ঢাকা   শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬, ৫ আষাঢ় ১৪৩৩   সকাল ৯:৪৯ 

Home Blog Page 143

বিরোধ নিষ্পত্তিতে নগর আদালত প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য’

0

স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ নিষ্পত্তিতে গ্রাম আদালতের আদলে সিটি করপোরেশনে নগর আদালত প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন গণমাধ্যমকর্মী, আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী ও জনপ্রতিনিধিরা। দেশের সিটি কর্পোরেশন এলাকায় এ ধরনের সালিশী আদালত কাজ করবে।
আইন, আদালত, সংবিধান ও মানবাধিকার বিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের সদস্যদের নিয়ে আয়োজিত কর্মশালায় এ আদালত প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন আলোচকরা।

মাদারীপুর লিগ্যাল এইড অ্যাসোসিয়েশন উদ্যোগে সংস্থাটির কার্যালয়ে শুক্র ও শনিবার দুদিনব্যাপী এই কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। মাদারীপুর লিগ্যাল এইড অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে ব্লাস্ট, নাগরিক উদ্যোগ, এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্লাটফর্ম, বাংলাদেশ যৌথভাবে এই কর্মশালার আয়োজন করে। কর্মশালার সহযোগিতায় ছিল ল’ রিপোর্টার্স ফোরাম।

কর্মশালায় শুক্রবার নগর আদালত নিয়ে আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, সালিশ বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের একটি জনপ্রিয় ব্যবস্থা৷ স্বল্প সময়ে এই পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে মামলাজট নিরসন করা সম্ভব। সালিশের জন্য ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যায়ে গ্রাম আদালত ও পৌর কর্পোরেশন আছে। কিন্তু সিটি কর্পোরেশনে সেধরনের আইনি কোনো সালিশী ব্যবস্থা নাই।

তাই বক্তারা এজন্য নগর আদালত আইন প্রণয়নের দাবি জানান। এধরনের প্রস্তাবিত একটি আইনের খসড়াও তুলে ধরা হয় কর্মশালায়। সেই খসড়া নিয়ে আলোচকরা তাদের মতামত তুলে ধরেন।
কর্মশালায় আলোচনায় অংশ নেন ব্লাস্টের সম্মানিক নির্বাহী প্রধান ব্যারিস্টার সারা হোসেন, মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন, মাদারীপুর লিগ্যাল এইডের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফজলুল হক, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, মাদারীপুর সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ও মাদারীপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট ওবায়দুর রহমান খান, মাদারীপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র ও বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আলম বাবু চৌধুরী, মাদারীপুর পৌরসভার প্যানেল মেয়র সাইদা সালমা, কাউন্সিলর ডেইজি আফরোজ, মাদারীপুর লিগ্যাল এইড অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট খান মো. শহীদ, সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট ইব্রাহিম মিয়া।

শনিবার মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নে সরাসরি গ্রাম্য সালিশ ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করেন অংশ নেয়া সাংবাদিকরা৷

কর্মশালায় ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি মাশহুদুল হক, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সভাপতি ইলিয়াস হোসেন, সিনিয়র সদস্য আশরাফ-উল আলম, এমএ নোমান, এলআরএফ এর সহ-সভাপতি আজিজুল ইসলাম পান্নু, সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ ইয়াছিন, যুগ্ম সম্পাদক সাইদুল ইসলামসহ ২৩ জন সদস্য অংশ নেন৷ প্রেস বিজ্ঞপ্তি।

হয়ে গেলো স্বপ্নের পদ্মা সেতু, দেশের মানুষের মনে উচ্ছ্বাস, যান চলবে ২০২১ এর ডিসেম্বরে

0

দক্ষিণ জনপদের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণে যে বিপুল কর্মযজ্ঞের সূচনা হয়েছিল পদ্মার পাড়ে, তা পূর্ণ অবয়ব পেল বৃহস্পতিবার।

বেলা ১২টা ২ মিনিটে সেতুর মাওয়া প্রান্তের ১২ ও ১৩ নম্বর খুঁটির ওপর ঠিকঠাক বসে গেল টু-এফ নম্বর স্প্যানটি।

আর এর মধ্য দিয়ে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার এই সেতুর পুরো মূল কাঠামো দৃশ্যমাণ হল; তৈরি হল রাজধানীর সঙ্গে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগের পথ।

পদ্মা সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী (মূল সেতু) দেওয়ান মো. আব্দুর কাদের জানান, এরপর দ্বিতল এই সেতুর ঢালাইয়ের কাজ, অ্যাপ্রোচ রোড ও ভায়াডাক্ট প্রস্তুত করা, রেলের জন্য স্ল্যাব বসানো হয়ে গেলেই স্বপ্নের পদ্মাসেতু যানবাহন চলাচলের উপযোগী হবে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

এক বছরের মধ্যেই সেতুটি চালু করা যাবে বলে ইতোমধ্যে আশা প্রকাশ করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।
এই মাহেন্দ্রক্ষণ ঘিরে পদ্মাপাড়ে ছিল উৎসবের আমেজ। কেবল পদ্মার দুই তীরের বাসিন্দারা নন, ঢাকা থেকেও অনেকে আসেন সেতুর শেষ স্প্যানটি বসানোর কাজ নিজে চোখে দেখতে। নৌকা, ট্রলার ও স্পিডবোট ভাড়া করে তারা নদীতে কাছাকাছি জায়গায় অবস্থান নেন। শেষ স্প্যানটি বসানো হয়ে গেলে উল্লাস প্রকাশ করেন তারা।

নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান মো. আব্দুর কাদের জানান, গত শুক্রবার পদ্মা সেতুর ৪০তম স্প্যান স্থাপনের মধ্য দিয়ে ছয় কিলোমিটার দৃশ্যমান হয়। ৪১তম স্প্যানটি বসাতে বুধবারই সব প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হয়।

৩২০০ টন ওজনের ১৫০ মিটার দীর্ঘ স্প্যানটি মাওয়ার কুমারভোগের কন্সট্রাকশন ইয়ার্ড থেকে নিয়ে ১২ ও ১৩ নম্বর খুঁটির কাছে পৌঁছে যায় ভাসমান ক্রেইন ‘তিয়ান ই’। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় হালকা কুয়াশার মধ্যেই ইঞ্চি মেপে শুরু হয় স্প্যান স্থাপনের কাজ।

বেলা ১২টা ২ মিনিটে সেই কাজ শেষ হলেই মুন্সিগঞ্জের মাওয়া থেকে শরীয়তপুরের জাজিরা পর্যন্ত পদ্মার এপার-ওপার যুক্ত হয়ে যায় বলে জানান নির্বাহী প্রকৌশলী।
স্বপ্নপূরণে প্রস্তুত পদ্মাপাড়

যে ৪১টি স্প্যান দিয়ে পুরো পদ্মা সেতু তৈরি হচ্ছে, তার মধ্যে জাজিরা প্রান্তে ২০টি বসানো হয়েছে, আর মাওয়া প্রান্তে বসানো হয়েছে ২০টি স্প্যান। একটি স্প্যান বসেছে মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তের মাঝখানে।

দ্বিতল এই সেতুতে স্প্যানের ওপর কংক্রিটের স্ল্যাব বসানোর কাজ শেষ হলেই পিচ ঢালাই হবে। ২২ মিটার প্রশস্ত এই সেতুতে চারটি লেইনে যানবাহন চলতে পারবে। আর নিচ দিয়ে এক লাইনে চলবে ট্রেন। ওই এক লাইনেই মিটারগেজ ও ব্রডগেজ- দুই ধরনের ট্রেন চলাচলের ব্যবস্থা হচ্ছে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য (মুন্সীগঞ্জ-২) অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি বলেন, “নিজস্ব অর্থায়নে এই সেতু নির্মাণ করে বাঙালি বিশ্বর সামনে নিজেদের সক্ষমতার জানান দিল। এর মূলে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্ত।”

এই সেতু বাস্তাবায়নের জন্য যাদের ত্যাগ, শ্রম, ঘাম রয়েছে, তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, “এই সেতুর সুফল ভোগ করবে পুরো জাতি।” ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় থাকার সময়ই পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু তা শুরু হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ফিরে পুনরায় পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। প্রকল্পে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ঋণ সহায়তার প্রস্তাব নিয়ে আসে বিশ্ব ব্যাংক।

