কোনো স্বামী, অন্য স্বামীদের মধ্যে ঝগড়া বাঁধাবার বা তার সংসারে অশান্তি সৃষ্টির করছেন, তাকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দেবার ক্ষমতাও ওই নারী রাখেন।
অধ্যাপক মাচোকো বলছেন, তিনি যাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তারা বলেছেন অন্য স্বামীদের সাথে মিলে এক স্ত্রীর ঘর করার পেছনে তাদের মূল কারণ ছিল ওই নারীর প্রতি তাদের ভালোবাসা। তারা কেউই ওই নারীকে হারানোর ঝুঁকি নিতে চাননি।
কয়েকজন পুরুষ বলেছেন, তারা তাদের স্ত্রীদের যৌন চাহিদা মেটাতে অক্ষম ছিলেন, কিন্তু ডিভোর্স মেনে নেওয়ার বদলে বরং অন্য স্বামীদের সাথে মিলেমিশে থাকাটাই ভালো বলে মেনে নিয়েছেন।
কোনো কোনো পুরুষের সিদ্ধান্তের পেছনে কারণ ছিল তাদের বন্ধ্যাত্ব। স্ত্রী যাতে সন্তানধারণ করতে পারেন তার জন্য স্ত্রীর আরেক বিবাহ তারা মেনে নিয়েছেন। এভাবে ওই বন্ধ্যা পুরুষরা সমাজে নিজেদের ‘মুখ রক্ষা’ করেছেন এবং তাদের ‘পৌরুষের’ অভাব নিয়ে সমাজে আলোচনার হাত থেকে বেঁচেছেন।
ধর্মীয় নেতারা অসন্তুষ্ট
অধ্যাপক মাচোকো বলেছেন দক্ষিণ আফ্রিকায় নারীদের বহুবিবাহ সম্পর্কে তিনি ওয়াকিবহাল নন। তবে, নারী-পুরুষ সমানাধিকার নিয়ে আন্দোলনকারীরা নারীর সমানাধিকার ও ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেবার দাবিতে নারীদের বহুবিবাহকে আইনি স্বীকৃতি দেবার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়।
দেশটির বর্তমান আইনে একাধিক নারীকে বিয়ে করার অধিকার আছে শুধু পুরুষের। দক্ষিণ আফ্রিকা সরকারের গ্রিন পেপার নামে সরকারি নথিতে এই প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ১৯৯৪ সালে শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘুদের শাসনকালের অবসানের পর এই প্রথম দেশটির বিবাহ আইনে বড় ধরনের রদবদল আনার পরিকল্পনা সরকার নিয়েছে। তাই সরকার এই নথিটি জনসাধারণের মতামত জানানোর জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে।
‘এই গ্রিন পেপারের মূল লক্ষ্য হল মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন। কাজেই মানবাধিকারের এই দিকটাও মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ,’ বলছেন শার্লিন মে, যিনি নারীদের জন্য একটি আইনি কেন্দ্রে উইমেন্স লিগ্যাল সেন্টারের আইনজীবী। এই সংস্থা নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ করে।
‘আইনের সংস্কার যেখানে লক্ষ্য সেখানে পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গিকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে নারীদের অধিকার যাতে ক্ষুণ্ন না হয় সেটাও দেখতে হবে,” তিনি বলেন।
বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া
এই নথিতে মুসলিম, হিন্দু, ইহুদি এবং রাস্ট্রাফেরিয়ান সব জনগোষ্ঠীরই বিবাহকে আইনগত স্বীকৃতি দেবার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানালেও ধর্মীয় নেতারা নারীদের বহুবিবাহকে আইনগত স্বীকৃতি দেবার বিষয়টিকে নিন্দা জানিয়েছেন।
বিরোধী দল আফ্রিকান ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রাটিক পার্টির নেতা রেভারেন্ড কেনেথ মেশো বলেছেন এই পদক্ষেপ ‘সমাজ ধ্বংস’ করে দেবে।
”এমন পর্যায়ে আমরা পৌঁছাব যখন একজন স্বামী স্ত্রীর কাছে অভিযোগ করবেন, ‘তুমি অন্য স্বামীর সাথে বেশি সময় কাটাও, আমাকে যথেষ্ট সময় দাও না’ তারপর দুই স্বামীর মধ্যে শুরু হবে দ্বন্দ্ব,” তিনি বলছেন।
ইসলামিক আল-জামা পার্টির নেতা গানিয়েফ হেনড্রিক্স বলেছেন, চিন্তা করে দেখুন, ওই নারীর সন্তান জন্মের পর ডিএনএ পরীক্ষা করে নির্ধারণ করতে হবে কোন স্বামী ওই সন্তানের বাপ!
শিশু ও পরিবার
এমসেলেকু যুক্তি দেখাচ্ছেন দক্ষিণ আফ্রিকায় সমানাধিকার নীতির নামে ‘বাড়াবাড়ি করাটা’ সঠিক হবে না।
‘বিষয়টা সংবিধানে আছে বলেই যে সেটা আমাদের সমাজের জন্য ভালো এমনটা মনে করার তো কোনো কারণ নেই।’
তাকে প্রশ্ন করা হয় তার নিজের তো চারজন স্ত্রী। তাহলে একজন নারীর বেলায় এই বৈষম্য কেন? নারীর চারজন স্বামী থাকলে সমস্যা কোথায়?