কিন্তু বনিবনা না হওয়ায় পদ্মা সেতু প্রকল্পের বাস্তবায়ন বিলম্বিত হতে থাকে। ২০১০ সালের জুলাইয়ে সেতু নির্মাণের জন্য প্রাক-যোগ্যতা দরপত্র মূল্যায়ন করে পাঁচ দরদাতাকে বাছাই করে তা বিশ্ব ব্যাংকের অনাপত্তির জন্য পাঠানো হলেও সংস্থাটি তা ঝুলিয়ে রাখে।

এরপর পদ্মা সেতুতে ‘সম্ভাব্য দুর্নীতির’ অভিযোগ আনে বিশ্ব ব্যাংক। দীর্ঘ টানাপোড়েন শেষে বাংলাদেশ বিশ্ব ব্যাংককে ‘না’ বলে দেয়।

সেই টানাপড়েনে একজন মন্ত্রীকে সরে যেতে হয়, তখনকার সেতু সচিবকে দুদকের মামলায় কারাগারেও যেতে হয়। অভিযোগের সত্যতা না থাকায় সেই মামলায় পরে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় দুদক। কানাডার আদালতেও দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।

শেষ পর্যন্ত নকশা অপরিবর্তিত রেখে নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে শুরু হয় সেই বিপুল কর্মযজ্ঞ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে মূল সেতুর নির্মাণ ও নদী শাসন কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এরপর ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর খুঁটিতে বসানো হয় প্রথম স্প্যান।
মোট ৪২টি পিলারে ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের ৪১টি স্প্যান বসিয়ে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতুর মূল কাঠামো তৈরি হয়। কিন্তু মাঝে ২২টি খুঁটির নিচে নরম মাটি পাওয়া গেলে নকশা সংশোধনের প্রয়োজন হয়।
পরে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নকশা সংশোধন করে পাইল বাড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেয়। তাতে বাড়তি সময় লেগে যায় প্রায় এক বছর। এরপর করোনাভাইরাস মহামারী আর বন্যার মধ্যে কাজের গতি কমে যায়। সব বাধা পেরিয়ে অক্টোবরে বসানো হয় ৩২তম স্প্যান। এরপর বাকি স্প্যানগুলো বসানো হয়ে যায় অল্প সময়ের মধ্যেই।
মূল সেতু নির্মাণের কাজটি করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (এমবিইসি) ও নদীশাসনের কাজ করছে দেশটির আরেকটি কোম্পানি সিনোহাইড্রো করপোরেশন। দুটি সংযোগ সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণ করেছে বাংলাদেশের আবদুল মোমেন লিমিটেড।

সিনোহাইড্রো করপোরেশনই পদ্মা সেতুর জন্য নদী শাসনের কাজ করছে। গত নভেম্বর পর্যন্ত সে কাজের ৭৬ শতাংশ শেষ হয়েছে। সব মিলিয়ে নভেম্বর পর্যন্ত পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ ৮২ দশমিক ৫০ শতাংশ শেষ হয়েছিল।
৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দরের সঙ্গে রাজধানী এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। তাতে মোট দেশজ উৎপাদন এক দশমিক দুই শতাংশ বাড়বে এবং প্রতি বছর শূন্য দশমিক ৮৪ শতাংশ হারে দারিদ্র্য কমবে বলে সরকার আশা করছে।

বৈষম্য বিরোধ আইন প্রণয়নের কাজ চলছে, জানালেন আইনমন্ত্রী; বললেন, করোনা পরিস্থিতিতেও মানবাধিকার লঙ্ঘন সহ্য করা হবে না

0

সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘনকে অত্যন্ত ঘৃণিত অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে। মানবাধিকারের প্রতি সরকারের যে প্রতিশ্রুতি তা সব সময় পালন করার চেষ্টা করবে এবং চলমান করোনা পরিস্থিতিতেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে সরকারের কোন আপোষকামিতা হবে না।
“ঘুরে দাঁড়াবো আবার, সবার জন্য মানবাধিকার” প্রতিপাদ্য নিয়ে মানবাধিকার দিবস ২০২০ উদ্যাপনের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের উদ্যোগে আয়োজিত এক ভার্চুয়াল সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে যুক্ত হয়ে এসব কথা বলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।
গৃহ নির্যাতন ও যৌন নির্যাতনের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, এসব অপরাধ কখনই সহ্য করা হবে না। সরকার জনগণকে সে বার্তা দিয়ে যাচ্ছে পাশাপাশি বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। তিনি বলেন, শুধু আইন করে ও সাজা বাড়িয়ে এসব নির্যাতন বন্ধ হবে না। জনগণকেও সোচ্চার হতে হবে। এ ব্যাপারে মানবাধিকার কমিশনেরও যথেষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে। তাহলে এসব অপরাধ অবশ্যই কমবে।
তিনি বলেন, সরকারের দায়িত্ব যাতে মানবাধিকার লঙ্ঘিত না হয়। এক্ষেত্রে মানবাধিকার কমিশন একটি চেক এন্ড ব্যালান্সের কাজ করবে। কোথাও মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে তা প্রথমে সরকারকে জানাবে। এরপর সরকার কোন পদক্ষেপ না নিলে তারা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘিত হওয়ার কোন বার্তা সরকারকে অবহিত করলে সরকার অবশ্যই সে ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
মুক্ত আলোচনায় উত্থাপিত এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, বৈষম্য বিরোধ আইন আগামী বছর একটি আইন হিসেবে জনগণ দেখতে পাবেন। এই আইন প্রণয়নের কাজ বর্তমানে শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মানুষ মানবাধিকারের বিষয়গুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করে ধারণ করে। কোভিড ১৯ আমাদের মানবাধিকারের গতানুগতিক চিন্তাধারা বদলে দিয়েছে। সেজন্যই অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে এবছর ঘুরে দাঁড়াবো আবার, সবার জন্য মানবাধিকার, প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তাই করোনা পরিস্থিতিতে মানুষের দুঃখ-কষ্ট ও জীবন-জীবিকা নির্বাহের অভিজ্ঞতা থেকে বেড়িয়ে এসে নতুন করে জীবন সাজাতে হবে এবং সেখানে মানবাধিকারকে যথেষ্ঠ গুরুত্ব দিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে।

তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে সারা বিশ্বে মানবাধিকারের অনেক লঙ্ঘন হচ্ছে। আমাদেরকে এসব অপরাধের জবাব দিতে হবে যাতে সেগুলোর পুনরাবৃত্তি না ঘটে। সে ব্যবস্থা করতে হবে।

মন্ত্রী বলেন, বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারীর চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশকেও মোকাবিলা করতে হবে। কারণ বাংলাদেশ পৃথিবীর বাইরে নয় এবং এখানকার মানুষ কোভিড -১৯ এ যথেষ্ঠভাবে আক্রান্ত হয়েছে। সরকার চেষ্টা করছে জনগণের জীবন-জীবিকার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য। জনগণের জীবন-জীবিকার স্থিতি দেওয়ার জন্য সরকার ১৪.১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। দরকার হলে আরও প্রণোদনা দিবে।

তিনি বলেন, সরকার বিনামূল্যে করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছে। এ রোগের ভ্যাক্সিনও বিনামূল্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জনগণকে দেওয়া হবে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগমের সভাপতিত্ব অনুষ্ঠিত সভায় বাংলাদেশে ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি সুদীপ্ত মূখার্জী, বাংলাদেশে জাতিসংঘর আবাসিক সমন্বয়কারী মিয়া সেপ্পো, কমিশনের সার্বক্ষণিক সদস্য ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ বক্তব্য রাখেন।
এর আগে বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে এক মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুরকারী ও উসকানিদাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হাইকোর্টের নির্দেশ