তার উত্তর ছিল : ‘আমার চারটে বিয়ে, তাই এ ব্যাপারে আমার মতামতকে অনেকে বলছে ভণ্ডামি। কিন্তু আমার জবাব হলো- নারীদের জন্য বহুবিবাহ আফ্রিকান সমাজ ও সংস্কৃতিবিরোধী। আমাদের সংস্কৃতিকে আমরা বদলাতে পারি না।’
কিন্তু অধ্যাপক মাচোকো বলছেন নারীদের বহুবিবাহ প্রথা একসময় চালু ছিল কেনিয়া, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র এবং নাইজেরিয়ায়। গ্যাবোনে নারীরা এখনও বহুবিবাহ করে, সেটা ওই দেশে আইনসিদ্ধ।
‘খ্রিস্টান ধর্মের আগমন এবং ঔপনিবেশিক শাসন, সমাজে নারীর ভূমিকাকে খাটো করে দিয়েছিল। তাদের সমান চোখে দেখা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর সমাজে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল বিবাহপ্রথা।’
প্রফেসর মাচোকো বলেন, একাধিক স্বামীর সাথে নারীর সহবাসের মধ্যে দিয়ে জন্মানো সন্তান নিয়ে যেসব উদ্বেগ সমাজে প্রকাশ করা হয় তার কারণ হলো পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা।
‘এ ধরনের সংসারে জন্মানো শিশু নিয়ে প্রশ্ন উঠবে কেন? যে শিশু ওই নারীর গর্ভে আসছে সে তো তার পুরো পরিবারেরই সন্তান।’
বিবিসি বাংলা।
একইসঙ্গে একাধিক পুরুষকে বিয়ে করতে পারবেন দক্ষিণ আফ্রিকার নারীরা,সমকামীদের বিয়েও বৈধ, প্রতিবাদ রক্ষণশীলদের
মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরেক দফা নিষেধাজ্ঞা আরোপ
মিয়ানমার সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও সংস্থাগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশটিতে ১ ফেব্রুয়ারি অভ্যুত্থানের প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র এই নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিলো।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় গণতন্ত্রপন্থী সমর্থকদের ওপর সরকারী দলের মারণাস্ত্র ব্যবহারের জন্য সাতজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার ওপর আনুষ্ঠানিকভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পূর্বের নিষেধাজ্ঞা আরোপিত কর্মকর্তাদের পরিবারের ১৫ জন সদস্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এদের ‘আর্থিক যোগাযোগ’ সামরিক কর্মকর্তাদের অসাধু উপায়ে অর্জিত অর্থে অবদান রেখেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে এই নিষেধাজ্ঞা মিয়ানমারের নাগরিকদের লক্ষ্য করে নয়। এর লক্ষ্য হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে এই ২২ জনের যে সব সম্পদ থাকতে পারে তা থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ওপর আর্থিক বোঝা বৃদ্ধি করা। পরিপূরক পদক্ষেপ হিসেবে, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর চলমান পদক্ষেপকে সমর্থন করে এমন চারটি প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্য রফতানির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
স্বল্পবাস পুরুষও মেয়েদের চঞ্চল করে, যদি না তারা রোবট হয়; ইমরান খানের ছবি দিয়েই প্রতিক্রিয়া জানালেন তসলিমা নাসরিন
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে এক হাত নিলেন বাংলাদেশের নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। এক টুইটে পাকিস্তান ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক ও দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের যৌবনবয়সের একটি অনাবৃত ঊর্ধ্বাঙ্গ ছবি দিয়ে তসলিমা নাসরিন মন্তব্য করেছেন– ছেলেরা শরীর প্রদর্শন করলে তা দেখে মেয়েদের মনও চঞ্চল হয় যদি না তারা রোবট হয়।
ঘটনার সূত্রপাত ক’দিন আগে। দেশে ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে চলার জন্য মেয়েদের স্বল্পবাসকেই দায়ী করেছিলেন ইমরান খান। একটি বিদেশি সংবাদমাধ্যমে ইমরান বলেছিলেন, ‘স্বল্পবাস মহিলাকে দেখে পুরুষের মন চঞ্চল হওয়াটাই স্বাভাবিক, যদি না সেই পুরুষ রোবট হয়। সাধারণ বুদ্ধি অন্তত তাই বলে।’ ইমরান খানের এই মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতেই তসলিমা নাসরিন পাল্টা মন্তব্য করলেন।
একটি টুইটে ইমরানের যৌবনকালের একটি ‘শার্টলেস’ ছবি তুলে ধরে তসলিমা নাসরিন ইমরানের সুরেই কথা বলে ‘শিক্ষা’ দিয়েছেন ইমরানকে। বলেছেন, ছেলেরা দেহ প্রদর্শন করলে মেয়েদের মন চঞ্চল হওয়াও স্বাভাবিক।
রাজনীতিতে প্রবেশের পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ইস্যুতে বিতর্কিত মন্তব্য করতে শোনা গিয়েছে ইমরান খানকে। তাতেই সাম্প্রতিক সংযোজন ধর্ষণের জন্য মেয়েদের স্বল্পবাসকে দায়ী করার তাঁর এই মন্তব্য। যে মন্তব্য নিয়ে বিস্তর বিতর্ক হয়। এবং যে মন্তব্যের নিজের মতো প্রতিবাদ করলেন তসলিমা। পাকিস্তানের নারীবাদি সংগঠনগুলোও ইমরান খানের এমন মন্তব্যের প্রতিবাদ করছে।
ইয়াবাসহ কাশিমপুর কারাগারের কারারক্ষী গ্রেপ্তার
কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের মূল ফটকে ১৮৭ পিস ইয়াবাসহ এক কারারক্ষীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে কোনাবাড়ি থানায় মাদক আইনে মামলা হয়েছে। এর আগে বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ৯টার দিকে ইয়াবা নিয়ে কারাগারে প্রবেশের সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গ্রেপ্তার শাহিনুর ইসলাম ঢাকার ধামরাই থানা বাধানগর এলাকার আব্দুল জলিলের ছেলে। তিনি কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার পার্ট-২ এ কারারক্ষী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
গাজীপুর মেট্টোপলিটন কোনাবাড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু সিদ্দিক জানান, ‘কারাগারের বাইরে থেকে আন্ডারওয়ারের ভেতর লুকিয়ে ইয়াবা ট্যাবলেট নিয়ে কারাগারের ভেতর প্রবেশ করছিলেন কারারক্ষী শাহিনুর ইসলাম। একপর্যায়ে কারাগারের মূল ফটকে দায়িত্বরত কারারক্ষীরা তাকে তল্লাশী করেন। এসময় ১৮৭ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। ’
‘পরে কারা কর্তৃপক্ষ খবর দিলে রাত সোয়া ১০টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কারারক্ষী শাহিনুর ইসলামকে গ্রেপ্তার করে। এ ব্যাপারে কোনাবাড়ি থানায় মাদক আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে’, বলেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।
ছয় মাসে ধর্ষণের শিকার ৭৬৭ জন নারী, হত্যা ৩৪ জনকে, নির্যাতনের শিকার ৭২২ শিশুর মধ্যে হত্যা ৩১৭ জনকে; আসকের প্রতিবেদন
দেশে গত ছয় মাসে ৭৬৭ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, নির্যাতনের পর ২৪ জনকে হত্যা করা হয় এবং ৫ জন আত্মহত্যা করেছেন। ৭২২টি শিশু শারিরীক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে ৩১৭ শিশুকে। আইনশৃংখলা বাহিনীর ক্রসফায়ারে মৃত্যু হয়েছে ৩২ জনের। হিন্দু সম্প্রদায়ের বাসস্থানে ,মন্দিরে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে ৯৯টি । আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার আসকের এই সংখ্যাগত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়, যেটি চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে করা হয়েছে।
আসকের নির্বাহী পরিচালক গোলাম মনোয়ার কামাল স্বাক্ষরিত এই বিজ্ঞপ্তি বৃহস্পতিবার পাঠানো হয়, যেটিতে প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মানবাধিকার লঙ্ঘনের সংখ্যাগত প্রতিবেদনটি ১০টি জাতীয় দৈনিক ও বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত সংবাদ ও আসকের নিজস্ব উৎস থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।
গত ছয় মাসে শিশুর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন পরিস্থিতি ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ ছিল উল্লেখ করে আসকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই সময় ৭২২ শিশু শারীরিক ও যৌন নির্যাতনসহ নানা সহিংসতার শিকার হয় এবং হত্যা করা হয়েছে ৩১৭ শিশুকে। সব মিলিয়ে মোট ১ হাজার ৩৯ শিশু নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছে।
“যাদের মধ্যে ৪২০ শিশুকে ধর্ষণ করা হয়, আত্মহত্যা করেছে ৫১ শিশু, যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৫০ জন ছেলে শিশু, উত্যক্তকরণ, শিশু গৃহকর্মী নির্যাতন, শিক্ষকের কাছে নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরণের নির্যাতনের শিকার হয়েছে আরও ২০৯ শিশু।”
প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সময়ে নির্যাতিত ৭৬৭ জন নারীর মধ্যে ৬১১ জন একক ও ১৫৬ জন সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন।
এছাড়া একই সময়ে আরও ১৬৬টি ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ছয় মাসে ৬৪ নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং এদের মধ্যে পরে আত্মহত্যা করেছেন ৭ জন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছে ৫৭ জন পুরুষ, যাদের মধ্যে ৪ জনকে হত্যা করা হয়েছে। প্রতিবাদ করতে গিয়ে ২ নারীও হত্যার শিকার হন।
এই সময়ে ৩৫০ নারী পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে স্বামী, স্বামীর পরিবার এবং নিজ পরিবার থেকে হত্যার শিকার হন ২১০ নারী এবং পারিবারিক নির্যাতনের কারণে ৭৮ নারী আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
এছাড়া যৌতুককে কেন্দ্র করে নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছেন ১২১ নারী। যৌতুকের জন্য নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে ৪১ জনকে এবং নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছেন ৯ জন নারী। এর মধ্যে যৌতুকের কারণে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন ৭১ জন।
জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের তথ্য উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘হেফাজতে’ এবং ‘ক্রসফায়ারে’ ৩২ জন মারা গেছেন।
এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে ‘ক্রসফায়ার’, ‘বন্দুকযুদ্ধ’, ‘গুলি বিনিময়’ কিংবা ‘এনকাউন্টারে’ নিহত হন ২০ জন। এ সময়ে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘গুলিতে’ ৯ জন এবং ‘নির্যাতনে’ ৩ জন মারা যান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ছয় মাসে কারাগারে অসুস্থতাসহ বিভিন্ন কারণে ৪১ জন মারা যান। এর মধ্যে ১৩ কয়েদি এবং ২৮ জন হাজতি ছিলেন।
গত ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে ৬ জন অপহরণ কিংবা গুমের শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পরবর্তী সময়ে এদের মধ্যে ৩ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হলেও এখও ৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে গত ছয় মাসে ১২০ জন সাংবাদিক নির্যাতন, হামলা-মামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এতে বলা হয়, নির্যাতিত সাংবাদিকদের মধ্যে ১৮ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে আক্রান্ত হন। নির্বাচনী সহিংসতায় ১৩ জন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আগমন উপলক্ষে বিক্ষোভ ও সহিংসতায় ১৮ জন সাংবাদিক আহত হন।
অন্যরা স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও সন্ত্রাসীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন। এ সময়ে গুলিবিদ্ধ এক সাংবাদিক মারা যান বলে প্রতিবেদনের তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ছয় মাসে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাসস্থানে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ৯৯টি ঘটনা ঘটেছে বলে আসকের প্রতিবেদনে বলা হয়।
এতে বলা হয়, ছয় মাসে ৪৩টি প্রতিমা, পারিবারিক মন্দির ও পূজামন্ডপে হামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩ জন। দখল বা দখল চেষ্টা এবং উচ্ছেদ বা উচ্ছেদ চেষ্টার শিকার হয়েছেন ৬ জন। এছাড়া বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের পরিবার ও বাড়িঘরে একটি হামলার ঘটনা ঘটেছে।
এই সময়ে ভারত সীমান্তে ৬ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী-বিএসএফের গুলিতে ৪ জন, শারিরিক নির্যাতনে ১ জন এবং বিএসএফের ধাওয়া খেয়ে পানিতে ডুবে আরও ১ জন মারা যান।
এছাড়া আহত হয়েছেন ৪ জন এবং অপহরণের শিকার হয়েছেন ৩ জন, এদের মধ্যে পরে ২ জন ফেরত এসেছে।
প্রতিবেদনে গত ছয় মাসে ২৬৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনার কথাও বলা হয়েছে।
অপরদিকে ২৫ জন গৃহকর্মী নির্যাতন ও হত্যার শিকার হন। এই সময়ে ৮টি সালিশ ও ফতোয়ার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ১১ নারী অ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এছাড়া গত ছয় মাসে ১৯ জন গণপিটুনিতে মারা যান।
আসক করোনাভাইরাস মহামারীর এই সংকটকালীন সময়ে নাগরিকের মানবাধিকারের সুরক্ষা এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার দ্রুত নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের প্রতি দাবি জানায়। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
খালেদা জিয়ার ক্ষমা চাওয়া প্রসঙ্গ; আইনমন্ত্রীর বক্তব্য সংবিধান পরিপন্থি বলছেন ব্যারিস্টার খোকন
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেছেন, সংসদে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সম্পর্কে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বক্তব্য সংবিধান পরিপন্থি, আইনমন্ত্রী হিসেবে তাঁর এ বক্তব্য শপথ ভঙ্গের শামিল। এ বক্তব্য সমগ্র জাতিকে হতাশ করেছে। এটি ৭৬ বছর বয়সী সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতি প্রতিহিংসা ও নিষ্ঠুরতার বহিঃপ্রকাশ।
ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুসারে আইনমন্ত্রী শপথ নিয়েছেন। সেই অনুসারে ১৪৮ অনুচ্ছেদ পর্যালোচনা করলে আমার মনে হয় আইনমন্ত্রী শপথ ভঙ্গ করেছেন। একজন সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে আইনমন্ত্রীকে সবিনয়ে অনুরোধ করব, আপনার বক্তব্য ও সংবিধানের শপথ পর্যালোচনা করে পদত্যাগ করা উচিত বা উচিত কিনা সেই ব্যাপারে আপনি সিদ্ধান্ত নিবেন।
বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মাহবুব উদ্দিন খোকন। তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া মিথ্যা দুই মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে ছিলেন। সরকারের ইচ্ছাকৃত অবহেলার কারণে তিনি অসুস্থ হয়ে গেছেন। সরকারই তাঁকে চিকিৎসার জন্য বিএসএমএমইউতে পাঠায়। বেগম জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৪০১ ধারায় তাঁকে দুই শর্তে মুক্তি দেওয়া হয়।
মাহবুব উদ্দিন খোকন আরও বলেন, খালেদা জিয়া তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করেছেন, যেগুলো এখনও বিচারাধীন আছে। এ অবস্থায় আইনমন্ত্রীর পক্ষ থেকে বেগম জিয়াকে রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষমা চাওয়ার শর্ত দেওয়ার মধ্যমে তিনি কী বুঝাতে চেয়েছেন? তিনি কি বুঝাতে চেয়েছেন খালেদা জিয়া সুপ্রিম কোর্ট থেকেও ন্যায়বিচার পাবেন না? তাঁর এ বক্তব্য দেশের সর্বোচ্চ আদালতকে হেয় এবং অসম্মান করেছে বলে আমি মনে করি। তিনি এটা বলতে পারেন না
মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়েছেন নিম্ন আদালত। নিম্ন আদালত আইন মন্ত্রণালয়ের অধীন। সুপ্রিম কোর্টেও বিচারক নিয়োগের কোনো নীতিমালা নেই। সরকার দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেয়। এ জন্যই কি আইনমন্ত্রী বেগম জিয়ার আপিল নিষ্পত্তির আগে রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষমা চাওয়ার কথা বলেছেন?