0

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ‘ভাঙচুরকারী, অপরাধী ও ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করে উসকানিদাতাদের’ বিরুদ্ধে সংবিধান এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট।
সেই সঙ্গে ভাস্কর্য, ম্যুরাল, প্রতিকৃতি সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে এবং এসব বিষয়ে জনমনের বিভ্রান্তি দূর করতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ও বায়তুল মোকারম মসজিদের খতিবকে তাদের বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রচার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জাতির পিতার ভাস্কর্য, ম্যুরাল, প্রতিকৃতি সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে করা রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের ভার্চুয়াল হাই কোর্ট বেঞ্চ মঙ্গলবার রুলসহ এ আদেশ দেয়। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
জাতির পিতার ভাস্কর্যের সুরক্ষা, যথাযথ মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রে ‘স্বার্থান্বেষী মহল, ভাঙচুরকারী ও অপরাধীদের’ বিরুদ্ধে সংবিধানের ৭(ক) অনুচ্ছেদ ও দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারা ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না এবং ভাঙচুরকারী ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বিবাদীদের নিস্ক্রিয়তা কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না- তা জানতে চাওয়া হয়েছে রুলে।
স্বরাষ্ট্র সচিব, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, পুলিশ প্রধান, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালককে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।  
আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী শাহ মনজুরুল হক ও নাহিদ সুলতানা যুথী। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন।
পরে আইনজীবী মনজুরুল হক সাংবাদিকদের বলেন, “আদালত রুল জারি করেছেন। এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ যেসব বিবাদী রয়েছে, তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুরকারীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলাসহ প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে।”
গত ১৩ নভেম্বর ঢাকার গেণ্ডারিয়ার ধূপখোলার মাঠে ‘তৌহিদী জনতা ঐক্যপরিষদের’ ব্যানারে এক সমাবেশ থেকে মুজিববর্ষ উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করা হয়।
একই দিনে রাজধানীর বিএমএ অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিস ঢাকা মহানগরীর উদ্যোগে শানে রিসালাত কনফারেন্সে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিসের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা মামুনুল হক প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করেন।
এরপর গত ২৭ নভেম্বর চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে এক মাহফিলে অংশ নিয়ে হেফাজতে ইসলামের আমীর জুনাইদ বাবুনগরী হুমকি দেন, যে কোনো দল ভাস্কর্য বসালে তা ‘টেনে হিঁচড়ে ফেলে দেওয়া’ হবে।
তাদের এ ধরনের বক্তব্যের প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যেই শুক্রবার গভীর রাতে কুষ্টিয়া শহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি নির্মাণাধীন ভাস্কর্যের ভাঙচুর চালানো হয়।
এই প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যসহ দেশের সব ভাস্কর্যের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে গত রোববার হাই কোর্টে এই রিট আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী উত্তম লাহিড়ী।
ওই দিন দুপুরে বিচারপতি জেবিএম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের হাই কোর্ট বেঞ্চে রিটটি উপস্থাপন করেন আইনজীবী নাহিদ সুলতানা যুথি।
পরে রুলের শর্ত সংশোধন করে আরেকটি সম্পূরক আবেদন করা হয়। মঙ্গলবার সংশোধিত আবেদনের ওপর প্রাথমিক শুনানি নিয়ে আদেশ দিল উচ্চ আদালত।

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা: গণপরিষদ ও সংবিধান

0

ইহাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ হইতে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনগণকে আহ্বান জানাইতেছি যে, যে যেখানে আছ, যাহার যাহা কিছু আছে, তাই নিয়ে রুখে দাঁড়াও, সর্বশক্তি দিয়ে হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করো। পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলার মাটি হইতে বিতাড়িত না করা পর্যন্ত এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাও (অনূদিত)।

এভাবেই ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ মধ্য রাতের পরে পাকিস্তান দখলদার হানাদার বাহিনী কর্তৃক গ্রেফতারের পূর্ব মূহুর্তে প্রদত্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ওই ঘোষণা মুহূর্তেই বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে দেশময়। সাড়ে সাত কোটি বাঙালি বঙ্গবন্ধুর ওই ঘোষণায় উদ্দীপ্ত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। শুরু হয় সশস্ত্র লড়াই-সংগ্রাম। অবশেষে অনেক রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে কাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জিত হয় ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১।

স্বাধীনতা অর্জনের পর ২২ মার্চ ১৯৭২ রাষ্ট্রপতি কর্তৃক বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ, ১৯৭২ (Constitutent Assembly of Bangladesh order,1972) জারির মাধ্যমে ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের নিয়ে গঠিত হয় বাংলাদেশ গণপরিষদ। তবে বহিস্কৃত ও পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য পোষণকারী সদস্যরা গণপরিষদের সদস্য পদ লাভের অযোগ্য ছিলেন। বাংলাদেশ গণপরিষদ এর প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ১০ এপ্রিল ১৯৭২।

গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন এবং তাদের শপথ গ্রহণের পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মাহুতি দানকারী লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রতি গণপরিষদের শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করে শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন। বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাব অনুসারে শোক প্রস্তাব গৃহীত হলে নিহতদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে এক মিনিট নিরবতা পালনের পর সদস্যরা দাঁড়িয়ে মোনাজাত করেন এবং মাননীয় স্পিকার মোনাজাত পরিচালনা করেন। এরপর জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্পিকারের অনুমতি নিয়ে ‘স্বাধীনতা সর্ম্পকীয়’ প্রস্তাব গণপরিষদে উত্থাপন করেন। কয়েকজন সদস্য উত্থাপিত প্রস্তাবটির উপর মতামত দেন। প্রস্তাবটির উপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন-

জনাব স্পিকার সাহেব, আপনার জানা আছে যে, ত্রিশ লক্ষ ভাই-বোনের রক্তের বিনিময়ে এই স্বাধীনতা  আমরা পেয়েছি। এই গণপরিষদের সদস্য হিসাবে নিশ্চয়ই তাদের আত্মত্যাগের কথা আমরা স্মরণ করব এবং মনে রাখব। আমাদের মনে রাখতে হবে, যে রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, সে রক্ত যেন বৃথা না যায়।… দলমত নির্বিশেষে যারা স্বাধীনতার জন্য রক্ত দিয়েছেন, শহীদ হয়েছেন, তাদের ত্যাগের কথা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরন করে আমাদের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা গ্রহণ করতে হবে। …আজ স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি, এর সঙ্গে সঙ্গে আমি চারটি স্তম্ভকে স্মরণ করতে চাই, যে স্তম্ভকে সামনে রেখে আমাদের দেশের সংবিধান তৈরি করতে হবে। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। আমরা গণতন্ত্র দিতে চাই এবং গণতন্ত্রকে দিতেই আজ আমরা এই পরিষদে বসেছি। কারণ, আজ আমরা যে সংবিধান দেব, তাতে মানুষের অধিকারের কথা লেখা থাকবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ জনগণের জানমাল নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে। …আজ এখানে বসে চারটি স্তম্ভের উপর ভিত্তি করে আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য এমন সংবিধান রচনা করতে হবে, যাতে তারা দুনিয়ার সভ্য দেশের মানুষের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।

বঙ্গবন্ধুর বক্তব্যের পর স্পিকার সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে ‘স্বাধীনতা ঘোষণা’ সম্পর্কিত প্রস্তাবটি পরিষদের সামনে উপস্থাপন করেন, যা ছিল নিম্নরূপ-

বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ঐতিহাসিক স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলাদেশের যে বিপ্লবী জনতা, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, যুবক, বুদ্ধিজীবী, বীরাঙ্গনা, প্রতিরক্ষা বিভাগের বাঙালি, সাবেক ই.পি.আর, পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ ও রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের রক্ত দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা অর্জন করেছেন, আজকের দিনে বাংলাদেশের জনগণের ভোটে নির্বাচিত বাংলাদেশ গণপরিষদ সশ্রদ্ধচিত্তে তাদের স্মরণ করছে। 

১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার যে ঘোষণা করেছিলেন এবং যে ঘোষণা মুজিব নগর থেকে ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল স্বীকৃত ও সমর্থিত হয়েছিল এই সঙ্গে গণপরিষদ তাতে একাত্মা প্রকাশ করছে। 

স্বাধীনতা সনদের মাধ্যমে যে গণপরিষদ গঠিত হয়েছিল আজ সে সনদের সঙ্গেও এ পরিষদ একাত্মতা ঘোষণা করছে। 

এক্ষণে এই পরিষদ বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার সেই সব মূর্ত আদর্শ, যথা, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা, যা শহীদান ও বীরদের স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করেছিল, তার ভিত্তিতে দেশের জন্য একটি উপযুক্ত সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে।

প্রস্তাবটি গণপরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। প্রস্তাবটির সহজ পাঠ ও বিশ্লেষণে মূলত চারটি বিষয় সুস্পষ্টভাবে লক্ষ্যণীয়-

এক. বাংলাদেশ গণপরিষদ স্বাধীনতা সংগ্রামে রক্তদানকারী সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের ত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সশ্রদ্ধচিত্তে তাদের স্মরণ করেছে;

দুই. গণপরিষদ ২৬শে মার্চ ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রদত্ত স্বাধীনতার ঘোষণা, যা পরবর্তিতে ১০ এপ্রিল, ১৯৭১ ‘স্বাধীনতা সনদে’ অর্থাৎ ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ স্বীকৃত ও সমর্থিত হয়েছিল তা অনুমোদন করেছে;  

তিন. গণপরিষদ মুজিবনগর সরকার কর্তৃক জারিকৃত ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ বা ‘স্বাধীনতা সনদ’ অনুমোদন করেছে; এবং

চার. গণপরিষদ বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত আদর্শ, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা- যা শহীদান ও বীরদের স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করেছিল, তার ভিত্তিতে দেশের জন্য উপরোক্ত সংবিধান প্রণয়নের অঙ্গিকার ব্যক্ত করেছিল।

গণপরিষদ কর্তৃক গৃহীত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫০-এ বিধান করা হয় যে- ‘সংবিধানের অন্য কোন বিধান সত্ত্বেও চতুর্থ তফসিলে বর্ণিত ক্রান্তিকালিন ও অস্থায়ী বিধানাবলী কার্যকর হবে।’ চতুর্থ তফসিল-এর অনুচ্ছেদ ৩(১)-এ উল্লেখ করা হয়-

১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ হইতে এই সংবিধান প্রবর্তনের তারিখের মধ্যে প্রণীত বা প্রণীত বলিয়া বিবেচিত সকল আইন, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র বা যে কোন আইন হইতে আহরিত বা আহরিত বলিয়া বিবেচিত কর্তৃত্বের অধীন অনুরূপ মেয়াদের মধ্যে প্রযুক্ত সকল ক্ষমতা বা কৃত সকল কার্য এতদ্বারা অনুমোদিত ও সমর্থিত হইল এবং তাহা আইনানুযায়ী যথাযথভাবে প্রণীত, প্রযুক্ত ও কৃত হইয়াছে বলিয়া ঘোষিত হইল।

‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ বা ‘সনদকে’ গণপরিষদ তো বটেই সাংবিধানিকভাবেও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং তা সংবিধানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লেখ  করা হয়েছে-

“…,

এবং 

যেহেতু এইরুপ বিশ্বাসঘাতকতামূলক আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বাংলাদেশের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রনের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৭১ সনের ২৬ শে মার্চ তারিখে ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন এবং বাংলাদেশের মর্যাদা ও অখণ্ড রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান, 

এবং
২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর দ্বারা সংবিধানে অনুচ্ছেদ ১৫০ সংশোধন অর্থাৎ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ৭ মার্চ ১৯৭১-এর ভাষণ, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্য রাত শেষে অর্থাৎ ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রদত্ত স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার কর্তৃক জারিকৃত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র-কে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের ঐতিহাসিক ভাষণ ও দলিল উল্লেখে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ হতে ১৯৭২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর অর্থাৎ সংবিধান প্রবর্তন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সময়কালের জন্য ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলী হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং ওই ভাষণ ও দলিলসমূহ সংবিধানে পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম তফসিল হিসেবে সংযোজিত হয়েছে। 

২৬শে মার্চ ১৯৭১ বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষণা বাংলাদেশ গণপরিষদ কর্তৃক স্বীকৃত ও অনুমোদিত। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫০ অনুযায়ী মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং ১০ জানুয়ারি ১৯৭১ মুজিবনগর সরকার কর্তৃক জারিকৃত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সংবিধানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭খ-এর দ্বারা সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে যা কিছুই থাকুক না কেন, সংবিধানের প্রস্তাবনা, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ (নবম-ক ভাগে বর্ণিত অনুচ্ছেদ সমূহের বিধানাবলী সাপেক্ষে) এবং একাদশ ভাগের অনুচ্ছেদ ১৫০ সহ সংবিধানের অন্যান্য মৌলিক কাঠামো সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ সমূহের বিধানাবলী সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন, রহিতকরণ কিংবা অন্য কোন পন্থায় সংশোধনের অযোগ্য করা হয়েছে। 

বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ২৬শে মার্চ ১৯৭১-এ প্রদত্ত স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে বিতর্ক সৃষ্টি করার যে কোন অপচেষ্টা গণপরিষদের কর্তৃত্ব-কে চ্যালেঞ্জ করার পাশাপাশি সংবিধান লংঘনের শামিল এবং রাষ্ট্রদোহিতা মূলক একটি অপরাধ। 

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭ক (১) (খ)-এ উল্লেখ আছে- সংবিধান বা এর কোন বিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা, বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহত করলে বা তা কার্যকর জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করলে-তার এই কার্য ‘রাষ্টদ্রোহিতা’ হবে এবং ঐ ব্যক্তি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে দোষী হবে।

অনুচ্ছেদ ৭ক(২)- এ উল্লেখ করা হয়েছে কোন ব্যক্তি যদি উপরোক্ত দফা (১)-এ বর্ণিত কার্য করতে সহযোগিতা বা উস্কানি প্রদান করলে কিংবা কার্য অনুমোদন, মার্জনা, সমর্থন বা অনুসমর্থন করে- তবে তার এইরুপ কার্যও একই অপরাধ হবে। 

বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র’ পনের খণ্ডের সিরিজ গ্রন্থের ২০০৪ সালের পুনর্মুদ্রণকৃত তৃতীয় খণ্ডের প্রথম পৃষ্ঠায় ‘মেজর জিয়াউর রহমান ২৭ মার্চ ১৯৭১ তারিখে প্রথম স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন’ মর্মে বর্ণনা করা হয়। 

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র গ্রন্থ সিরিজের ২০০৪ সালের ওই পুনর্মুদ্রণটির তৃতীয় খণ্ড বাজেয়াপ্ত এবং বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাস বিকৃতকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও চিকিৎসক এম এ সালাম।

বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক এবং বিচারপতি মো. মমতাজ উদ্দিন আহমেদ এর সমন্বয়ে গঠিত একটি দ্বৈত বেঞ্চ উক্ত রিট মোকদ্দমাটি শুনানি অন্তে ২১ জুন ২০০৯ তারিখের এক রায়ে ২০০৪ সালে পূর্নমুদ্রিত বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র’ -এর তৃতীয় খণ্ডের ১ম পৃষ্ঠায় ‘মেজর জিয়ার প্রথম স্বাধীনতা ঘোষণা’ শিরোনামে মুদ্রিত বর্ণনা ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল তারিখের স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রের সাথে সাংঘর্ষিক বিধায় সাংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫০ এর সাথেও সাংঘর্ষিক এবং সংবিধান পরিপন্থী মর্মে ঘোষণা করেন; এবং উপরোক্ত খণ্ডটি বাজেয়াপ্ত করার জন্য সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়। সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগের উক্ত রায় সকল কর্তৃপক্ষ ও ব্যক্তি’র জন্য অবশ্যই পালনীয় এবং বাধ্যকর।
যে সকল ব্যক্তি-মহল জেনে বুঝে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রদত্ত স্বাধীনতার ঘোষণাকে বিতর্কিত করার অপতৎপরতা-অপচেষ্টা করেন তারা নিঃসন্দেহে জ্ঞানপাপী, বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু বিরোধী।
৭২-এর সংবিধান গণপরিষদে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতিকরণ সংবিধানে স্বাধীনতার ঘোষণা স্বাধীনতার ঘোষণা।
( সৌজন্যে ঃ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)।
লেখক পরিচিতি ঃ এম ইনায়েতুর রহিম, বিচারপতি, হাইকোর্ট বিভাগ এবং সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১, বাংলাদেশ।