‘৪০১ ধারা নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। এটি আর পুনর্বিবেচনার সুযোগ নেই। থাকলে তিনি আইন পেশা ছেড়ে দিবেন’ আইনমন্ত্রীর এ বক্তব্যের সমালোচনা করে মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘আনিসুল হক একজন ভালো আইনজীবী। আমি চাই না তিনি আইন পেশা ছেড়ে চলে যান।’
বিএনপির এই আনজীবী বলেন, একজন অসুস্থ, বয়োজ্যেষ্ঠ সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আইনমন্ত্রীর কর্কশ বক্তব্য সরকারের প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে অনেকগুলো শর্ত দিয়েছিল। সুতরাং শর্ত দেওয়া বা প্রত্যাহার করা সম্পূর্ণ ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারা মোতাবেক সরকারের এখতিয়ার। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারা মোতাবেক সরকারের শর্ত সংশোধন করে খালেদা জিয়াকে মুক্তভাবে বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান ব্যারিস্টার খোকন।
জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেয়া হয়েছে: সিটিটিসি প্রধান
সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে Smart Approach পদক্ষেপ গ্রহণ করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সিটিটিসির তৎপরতায় ভেঙে দেয়া হয়েছে জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক। কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম(সিটিটিসি) কর্তৃক পরিচালনা করা হয়েছে ২৩ টি High Risk Operation। যাতে নিহত হয়েছে ৬৩ জন সন্ত্রাসী।
বৃহস্পতিবার(১ জুলাই) হলি আর্টিজান হামলার পাঁচ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে প্রেস ব্রিফিংয়ে বিস্তারিত জানান ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ও সিটিটিসি প্রধান মোঃ আসাদুজ্জামান বিপিএম(বার)।
ব্রিফিংয়ের শুরুতে হলি আর্টিজান হামলায় নিহতদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে তিনি বলেন, ভয়াবহ হামলার তদন্তভার সিটিটিসিকে দেয়া হলে সিটিটিসি স্বল্পতম সময়ে সন্ত্রাসী হামলায় জড়িত সন্ত্রাসী, পরিকল্পণাকারী, অর্থ যোগানদাতাসহ অভিযুক্ত সকলকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে।
তিনি বলেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান হিসেবে সিটিটিসি গ্রহণ করেছে কঠোর (Hard Approach) ও কোমলের (Soft Approach) সমন্বিত পদক্ষেপ অর্থাৎ Smart Approach। Smart Approach -এর অংশ হিসেবে সিটিটিসি আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন সেমিনার ও কর্মশালা আয়োজন করেছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময়, পুলিশ সদস্য, কারা কর্মকর্তা ও কারারক্ষী, জনপ্রতিনিধি, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, এনজিও, সংস্কৃতিকর্মী, সাংবাদিক, ধর্মীয় পান্ডিত্যসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ (Religious Scholar) উগ্রবাদী/সন্ত্রাসী (জামিনপ্রাপ্ত), তাদের বাবা-মা ও পরিবারের সদস্য, সন্ত্রাসী ঘটনার ভূক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সদস্য এবং বিভিন্ন অংশীজনের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত কর্মশালা।
সিটিটিসি প্রধান বলেন, সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের অংশগ্রহণে এ পর্যন্ত এ ধরনের ১৭৪ টি আলোচনা কর্মশালা আয়োজন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে ৩৯ হাজার ৪০০ জনকে উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সচেতন করে তোলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সকলের মতামতের ভিত্তিতে সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে একটি সমন্বিত কর্মকৌশল গ্রহণের গুরুত্ব উপলব্ধি করে সিটিটিসি ২০১৯ সালে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগ, নাগরিক সমাজ, শিক্ষা-গবেষণা ক্ষেত্রে কর্মরত ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা, আন্তর্জাতিক এনজিওসমূহের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে দেশে প্রথমবারের মত উগ্রবাদ বিরোধী জাতীয় সম্মেলনের আয়োজন করেছে। সাইবার স্পেসকে নিরাপদ রাখতে সিটিটিসি কর্তৃক সাইবার মনিটরিংসহ সচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত আছে।
তিনি আরো বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জঙ্গি বিরোধী জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে সিটিটিসি নিরলসভাবে কাজ করছে। জঙ্গি সংগঠনগুলোর বড় ধরনের নাশকতা করার সক্ষমতা এখন একে বারেই নেই। সিটিটিসি তাদের নেটওয়ার্ক ধ্বংস করে দিয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাত পৌনে ৯টার দিকে রাজধানীর গুলশানের ৭৯ নম্বর রোডের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় পাঁচজনের একটি সন্ত্রাসী দল উপস্থিত সাধারণ মানুষের উপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীদের নৃশংসতার বলি হয় দেশী-বিদেশী মোট ২০ জন নাগরিক। এদের প্রত্যেককেই নির্মমভাবে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে মারা যান ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, ১ জন ভারতীয়, ১ জন বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত আমেরিকান এবং ২ জন বাংলাদেশী নাগরিক। সেদিনের সম্মিলিত প্রতিরোধ অভিযানে মোট ৩২ জনকে জীবিত উদ্ধার হয়। এ ঘটনায় ৪ জুলাই, ২০১৬ সন্ত্রাস বিরোধী আইনে গুলশান থানায় মামলা রুজু হয়। তদন্তে ২১ জন আসামীর সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। যাদের মধ্যে পাঁচজন অপারেশন থান্ডারবোল্টে নিহত হন এবং পরবর্তী সময়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে আরও আটজন নিহত হন। বিচারে সাতজনকে মৃত্যুদন্ড ও একজনকে খালাস প্রদান করেন। ডিএমপি নিউজ।
সাত দিনের‘কঠোর’ লকডাউন শুরু; রাজধানীতে লোকজন কম বের হচ্ছেন , যানবাহন নেই, রাস্তায় সেনাবাহিনী -বিজিবির টহল

করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু ঠেকাতে রাজধানীসহ সারা দেশে শুরু হয়েছে এক সপ্তাহের কঠোর লকডাউন। বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে শুরু হয় এ লকডাউন। সব ধরনের যন্ত্রচালিত গণপরিবহন বন্ধ রয়েছে। খোলেনি মার্কেট ও দোকানপাট। রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে চেকপোস্ট বসিয়ে পুলিশ জেরা করছে। বাইরে বের হওয়ার কারণ জিজ্ঞাসাবাদ করছে তারা। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে টহল দিতে দেখা গেছে সেনাবাহিনী ও বিজিবির সদস্যদের।
পণ্যবাহী যানবাহন নির্বিঘ্নে চলাচল করছে। জরুরি প্রয়োজনে যারা বের হয়েছেন তারা রিকশায় চড়ে গন্তব্যে যাচ্ছেন।
সরজমিন রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, রিকশা ছাড়া কিছুই চলছে না। ব্যক্তিগত দুয়েকটি প্রাইভেট কার চললেও চেকপোস্টে পড়তে হচ্ছে পুলিশের জেরার মুখে। এছাড়া মোটরসাইকেলে দুজন বহন করলে পুলিশ তাদের নামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। গ্রহণযোগ্য উত্তর দিতে না পারলে গুনতে হচ্ছে জরিমানা।