বেগম রোকেয়ার স্বপ্নকে ছাড়িয়ে শিক্ষার স্বপ্ন শিখরে পৌঁছে গেছে নারীরা

0

শিক্ষা মানুষকে আলোকিত করে। সকলের সম্মিলিত সেই আলো সমাজ থেকে অন্ধকার দূর করে। সমাজকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এই শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন হয়ে থাকে। শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব উপলব্ধি করে আজ থেকে চারশত বছর আগে ইংরেজ দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকনের উক্তি “শিক্ষা শক্তি”। সে সময় শিক্ষা ও বিজ্ঞান চর্চায় ইউরোপের দেশগুলো এগিয়ে গেলেও বিশ্বের বৃহৎ ভুখন্ড ভারতীয় উপমহাদেশ পড়ে থাকে অন্ধকার ও কুসংস্কারচ্ছন্নতাকে আকড়ে ধরে। হাজার বছরের পুরুষ শাসিত পশ্চাদপদ সমাজ ব্যবস্থায় মেয়ে শিশুদের বেড়ে উঠতে হতো শিক্ষা ছাড়াই। বৈষম্য নিয়ে শুরু হতো মেয়ে শিশুদের জীবন। পরিবার থেকেই দেওয়া হতো একের পর এক বিধি নিষেধ। ঘরের বাইর পা দিলেই শত শত নিয়ম কানুন। সব মিলিয়ে পরিবার ও সমাজ থেকে পায়ে পরিয়ে দেওয়া হতো অদৃশ্য শিকল। মানুষ হয়েও তারা পটে আকা ছবির মত স্থির ও নিশ্চুপ। না আছে কোনো শব্দ, না আছে ঘুরে দাড়ানোর শক্তি। সেই পিছিয়ে পড়া, বৈষম্য, কুসংস্কার ও অন্ধকারাচ্ছন্ন মুসলিম সমাজের চিত্র সবার সামনে তুলে ধরে ছিল বেগম রোকেয়া। উপমহাদেশের নারী সমাজের নিকট শিক্ষার আলোকবর্তিকা। সুসাহিত্যিক, শিক্ষানুরাগী ও আধুনিক সমাজ সংস্কারক। সকল সামাজিক অসঙ্গতি, ধর্মীয় গোড়ামী ও অন্তপুরবাসিনী নারীদের মুক্তির দূত মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়া হোসেন।
আজকে শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। শিক্ষার মাধ্যমে বিকশিত হয় তাদের সুপ্ত প্রতিভা।, শিক্ষা ছাড়া নারীর অগ্রগতি ও মুক্তি সম্ভব নয়। তিনি নারী শিক্ষার জন্য সকল বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করে এগিয়ে যান। তিনি তার নিজের, পরিবারের ও সমাজের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছিলেন নারী যদি শিক্ষিত না হয় তবে নিজেদের যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে পারবে না। আর নারীদের প্রকৃত মুক্তির জন্য দরকার অর্থ উপার্জন বা আয় করার ক্ষমতা। এজন্য তিনি জীবনের প্রথম দিকেই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছে। নিজের বিভিন্ন লেখায় শিক্ষাকে নিয়ে এসেছেন। লেখায় চারপাশের বিভিন্ন প্রচলিত উপমা ও উপকরণ ব্যবহার করেছেন এতে মানুষ যেন নিজের পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারে। নারী শিক্ষার বিষয়ে তিনি লেখেন, “শিক্ষা স্ত্রী লোক- পুরুষ নির্বিশেষে সর্বদা বাঞ্ছনীয়। স্থলবিশেষে অগ্নি গৃহদাহ করে বলে কি কোন গৃহস্থ অগ্নি বর্জন করতে পারে”। শিক্ষার গুরুত্ব বোঝাতে তিনি আরো বলেন, ‘অন্ততঃ পক্ষে বালিকাদিগকে প্রাথমিক শিক্ষা দিতেই হইবে। শিক্ষা অর্থে আমি প্রকৃত সুশিক্ষার কথাই বলি, গোটা কতক পুস্তক পাঠ করিতে বা দু’ছত্র কবিতা লিখিতে পারা শিক্ষা নয়। আমি চাই সেই শিক্ষা- যাহা তাহাদিগকে নাগরিক অধিকার লাভে সক্ষম করিবে, তাহাদিগকে আদর্শ কন্যা, আদর্শ ভগিনী, আদর্শ গৃহিণী, আদর্শ মাতা রূপে গঠিত করিবে। শিক্ষা মানসিক ও শারীরিক উভয়বিদ হওয়া চাই। তাহাদের জানা উচিত যে, তাহারা ইহজগতে কেবল সুদৃশ্য শাড়ি, ক্লিপ ও বহুমূল্য রত্নালঙ্কার পরিয়া পুতুল সাজিবার জন্য আইসে নাই, বরং তাদের বিশেষ কর্তব্য সাধন নিমিত্ত নারী রূপে জন্মলাভ করিয়াছে। তাহাদের জীবন শুধু পতিদেবতার মনোরঞ্জনের নিমিত্ত উৎসর্গ হইবার বস্তু নহে। তাহার অন্ন, বস্ত্রের জন্য কাহারো গলগ্রহ না হয়।
রোকেয়ার স্বপ্নের সাথে আজ আমাদের দেশের নারী শিক্ষার তুলনা করলে দেখি, আমরা তাঁর স্বপ্নকেও ছাড়িয়ে গেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার নারী শিক্ষায় বিশ্বে রোল মডেল। তিনি নারী শিক্ষা প্রসারের জন্য ২০১৪ সালে ‘ট্রি অব পিস’ পুরস্কারে ভূষিত হন। জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ এর যথাযথ বাস্তবায়নের ফলে কন্যা শিশুর প্রতি বৈষম্য দূরীকরণ ও সকল ক্ষেত্রে জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
একদশক আগে প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে ছাত্রী ভর্তির হার ছিল ৬১ শতাংশ যা বর্তমানে শতভাগে উন্নীত হয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরে ছেলে শিক্ষার্থীর তুলনায় মেয়ে শিক্ষার্থীর অনুপাত যথাক্রমে ৫০.৭৫ ও ৫৩.৯৯ শতাংশ। আমাদের দেশে শিক্ষাক্ষেত্রে মেয়েরা আজ ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে গেছে। এ যেন বেগম রোকেয়ার স্বপ্নের বাস্তবায়ন। আজ আমরা দেখি বেগম রোকেয়ার সে স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।
সাহিত্যিক হিসেবে বেগম রোকেয়া ছিলেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে। নবনূর, সওগাত, মোহাম্মদী, নবপ্রভা, মহিলা, ভারত মহিলা, আল-এসলাম, নওরোজ, মাহে নও, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা প্রভৃতি পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লিখতেন। সমাজের কুসংস্কার ও অবরোধ প্রথার কুফল, নারী শিক্ষার প্রতি তার নিজস্ব মতামত, নারীদের প্রতি সামাজিক অনাচার ও অপমানের কথা তাঁর লেখায় উঠে এসেছে। নারীর অধিকার ও নারী জাগরণ সম্পর্কে তাঁর দুরদর্শী চিন্তাভাবন তাঁর সাহিত্যে বার বার উঠে এসেছে। বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ প্রথার বিরুদ্ধেও তার লেখনি ছিল সোচ্চার। রোকেয়ার উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে মতিচুর, পদ্মরাগ, অবরোধবাসিনী প্রভৃতি। এছাড়া রয়েছে অসংখ্য প্রবন্ধ, ছোটগল্প, কবিতা, ব্যঙ্গাত্মক রচনা ও অনুবাদ।
নারীর স্বাধীনতা, মুক্তির এবং বৈষম্যের বিষয়ে প্রতিবাদের আওয়াজ তুলেছিলেন বেগম রোকেয়া। সেই সময়ের রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার অসঙ্গতি তুলে ধরে বলেছিলেন, সামাজিক বিধিব্যবস্থার উপর আমাদের (নারীদের) কোন হাত নাই। উড়িতে শিখিবার পূর্বেই আমাদের ডানা কাটিয়া দেওয়া হয়- তদ্ব্যতীত সামাজিক রীতি-নীতির কত শত কঠিন শৃঙ্খল পদে পদে জড়াইয়া আছে”।
-২-
মুসলমান মেয়েদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি ও তাদের দাবী আদায়ের জন্য ১৯১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত করেন ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম বা মুসলিম মহিলা সমিতি’। এই সমিতি থেকে নারীদের আর্থিক সাহায্য এবং কর্মমুখী ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা দেওয়া হতো। সেই অর্থে নারীর শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের সূচনা করেন বেগম রোকেয়া। নারী শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের উপর জোর দিয়ে বেগম রোকেয়া বলেছেন, ‘কন্যাগুলিকে সুশিক্ষিত করিয়া কার্যক্ষেত্রে ছাড়িয়া দাও, নিজের অন্ন বস্ত্র উপার্জন করুক। কার্যক্ষেত্রেও পুরুষের পরিশ্রমের মূল্য বেশী, নারীর কাজ সস্তায় বিক্রয় হয়।’ উপমহাদেশের পুরুষ শাসিত সমাজে নারীদের প্রতি নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা, অবিচার ও পর্দা প্রথার নামে অবরুদ্ধ জীবন বেগম রোকেয়াকে বেদনাহত করে তুলেছিল। তাই তিনি শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার মাধ্যমে চেয়েছিলেন নারীর প্রকৃত মুক্তি।
নারীর অগ্রগতির জন্য আজীবন সংগ্রামী রোকেয়ার অগ্রণী ভূমিকা ছিল নারীর আলোকিত জীবনের জন্য। একাধারে স্কুল পরিচালনা করা, কুসংস্কারচ্ছনা সমাজের বিরুদ্ধে লড়াই করা ও লেখনির মাধ্যমে নারীর সুপ্ত প্রতিভা জাগিয়ে তোলা বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী বেগম রোকেয়ার সার্বক্ষণিক ভাবনায় ছিল নারীদের উন্নয়ন। নারীদের স্বপ্ন ও চিন্তাকে গন্ডির মধ্যে আটকে রাখা যাবেনা। যে কাজ সমাজে পুরুষ করতে পারে তা নারীও পারবে। কাজের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ বিভাজন সমাজ আর চায়না। নারীরা ও মেনে নিবে না। নারীর উন্নয়নে তাঁর কাজের পথে যারা বাধা হয়ে দাড়িয়েছিল তাদের জবাব দিয়েছেন এইভাবে, ‘স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জন করিলে যদি স্বাধীনতা হয়, তবে তাহাই করিব। আবশ্যক হইলে আমরা লেডি কেরানি হইতে আরম্ভ করিয়া লেডি ম্যাজিস্ট্রেট, লেডি ব্যারিস্টার, লেডি জজ হইব। আমাদের কী হাত নেই, পা নেই, বুদ্ধি নেই? যে পরিশ্রম আমরা স্বামীগৃহ কার্যে ব্যয় করি, সেই পরিশ্রম দ্বারা কি স্বাধীন ব্যবসায় করিতে পারিব না?’ এ ছাড়াও তিনি বলেছেন, ‘আমরা (নারীরা) যদি রাজকীয় কার্যক্ষেত্রে প্রবেশ করিতে না পারি, তবে কৃষিক্ষেত্রে প্রবেশ করিব। কন্যাগুলোকে সুশিক্ষিত করিয়া কার্যক্ষেত্রে ছাড়িয়া দাও, নিজের অন্ন-বস্ত্র উপার্জন করুক।’
স্বাধীন বাংলাদেশের শুরুতেই বেগম রোকেয়ার এই স্বপ্নকে বাস্তবে রুপ দিয়েছিলেন হাজার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই জাতির পিতা একইসাথে যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পূনর্গঠন, মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্যতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের পুনর্বাসন ও উন্নয়ন শুরু করেছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের পূনর্বাসনের জন্য ১৯৭২ সালে নারী পুনর্বাসন কল্যাণ ফাউন্ডেশন গঠন করেন। বঙ্গবন্ধু সংবিধানে ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদে নারী-পুরুষ সমতা ও সমানাধিকার নিশ্চিত করেন। ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদে সর্বপ্রথম জাতির পিতাই নারীদের জন্য ১৫টি আসন সংরক্ষিত করেন এবং প্রথম সংসদেই নারীরা প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান। জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে গত দশ বছরে বিভিন্ন নীতি, কৌশল গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছেন। যার ফলে আমাদের দেশে জেন্ডার বৈষম্য যেমন কমেছে তেমনি নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের বৈশ্বিক সূচক ও মাপকাঠিতে বাংলাদেশ অভুতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। আজ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতা ও জাতীয় সংসদের স্পিকার নারী। আজ বাংলাদেশের নারীরা বিচারক, সচিব, মেজর জেনারেল, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর।
বেগম রোকেয়ার দেশের নারীরা সামরিক, বিমান চালনা, চিকিৎসা, প্রকৌশল, ব্যবসা ও শিল্পোদ্যোগসহ সব ক্ষেত্রেই সফলতার সাথে কাজ করছে। নারী শিক্ষা, উন্নয়ন, ক্ষমতায়ন ও সমানাধিকার অর্জনের মাধ্যমে এদেশের নারীরা বেগম রোকেয়ার সকল স্বপ্ন পুরণ করেছে। ৯ ডিসেম্বর সুসাহিত্যিক, শিক্ষানুরাগী, সমাজ-সংস্কারক বেগম রোকেয়ার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী। প্রতি বছর মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয় বেগম রোকেয়া দিবস উদযাপন ও দেশের আলোকিত পাঁচজন নারীকে বেগম রোকেয়া পদক প্রদান করে থাকে। আদর্শ ও অনুপ্রেরনার উৎস এবং কর্মময় জীবনের অধিকারী মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়ার স্মৃতির প্রতি এই দিনে রইল গভীর শ্রদ্ধা।( পিআইডি ফিচার)।

মামলাজট দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত সমস্যা, সমাধানে চেষ্টা চলছে, জানালেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক

0

দেশের মামলাজট সমস্যা একদিনে তৈরি হয়নি, এটি দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত সমস্যা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারই দেশের মামলাজট সমস্যা সমাধানে প্রথম সচেষ্ট হয়েছেন। এ জট নিরসনে সময় লাগবে। কারণ রাতারাতি একজন বিচারক বানানো যায় না। একটি সিস্টেম রাতারাতি পরিবর্তন করা যায় না। রবিবার ঢাকায় সিরডাপ মিলনায়তনে ‘‘ডিভেলপমেন্ট প্লানিং এক্সপরেয়িন্সে ইন বাংলাদেশ’’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে বনানীর বাসা থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে এসব কথা বলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ এই সেমিনারের আয়োজন করে।
মন্ত্রী বলেন, ২০০৭ সালের পহেলা নভেম্বর বিচার বিভাগের পৃথকীকরণের সময় বিচার বিভাগের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ছিল না। জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই অবকাঠামো নির্মাণসহ নতুন নতুন বিচারক নিয়োগ দিচ্ছে, বিচারকদের প্রশিক্ষণ ও লজিস্টিক সুবিধা দিচ্ছে। পাশাপাশি আদালতের বাইরে বিকল্প উপায়ে অর্থাৎ এডিআর-এর মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসা করে মামলাজট কমানোর চেষ্টা করছে। এর সুফল আমরা অবশ্যই পাবো।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার আগে বিচারকদের স্বাধীনতা, বেতন ভাতা, সুযোগ সুবিধা- সবক্ষেত্রে তাদের প্রতি অন্যান্য সরকারের সবচেয়ে বেশি অনীহা ছিল। মন্ত্রী বলেন, ১৯৮৮ সাল থেকে ১৯৯৩-৯৪ সাল পর্যন্ত এমন পর্যায় হয়েছিল যে, আসামির সাজা খাটা হয়েছিল অথচ কোর্টে মামলা করতে পারা যায় নাই এবং সে কারণেই তৎকালীন প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমান তত্ত্ববধায়ক সরকার প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণের পর সাজা কমিয়ে অনেককে জেল খানা থেকে ছেড়ে দিয়েছিলেন।
সেমিনারে এক প্রশ্নের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, স্টোরেজ এবং মজুতদারী দুটি এক বিষয় না। মজুতদারীর ব্যাপারে সরকারের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। সরকার জনগণের কষ্ট লাঘব করার জন্য মার্কেটে হস্তক্ষেপ করার প্রয়োজন হলে সেটা করবে। কারণ ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধুর আমলে এরকম একটি সংকট তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছিল। সে জন্যই মূলত বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪ প্রনয়ণ করা হয়েছিল এবং এই আইনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারাটি হলো মজুতদারী এবং চোরাকারবারী। তিনি বলেন, মজুতদারীর ব্যাপারে সরকার শুধু মার্কেটে হস্তক্ষেপ করবে না, আইন অনুযায়ী মজুতদারদের শাস্তি দেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, সরকার লাভ করার জন্য ব্যবসা করে না। যেখানে বেসরকারি খাতের কোন অবদান নাই, সেখানে সরকার ব্যবসা করে।
সেমিনারে লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সচিব মো. মইনুল কবির সভাপতিত্ব করেন, মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ও সিনিয়র সচিব ড. শামসুল আলম। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের যুগ্মসচিব ড. মোহাম্মদ মহিউদ্দীন।