এদিকে লকডাউন বাস্তবায়নে মোবাইল কোর্ট (ভ্রাম্যমাণ আদালত) পরিচালনার জন্য প্রশাসন ক্যাডারের ১০৬ জন কর্মকর্তাকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বুধবার তাদের নিয়োগ দিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে আদেশ জারি করা হয়।
উল্লেখ্য,বুধবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ২১টি শর্ত দিয়ে কঠোর লকডাউন ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় এ সময়ে জরুরি সেবা দেয়া দফতর-সংস্থা ছাড়া সরকারি-বেসররকারি অফিস, যন্ত্রচালিত যানবাহন, শপিংমল দোকানপাট বন্ধ থাকবে। খোলা থাকবে শিল্প-কারখানা। জনসমাবেশ হয় এমন কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যাবে না। এছাড়া প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হলেই গ্রেপ্তার করার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
বুধবার (৩০ জুন) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ মানুষের চলাচলে ‘বিধি-নিষেধ’ আরোপ করে ২১ দফা নির্দেশরা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।
এতে বলা হয়, করোনা ভাইরাসজনিত রোগের (কোভিড-১৯) সংক্রমণের বর্তমান পরিস্থিতিতে ১ জুলাই সকাল ৬টা থেকে ৭ জুলাই মধ্যরাত পর্যন্ত ‘বিধি-নিষেধ’ আরোপ করা হলো।
‘বিধিনিষেধ’:
১. সব সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্বশাসিত ও বেসরকারি অফিসসমূহ বন্ধ থাকবে।
২. সড়ক, রেল ও নৌ-পথে পরিবহন (অভ্যন্তরীণ বিমানসহ) ও সব ধরনের যন্ত্রচালিত যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে।
৩.শপিংমল/মার্কেটসহ সব দোকান বন্ধ থাকবে।
৪. সব পর্যটন কেন্দ্র, রিসোর্ট, কমিউনিটি সেন্টার ও বিনোদন কেন্দ্র বন্ধ থাকবে।
৫. জনসমাবেশ হয় এ ধরনের সামাজিক (বিবাহোত্তর অনুষ্ঠান (ওয়ালিমা), জন্মদিন, পিকনিক পার্টি ইত্যাদি), রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বন্ধ থাকবে।
৬. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, আদালতসমূহের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করবে।
৭. ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করার লক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করবে।
৮. আইন-শৃঙ্খলা এবং জরুরি পরিসেবা, যেমন- কৃষিপণ্য ও উপকরণ (সার, বীজ, কীটনাশক, কৃষি যন্ত্রপাতি ইত্যাদি), খাদ্যশস্য ও খাদ্যদ্রব্য, ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা, কোভিড-১৯ টিকাদান, রাজস্ব আদায় সম্পর্কিত কার্যাবলি, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস/জ্বালানি, ফায়ার সার্ভিস, টেলিফোন ও ইন্টারনেট (সরকারি-বেসরকারি), গণমাধ্যম (প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া), বেসরকারি নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ডাক সেবা, ব্যাংক, ফার্মেসি ও ফার্মাসিটিক্যালসসহ অন্যান্য জরুরি/অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ও সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অফিসসমূহের কর্মচারী ও যানবাহন প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়পত্র প্রদর্শন সাপেক্ষে যাতায়াত করতে পারবে।
৯. পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত ট্রাক/লরি/কাভার্ডভ্যান/কার্গো ভেসেল এ নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে থাকবে।
১০. বন্দরসমূহ (বিমান, সমুদ্র, রেল ও স্থল) এবং সংশ্লিষ্ট অফিসসমুহ এ নিষেধাজ্ঞার আওতা বহির্ভূত থাকবে।
১১. শিল্প-কারখানাসমূহ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণপূর্বক নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চালু থাকবে।
১২. কাঁচাবাজার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত উন্মুক্ত স্থানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কেনাবেচা করা যাবে। সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য সংগঠন/বাজার কর্তৃপক্ষ/স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি নিশ্চিত করবে।
১৩. অতি জরুরি প্রয়োজন ব্যতীত (ওষুধ ও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয়, চিকিৎসা সেবা, মরদেহ দাফন/সৎকার ইত্যাদি) কোনোভাবেই বাড়ির বাইরে বের হওয়া যাবে না। নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
১৪. টিকা কার্ড দর্শন সাপেক্ষে টিকা দেওয়ার জন্য যাতায়াত করা যাবে।
১৫. খাবারের দোকান, হোটেল-রেস্তোরাঁ সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খাবার বিক্রয় (অনলাইন/টেকওয়ে) করতে পারবে।
১৬. আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ঢালু থাকবে এবং বিদেশগামী যাত্রীরা তাদের আন্তর্জাতিক ভ্রমণের টিকিট প্রদর্শন করে গাড়ি ব্যবহারপূর্বক যাতায়াত করতে পারবে।
১৭. স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে মসজিদে নামাজের বিষয় ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় নির্দেশনা দেবে।
১৮. ‘আর্মি ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ বিধানের আওতায় মাঠ পর্যায়ে কার্যকর টহল নিশ্চিত করার জন্য সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ প্রয়োজনীয় সংখ্যক সেনা মোতায়েন করবে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট স্থানীয় সেনা কমান্ডারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি নিশ্চিত করবেন।
১৯. জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে সমন্বয় সভা করে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, র্যাব ও আনসার নিয়োগ ও টহলের অধিক্ষেত্র, পদ্ধতি সময় নির্ধাররণ করবেন। সেসঙ্গে স্থানীয়ভাবে বিশেষ কোনো কার্যক্রমের প্রয়োজন হলে সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেবেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগগুলো এ বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবে।
২০. জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় মাঠ পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করবে।
২১. স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক তার পক্ষে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীকে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দেবেন।
উল্লিখিত বিযষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সব সিনিয়র সচিব, সচিব, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। (ছবি কৃতজ্ঞতা-মানবজমিন,বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)।
হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার ৫ বছর; শেষ হয়নি বিচার, জেনে নিন হামলা-মামলার আদ্যোপান্ত, কি বলছে আইন শৃংখলা বাহিনী?
রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারি ও রেস্টুরেন্টে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পাঁচ বছর পূর্ণ হলো আজ ১ জুলাই। ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাত পৌনে ৯টার দিকে গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কের পাঁচ নম্বর প্লটের হোলি আর্টিজান বেকারি ও রেস্টুরেন্টে নারকীয় হামলায় চালায় জঙ্গিরা। জঙ্গিদের হামলায় দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ ২২ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ৯ জন ইতালির নাগরিক, ৭ জন জাপানি, একজন ভারতীয় নাগরিক, একজন বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত নাগরিক। বাকি দুজন হলেন বাংলাদেশি নাগরিক। জঙ্গিরা নারকীয় হত্যাযজ্ঞের পর রাতভর ওই বেকারিতে বেশ কয়েকজন অতিথি ও বেকারির কর্মচারীদের জিম্মি করে রাখে। পরদিন সকালে সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডোর নেতৃত্বে পুলিশ ও র্যাবের যৌথ অভিযানে ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ পরিচালিত হয়। জিম্মি থাকা অন্তত ৩৫ জনকে উদ্ধার করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।

এদেশে জঙ্গীবাদের ইতিহাসে হলি আর্টিজানের হামলা ছিল নজিরবিহীন ও ভয়ঙ্কর। জঙ্গীরা তাদের সাংগঠনিক শক্তিমত্তা জানান দেয়ার জন্যই এ হামলা চালায়। এর আগে এত বড়মাপের জঙ্গী হামলা কখনও হয়নি। এ হামলার আগে অর্থাৎ পুরো ২০১৫ সাল এবং ২০১৬ সালের প্রথম কয়েক মাসে বিভিন্ন ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে বাংলাদেশে যে কোন সময় বড়মাপের একটি জঙ্গী হামলা হতে পারে। ২০১৫ সালে একের পর এক লেখক, ব্লগার ও প্রকাশক হত্যার সময় নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিলেন যে জঙ্গীবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। তারই ইঙ্গিতস্বরূপ ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গুলশানে ইতালির নাগরিক চেজারে তাবেলাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। মধ্যপ্রাচ্য-ভিত্তিক জঙ্গী সংগঠন ইসলামিক স্টেট গ্রুপ সে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে। তখন থেকে অনেকেই আঁচ করছিলেন যে বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশী নাগরিকরা হুমকির মুখে।
শেষ হয়নি বিচার প্রক্রিয়া:
দীর্ঘ পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি হলি আর্টিজান হত্যা মামলার বিচারকাজ। ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনাল এই মামলায় ৭ জঙ্গির মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। এরপর আসামিরা সবাই জেল আপিল করে। এ ছাড়া ট্রাইব্যুনালের রায়ে খালাস পাওয়া একজনের বিরুদ্ধে আপিল করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। কিন্তু ওই পর্যন্তই। এরপর প্রায় ১৯ মাস পেরিয়ে গেলেও বিচারিক কার্যক্রমের কোনও অগ্রগতি নেই। উচ্চ আদালতে থমকে আছে হলি আর্টিজানে ভয়াবহ হামলা মামলা বিচার।

আদালত ও জেল সূত্রে জানা গেছে, এই মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে তিন জন— মামুনুর রশীদ রিপন, রাকিবুল ইসলাম রিগ্যান ও আসলাম হোসেন র্যাশ ২০১৯ সালের ৪ ডিসেম্বর জেল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে উচ্চ আদালতে আপিল করে। এছাড়া বাকি চার আসামি— হাদিসুর রহমান সাগর, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব ওরফে রাজীব গান্ধী, আব্দুস সবুর খান ও শরিফুল ইসলাম খালিদ ২০১৯ সালের ৫ ডিসেম্বর খালাস চেয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করেছে। একই দিনে ডেথ রেফারেন্স অনুমোদনের জন্যেও নথিপত্র উচ্চ আদালতে পাঠানো হয়।
আদালত সূত্র জানায়, ট্রাইবুন্যালের রায়ে মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান নামে চার্জশিটভুক্ত যে আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে, রাষ্ট্রপক্ষ সেই রায় পুনর্বিবেচনার জন্য হাইকোর্টে আপিল করেছে। তবে গত ১৭ মাসে কোনও আপিলেরই শুনানি হয়নি। এই আপিলের আবেদন শুনানির জন্য এখনও পর্যন্ত কোনও বেঞ্চ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি।
হাইকোর্ট সূত্রে জানা গেছে, ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য ২০২০ সালের ১৬ আগস্ট আলোচিত এ মামলার পেপারবুক প্রস্তুত হয়ে হাইকোর্টে পৌঁছায়। এক হাজার ৯০০ পৃষ্ঠার এই পেপারবুক শুনানির জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। এখন শুধু শুনানির দিন নির্ধারণের অপেক্ষা। করোনা পরিস্থিতির কারণে মামলাটির শুনানি শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না।
জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, ‘হলি আর্টিজান মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের পেপারবুক তৈরি হয়েছে। এটি এখন আদালতে উঠবে। এর পাশাপাশি কেউ যদি আপিল করে থাকে, সেটি ব্যক্তিগত আইনজীবী বা জেল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমেই হোক না কেন, তা শুনানি হবে। শুনানি শেষে উচ্চ আদালত যে নির্দেশনা বা আদেশ দেবেন, তাই প্রতিপালন করা হবে।’
গুলশানের এই ঘটনায় হলি আর্টিজানের দুই জন শেফ নিহত হন। এদের একজন সাইফুল ইসলাম চৌকিদারকে প্রথমে সন্দেহভাজন জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও পরে মামলার তদন্তে তার সঙ্গে জঙ্গিদের কোনও সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। এছাড়া জাকির হোসেন শাওন নামে আরেকজন বেকারি কর্মচারী হামলার পর পালিয়ে আসলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাকে হেফাজতে নেয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক সপ্তাহ পর ওই বছরেরই ৮ জুলাই মারা যান তিনি। শাওনের পরিবারের অভিযোগ, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নির্যাতনে তার মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর পর তার শরীরে অসংখ্য জখমের চিহ্ন ছিল।


মামলার তদন্ত:
বিশ্বব্যাপী আলোচিত এই হামলার ঘটনায় সেনাবাহিনীর প্যারা-কমান্ডোর নেতৃত্বে পুলিশ ও র্যাবসহ যৌথ বাহিনীর অপারেশনে পাঁচ জঙ্গি নিহত হয়। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া গুলশান থানার মামলাটি তদন্ত করে ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট- সিটিটিসি। এই হামলায় মোট ২১ জনের সম্পৃক্ততা পায় তদন্ত সংস্থা সিটিটিসি। এর মধ্যে পাঁচ জঙ্গি ঘটনাস্থলেই মারা যায়। এছাড়া হামলার পরবর্তী পুলিশ ও র্যাবের বিভিন্ন অভিযানে নিহত হয় আরও আট জন। জীবিত বাকি ৮ জনকে আসামি করে ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
চার্জশিটভুক্ত আট আসামিরা হলো- জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র্যাশ, হাদিসুর রহমান সাগর, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, আব্দুস সবুর খান, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ, মামুনুর রশিদ রিপন ও মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান। চার্জশিটভুক্ত আসামিদের মধ্যে মামুনুর রশিদ রিপন ও শরিফুল ইসলাম খালিদ ছাড়া বাকি ছয় জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এ মামলার চার্জশিট দেওয়ার সময় রিপন ও খালিদ পলাতক ছিল। পরে এলিট ফোর্স র্যাব ২০১৯ সালের ১৯ জানুয়ারি গাজীপুর থেকে মামুনুর রশীদ রিপন ও ২৫ জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে শরীফুল ইসলাম খালিদকে গ্রেফতার করে।
মামলার চার্জশিটে বলা হয়েছে, আলোচিত গুলশান হামলায় জড়িত বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত কানাডিয়ান নাগরিক ও হামলার মূল পরিকল্পনকারী তামিম আহমেদ চৌধুরী, নব্য জেএমবির নুরুল ইসলাম মারজান, সরোয়ার জাহান, তানভীর কাদেরী, বাশারুজ্জামান চকলেট, মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম, মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজান ও রায়হানুল কবির রায়হান বিভিন্ন অভিযানে নিহত হয়েছে। হামলার সময়ই কমান্ডো অভিযানে নিহত হয়েছিল পাঁচ জঙ্গি— রোহান ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম, মীর সামিহ মোবাশ্বের, শফিকুল ইসলাম উজ্জল ও খায়রুল ইসলাম পায়েল।
বিচার প্রক্রিয়া ও রায়
আদালত সূত্র জানায়, আলোচিত এই হামলার মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়ার পর ২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গঠন করে। ২০১৮ সালের ৩ ডিসেম্বর এই মামলার প্রথম সাক্ষ্য নেওয়া হয় বাদী এসআই রিপনের। এরপর ধারাবাহিকভাবে মোট ২১১ জন সাক্ষীর মধ্যে ১১৩ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়। ২০১৯ সালের ২৭ অক্টোবর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিটিটিসির পরিদর্শক হুমায়ূন কবিরের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে আদালত ২৭ নভেম্বর রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করেন।
২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মজিবুর রহমান আট আসামির মধ্যে সাত জনকে ৬(২)(অ) ধারায় মৃত্যুদণ্ড ও প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হলো— জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র্যাশ, হাদিসুর রহমান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, আব্দুস সবুর খান, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ ও মামুনুর রশিদ রিপন। আদালতের রায়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অন্য ধারাতেও ভিন্ন ভিন্ন সাজার আদেশ দেওয়া হয়। তবে আদালত মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজানকে সকল ধারা থেকেই খালাস দেন।
ভয়ে এখনো কেঁপে ওঠেন গুলশানবাসী:
২০১৬ সালের ১ জুলাই এ হামলায় কেঁপে ওঠে গোটা রাজধানী। গুলশানের ওই রেস্টুরেন্টে জঙ্গীরা আকস্মিক হামলা চালিয়ে হত্যা করে দেশী-বিদেশী ২৩ নাগরিককে। হামলার পাঁচ বছর পর আজও সেদিনের ঘটনা স্মরণে আসলে আঁতকে ওঠে গুলশানবাসী। হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টটি উঠে গেলেও এখন সেখানে বসবাস বাড়ির মালিকেরই। অন্যদিকে ভিন্ন নামে ব্যবসা শুরু করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে হলির মালিক। দিবসটি উপলক্ষে র্যাব পুলিশসহ দেশী-বিদেশী বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠন গভীর শ্রদ্ধায় নিহতদের স্মরণ করবেন।
যে ভাবে হামলা করেছিলো জঙ্গিরা:
ঘটনাস্থল গুলশান-২-এর ৭৯ নম্বর সড়ক। এর শেষ প্রান্তেই লেকের পাড়ে ৫ নম্বর প্লট। হামলার বছর দুয়েক আগে জুন মাসে এখানেই গড়ে তোলা হয়েছিল হলি আর্টিজান বেকারি। ভবনটির ওপরের তলায় ছিল বেকারির রান্নাঘর এবং মালামাল রাখার ঘর। আর নিচতলায় বেকারির বিক্রয়কেন্দ্র। রেস্তরাঁর রান্নাঘর ও অতিথিদের বসার জায়গা। সামনে সবুজ লন। দোতলায়ও ছিল অতিথি বসার ব্যবস্থা। লেকপাড়ের সবুজ লনযুক্ত এই বেকারি ছিল বিদেশীদের কাছে খুবই প্রিয়। খোলা থাকত সপ্তাহের সাত দিনই। শুক্র ও শনিবার সকাল ৮টায় খুলত। বন্ধ হতো রাত ১০টায়। ওই দুদিন এখানে সকালের নাশতার ব্যবস্থা থাকত। বাকি পাঁচ দিন খোলা থাকত সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত। বেকারিতে ইতালিয়ান বিভিন্ন ধরনের কেক ও রুটিজাতীয় খাবার আর রেস্তরাঁয় মূলত স্প্যানিশ খাবার বানানো হতো। কমপক্ষে ৫০-৬০ জন অতিথি থাকতেন নিয়মিত। অতিথিদের প্রিয় খাবারের তালিকায় ছিল স্যামন মাছ, কোরাল মাছ, স্প্যানিশ খাবার পায়লা, কালামার ও গামবাস। চিকেন ফ্রাই, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, বার্গার, পিৎজাও খেতেন অনেকে। শুক্র ও শনিবার সকাল থেকেই বিদেশী অতিথিরা আসা শুরু করতেন। অনেকে বাসা থেকে কাপড় বা ম্যাট্রেস জাতীয় কিছু নিয়ে আসতেন। সকালের নাশতার পর লনে তা বিছিয়ে শুয়ে থাকতেন। তাঁরা দুপুরের খাবার খেতেন। এরপর একেবারে রাতের খাবার খেয়ে বাড়ি ফিরতেন।