ভাস্কর্যের সুরক্ষা চেয়ে হাইকোর্টে রিট,সোমবার শুনানি

0

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যসহ দেশের সব ভাস্কর্যের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে হাই কোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী উত্তম লাহিড়ী রোববার সকালে সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিট আবেদনটি করেন।
পরে তা বিচারপতি জেবিএম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের বেঞ্চে উপস্থাপন করা হয়।
আইনজীবী নাহিদ সুলতানা যুথি রিটটি উপস্থাপন করে শুনানির আরজি জানান। তার সঙ্গে ছিলেন এবিএম শাহজাহান আকন্দ মাসুম। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
সোমবার এ বিষয়ে শুনানি হতে পারে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন আইনজীবী যুথি।
ভাস্কর্যের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা চাওয়ার পাশাপাশি জাতির পিতার ভাস্কর্য স্থাপন নিয়ে সৃষ্ট ‘নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা’ ঠেকাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বিবাদীদের কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না- সেই মর্মে রুল চাওয়া হয়েছে এই রিটে।   
এছাড়া জাতির জনকের ভাস্কর্য স্থাপন এবং ভাস্কর্য নিয়ে জনমনে সৃষ্ট বিভ্রান্তি দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ও বায়তুল মোকারম মসজিদের খতিবের প্রতি নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র সচিব, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, পুলিশ প্রধান, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ও বায়তুল মোকারম মসজিদের খতিবকে এই রিট আবেদনে বিবাদী করা হয়েছে।

বিতর্কের অবসান, যাবজ্জীবনে ৩০ বছর, রায়ে ‘আমৃত্যু কারাদণ্ড’ বললে বাকি জীবন জেলে: আপিল বিভাগের রায়

0

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা ৩০ বছর। তবে আদালত নির্দিষ্ট করে আমৃত্যু কারাদণ্ড বলে দিলে আসামিকে বাকি জীবন জেলেই কাটাতে হবে বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত।

‘যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে আমৃত্যু কারাবাস’ আপিল বিভাগেরই এমন রায় ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ দাবি করে আসামিপক্ষ যে পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করেছিল, সে আবেদন নিষ্পত্তি করে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সাত বিচারকের ভার্চুয়াল আপিল বেঞ্চ মঙ্গলবার এ রায় দিয়েছে।

আবেদনটি সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করা হয়েছে জানিয়ে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন সংক্ষিপ্ত রায়ে বলেন,

প্রাথমিক অর্থে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মানে হল, দণ্ডিত ব্যক্তি তার স্বাভাবিক জীবনের বাকি সময় কারাভোগ করবেন।

দণ্ডবিধির ৪৫ এবং ৫৩ ধারার সাথে দণ্ডবিধির ৫৫, ৫৭ ধারা এবং ফৌজদারী কার্যবিধির ৩৫(ক) মিলিয়ে পড়লে যাবজ্জীবনের সাজা কমে ৩০ বছর কারাদণ্ডের সমতুল্য হয়।

তবে আদালত, ট্রাইব্যুনাল অথবা ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে গঠিত ট্রাইব্যুনাল যখন কোনো আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়, তিনি কার্যবিধির ৩৫(ক) ধারার (রেয়াতি) সুবিধা পাবেন না।

রায় ঘোষণার সময় আসামিপক্ষে আদালতে যুক্ত ছিলেন আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন ও আইনজীবী শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন।

রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, “যাবজ্জীবন মানে আসামিকে সর্বোচ্চ ৩০ বছর সাজা খাটতে হবে। তবে আদালত যদি আমৃত্যু সাজা দেয়, তাহলে সেটাই গণ্য করতে হবে উল্লেখ করে রিভিউ রায় দিয়েছেন আপিল বিভাগ।“

যাবজ্জীবনে ৩০ বছর- এ নিয়ম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের মামলায় দণ্ডিত আসামিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না বলেও স্পষ্ট করেন অ্যাটর্নি জেনারেল। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

আসামিপক্ষের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, “যাবজ্জীবন মানে কতদিন, আসামিকে কতদিন সাজা ভোগ করতে হবে এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। আমরা সে ব্যপারে রিভিউ পিটিশন করে বলেছিলাম, বর্তমান আইনের বিধান অনুযায়ী যাবজ্জীবনে ৩০ বছর হবে। কারণ ৩০ বছর যদি না হয়, তাহলে ফৌজদারী কার্যবিধির ৩৫(ক)সহ অন্য আইনের বিধানগুলো এবং জেলকোড, সব বাতিল হয়ে যাবে।

“আজকের রায়ে আপিল বিভাগ বলেছে, যাবজ্জীবন বলতে একজন মানুষের স্বাভাবিক জীবন যতদিন, ততদিন। কিন্তু আইন অনুযায়ী যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত একজন আসামির ৩০ বছরের সাজা ভোগ করতে হবে। যদি আদালত বা ট্রাইব্যুনাল বিশেষভাবে আদেশ দেন, তাহলে আমৃত্যু জেলখানায় থাকতে হবে।”

এক প্রশ্নের জবাবে খন্দকার মাহবুব বলেন, “রায়ে আমরা মোটামুটি সন্তুষ্ট। তবে আমৃত্যু সাজাটা মানবতাবিরোধী এবং আমৃত্যু সাজা যদি থাকে, তাহলে জেলাখানায় ওল্ডহোম করতে হবে। একটি মানুষ যখন অত্যন্ত বৃদ্ধ হয়ে যাবে, তখন তার চলাফেরার শক্তি থাকবে না। তখন তার সেবা- শুশ্রুষার বিষয়টিও আদালতকে বিবেচনা করতে হবে।
 
“আমি এখনও মনে করি, আমৃত্যু সাজার প্রশ্ন যখন আসবে, আদালত থেকে এমন একটা আদেশ আসবে একসময়, যখন প্যারোলের বিধান থাকবে। একটি লোক যখন অথর্ব হয়ে যাবে, বৃদ্ধ হয়ে যাবে, চলাফেরায় অক্ষম হয়ে যাবে, সেক্ষেত্রে বর্তমানে যে বিধান রয়েছে, সরকার তাকে মুক্তি দিতে পারে। কিন্তু এ রায়ের পর যখন আমৃত্যু সাজা হবে, সেখানে সরকারের সেই ক্ষমতাও (প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার ক্ষমতা) থাকবে না। তাই এটাকে প্রয়োজনবোধে আবার পুনর্বিবেচনার জন্য দ্বিতীয়বার আবেদন করতে পারি।”
প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চ গত বছর ১১ জুলাই শুনানি শেষে রিভিউ আবেদনটির রায়ের জন্য অপেক্ষমান (সিএভি) রেখেছিল।

রিভিউ শুনানিতে সর্বোচ্চ আদালত এ বিষয়ে পাঁচ অ্যামিকাস কিউরির বক্তব্য শোনে। তারা হলেন আইনজীবী রোকন উদ্দিন মাহমুদ, এ এফ হাসান আরিফ, আবদুর রেজাক খান, মুনসুরুল হক চৌধুরী ও এ এম আমিন উদ্দিন।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে আমৃত্যু কারাবাস জানিয়ে আপিল বিভাগ যে রায় দিয়েছিল, তা ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ দাবি করে ২০১৭ সালে এই রিভিউ আবেদন করে আসামিপক্ষ।