এমন একটি বিদেশীপ্রিয় রেস্টুরেন্টেই সেই রাতেই আকস্মিক হানা দেয় দেশীয় ৫ সশস্ত্র জঙ্গী। তারা দুটি দলে বিভক্ত হয়ে বসুন্ধরার বাসা থেকে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার উদ্দেশে রওনা হয়। সেদিন বিকেল ৫টা থেকে সাড়ে ৫টার দিকে কাঁধে থাকা ব্যাগে অস্ত্র-গুলি, গ্রেনেড, চাকু নিয়ে বের হয়ে রাত ৮টা ৪২ মিনিটের দিকে সেখানে পৌঁছে। প্রথমে নিবরাস ইসলাম ও মীর সামেহ মোবাশ্বের এবং একটু পর রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম বাঁধন কাঁধে ব্যাগ নিয়ে হলি আর্টিজানের মূল ফটকে যায়। তখন ফটকের নিরাপত্তাকর্মী নূর ইসলাম তাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে নিবরাস নিরাপত্তাকর্মীর ডান চোখের নিচে ঘুষি মেরে তারা হলি আর্টিজানের ভেতর ঢুকে যায়। ঢুকেই গুলি ও বোমা নিক্ষেপ করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। তারা সবাই তরুণ। তারা ঢুকেই জিম্মি করে ফেলে সবাইকে। মুহূর্তেই খবর রটে যায়, গোটা দুনিয়ায়। আল জাজিরা, বিবিসি সিএনএনসহ বিশ্বের শীর্ষ সংবাদমাধ্যমগুলো প্রচার করে ঢাকার গুলশানে জঙ্গী হামলা। আতঙ্কে কাঁপতে শুরু করে গোটা দেশ। আধা ঘণ্টার মধ্যেই পাঁচ জঙ্গীর কাছে থাকা অস্ত্র-গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে দেশী-বিদেশীদের হত্যা করে। বিভিন্ন রুম, টয়লেট, চিলারঘর, হিমঘর ইত্যাদি স্থান থেকে বিদেশীদের বের করে এনে তারা এই হত্যাযজ্ঞ চালায়। একপর্যায়ে তারা দেশী-বিদেশীদের গুলি করে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। জঙ্গীরা নয়জন ইতালিয়ান, সাতজন জাপানী, একজন ভারতীয় নাগরিক এবং বাংলাদেশের ফারাজ আইয়াজ হোসেন, অবিন্তা কবির, ইশরাত আখন্দ, বনানী থানার ওসি সালাহউদ্দিন ও দুজন পুলিশ কর্মকর্তাসহ মোট ২৩ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। পরদিন সকাল পৌনে ৮টায় সেখানে যৌথ বাহিনী অভিযান চালায়। সাঁজোয়া যানের ধাক্কা এবং অবিরাম গুলিতে তছনছ হয়ে যায় ভবনটি। থান্ডার বোল্টের অভিযানে নিহত হয় পাঁচ জঙ্গী। অবসান ঘটে এগারো ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির। গোটা জাতি ফিরে পায় স্বস্তি।

এমন একটি নজিরবিহীন জিম্মি দশায় দেশী-বিদেশী নাগরিকদের হত্যার ঘটনায় স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল দেশের সব ক’টা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় যথাযথ কর্তৃপক্ষের আদেশক্রমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও র্যাব সহযোগী সম্মিলিত ‘অপারেশন থান্ডার বোল্ট’ পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়। সকাল ৭টার দিকে প্যারা কমান্ডো হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্ট রেকি করে। সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা শুরু হয়। প্যারা কমান্ডো সদস্যরা ক্রলিং করতে করতে সামনে দিকে এগোতে থাকে এবং গুলি ছুড়তে থাকে পদাতিক ডিভিশন ও স্লাইপার টিম। এ সময় জঙ্গীরাও গুলি ছুড়তে থাকে। ১২ থেকে ১৩ মিনিটের মধ্যে সব সন্ত্রাসী নির্মূল করে প্যারা কমান্ডো টার্গেট এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। পরে অপারেশনের অন্যান্য কার্যক্রম সম্পন্ন করে সকাল সাড়ে ৮টায় অভিযানের সমাপ্তি ঘটে। অভিযানে এক জাপানী ও দুজন শ্রীলঙ্কার নাগরিকসহ ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযান থান্ডার বোল্টে সব জঙ্গীই সেদিনই নিহত হয়। ঘটনাস্থলেই পড়েছিল পায়ে ক্যাডস, জিন্স প্যান্ট ও মাথায় ক্যাপ পরিহিত সব জঙ্গীর লাশ।

তৎপর আইনশৃংখলা বাহিনী:
ইতিহাসের ভয়াবহ এ হামলায় বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর চোখ খুলে দিয়েছে। জঙ্গীবাদবিরোধী অভিযানের নক্সা নতুন করে সাজায় বাংলাদেশের পুলিশ। জঙ্গীবাদবিরোধী গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং অভিযান পরিচালনার জন্য কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট গঠন করা হয়। এর পাশাপাশি পুলিশ সদর দফতরে একটি আলাদা গোয়েন্দা শাখা প্রতিষ্ঠা করা হয়। যাদের কাজ জঙ্গী তৎপরতা সম্পর্কে নজরদারি করা। এ দিবসটির দুদিন আগে অর্থাৎ মঙ্গলবার র্যাব মহাপরিচালক বেশ দৃঢ়তার সঙ্গেই ঘোষণা দিয়েছেন ২০১৬ সালের পর র্যাব অনেক সক্ষমতা অর্জন করেছে। ইচ্ছে করলেও হলির মতো আরেকটা হামলা চালানোর সামর্থ্য নেই জঙ্গীদের। র্যাব এখন ওদের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে। হলির হামলার পর এ পর্যন্ত ১৫শ’ জঙ্গীকে গ্রেফতার করা হয়। এ বিষয়ে পুলিশ কর্মকর্তারাও বলছেন, হলি আর্টিজানের পরে বাংলাদেশে যতগুলো জঙ্গীবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে সেগুলো সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে। বাকি যারা আছেন তাদের নেতৃত্ব পর্যায়ে একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ে কাজ করার মতো এখনও তাদের যথেষ্ট শক্তি আছে। জঙ্গীরা যাতে সংগঠিত হতে না পারে সেজন্য পুলিশ সজাগ রয়েছে।
খালেদা জিয়ার ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই আসে না: খন্দকার মাহবুব হোসেন
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো উচ্চ আদালতে মুলতবি রয়েছে। তাকে সাজা দেয়া হয়েছে সাজানো রাজনৈতিক মামলায়। জোর করে তাকে দণ্ডিত করা হয়েছে। ফলে খালেদা জিয়ার ক্ষমা চাওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না।
খালেদা জিয়ার প্রধান আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন এই তথ্য জানিয়েছেন। বুধবার জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, দোষ স্বীকার করে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাওয়া ছাড়া খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতে পারবেন না। আইনে এমন কোনো সুযোগ নেই। আইনমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে খন্দকার মাহবুব হোসেন বুধবার রাতে গণমাধ্যমে এই প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, আইনমন্ত্রীর বক্তব্য অত্যন্ত দূ:খজনক। রাজনৈতিক হীন উদ্দেশ্যে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এখন মিথ্যা তথ্য দেয়া হচ্ছে।
এদিকে আইনমন্ত্রীর বক্তব্য প্রসঙ্গে বিএনপি দলীয়ভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায় নি।