তখন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছিলেন, এক হত্যা মামলার চূড়ান্ত বিচারে (ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে) দেওয়া ওই রায় আপিল বিভাগেরই আগের আরেকটি রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

সেদিন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ওই রায়ের কারণে আইনের ব্যাখ্যা নিয়ে ‘অনিশ্চয়তার’ সৃষ্টি হয়েছে। ‘সঠিক বিবেচনায়’ ওই রায় দেওয়া হয়নি। বিভ্রান্তি দূর করার জন্য পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করা হয়েছে।

২০০১ সালে সাভারের ব্যবসায়ী জামান হত্যা মামলায় দুই আসামির আপিল শুনানি শেষে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা নেতৃত্বাধীন চার বিচারকের আপিল বেঞ্চ ওই রায় দেয়। সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশিত হয় ২০১৭ সালের ২৪ এপ্রিল।

সেখানে বলা হয়, দণ্ডবিধির ৫৩ ধারা ও ৪৫ ধারায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হবে আমৃত্যু কারাবাস। এর ফলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত সবাইকে আমৃত্যু কারাগারে থাকতে হবে।

আপিল বিভাগের ওই রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন জমা দিয়ে সেদিন ওই সংবাদ সম্মেলনে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, প্রচলিত ফৌজদারি আইন ও কারাবিধি অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অর্থ ৩০ বছর সাজা। এরপর আসামি রেয়াত পেলে ওই সাজার সময় আরও কমে যাবে।

ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫(ক) ধারা অনুযায়ী সাজার মেয়াদ থেকে বিচারিক সময়ের হাজতবাসের সময়ও বাদ যাবে।

খন্দকার মাহবুব আরও বলেছিলেন, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার নেতৃত্বে আপিল বিভাগ ২০১৩ সালে এক রায়ে বলেছিল, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অর্থ হল সাড়ে ২২ বছর কারাদণ্ড।

আপিল বিভাগের ওই রায় ও আইন বলবৎ থাকা অবস্থায় বিচারপতি সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের অপর রায় আসে; সেখানে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে ‘আমৃত্যু কারাদণ্ড’ বলা হয়।

“আপিল বিভাগের আগের রায় বাতিল না করেই এ রায় দেওয়া হয়েছে। ফলে রায়ের ব্যাখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। এছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫ (ক) ধারার কার্যকারিতা যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামির ক্ষেত্রে স্থগিত করা সমীচীন হয়নি। এটা দূর হওয়া প্রয়োজন,” বলেছিলেন খন্দকার মাহবুব হোসেন।

জামান হত্যা মামলায় আপিলের রায়ে বলা হয়েছিল, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির সাজা মওকুফ (রেয়াত) পাওয়ার কোনো অধিকার নেই। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি অন্য কোনো সুবিধা (রেয়াত) পাওয়ার দাবি করতে পারে না।

ব্রিটিশ আমলে করা আইন ও কারাবিধির বর্তমান প্রেক্ষাপটে নানা অসঙ্গতির কথা তুলে ধরতে গিয়ে বিচারপতি এস কে সিনহা আদালতের বাইরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড নিয়ে ‘বিভ্রান্তির’ কথা বলেছিলেন।

২০১৬ সালের ২৬ জুন গাজীপুরে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি বলতে আপনারা মনে করেন ৩০ বছর। ধরে নেয়, সব জায়গায়। প্রকৃতপক্ষে এটার অপব্যাখ্যা হচ্ছে। যাবজ্জীবন অর্থ হল একেবারে যাবজ্জীবন, রেস্ট অফ দ্য লাইফ।”

এরপর আদালতে দেওয়া রায়েও একই মত প্রকাশ করেন তিনি। ওই রায় প্রকাশের পরদিন তার ব্যাখ্যায় তখনকার অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছিলেন, আপিলে যাদের মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হবে, শুধু তাদের ক্ষেত্রেই আমৃত্যু কারাগারে কাটাতে হবে। আর বিভিন্ন মামলায় যাদের যাবজ্জীবন সাজা হবে, তাদের মৃত্যু পর্যন্ত কারাগারে থাকতে হবে না। দণ্ডবিধি অনুযায়ী ৩০ বছর জেল খেটেই বের হবেন তারা।

দুর্নীতি মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহাসহ চার আসামির জামিন বাতিল প্রশ্নে হাইকোর্টের ‍রুল

0

ফারমার্স ব্যাংক ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন, দুদকের মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা( এসকে সিনহা)সহ চার আসামির জামিন কেনো বাতিল করা হবে না,জানতে চেয়ে রুল জারী করেছে হাইকোর্ট। আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্টদেরকে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
দুদকের  আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার (১ ডিসেম্বর) হাইকোর্টের বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি আহমেদ সোহেল এর সমন্বয়ে গঠিত ভার্চুয়াল বেঞ্চ এ  আদেশ দেন।
মামলায় আসামীরা হলেন সাবেক ফারমার্স ব্যাংক লিমিটেড ( বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক লিমিটেড) এর ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. লুৎফল হক, একই ব্যাংকের ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট স্বপন কুমার রায়, টাঙ্গাইলের মো. শাহজাহান ও নিরঞ্জন চন্দ্র সাহা।
আদালতে দুদকের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মো. খুরশিদ আলম খান, রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একেএম আমিন উদ্দিন মানিক,  সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মাহজাবিন রাব্বানী দীপা ও আন্না খানম কলি।
গত ১৮ আগস্ট ঢাকার চতুর্থ বিশেষ জজ আদালত তাদের জামিন মঞ্জুর করেছিলেন। এর আগে জালিয়াতির মাধ্যমে ফারমার্স ব্যাংক থেকে চার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাতের মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ ১১ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পর বিচার শুরু হয়। দুদকের এই মামলায় অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে গত ৫ জানুয়ারি সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাসহ অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। তাকে পলাতক দেখিয়েই এ মামলার বিচার কাজ চলছে।
মামলার অপর আসামিরা হলেন- ফারমার্স ব্যাংকের (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) সাবেক ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট স্বপন কুমার রায়, ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট সাফিউদ্দিন আসকারী, ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. লুৎফুল হক, টাঙ্গাইলের বাসিন্দা মো. শাহজাহান, একই এলাকার নিরঞ্জন চন্দ্র সাহা, রনজিৎ চন্দ্র সাহা ও তার স্ত্রী সান্ত্রী রায়।

দুদক কর্মকর্তা বেনজির আহমেদ ২০১৯ সালের ৯ ডিসেম্বর ১১ জনকে আসামি করে এ মামলার অভিযোগপত্র দেন। তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে এস কে সিনহার ব্যাংক হিসাবের চার কোটি টাকা জব্দ করা হয়।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে অসৎ উদ্দেশ্যে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ফারমার্স ব্যাংকে ভুয়া ঋণ সৃষ্টি করে সেই টাকা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর, উত্তোলন ও পাচার করেছেন, যা দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/১০৯ ধারা, ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং ২০১২ সালের মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ৪(২)(৩) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

নানা নাটকীয় ঘটনার মধ্যে বিচারপতি সিনহা তিন বছর আগে বিদেশে পাড়ি জমানোর পর দুদক অভিযোগ পায়, তিনি ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ব্যবসায়ী পরিচয়ে দুই ব্যক্তির নেওয়া ঋণের চার কোটি টাকা নিজের অ্যাকাউন্টে নিয়েছিলেন।
অভিযোগ পেয়ে ওই বছরই তদন্তে নামে দুদক। তদন্তের পর সিনহাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন।
মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর আসামি শাহজাহান ও নিরঞ্জন চন্দ্র ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখায় আলাদা দুইটি অ্যাকাউন্ট খোলেন। ব্যবসা বাড়ানোর জন্য পরদিন তারা ওই ব্যাংক থেকে দুই কোটি টাকা করে মোট চার কোটি টাকা ঋণের আবেদন করেন।
তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং ঋণের আবেদনে উত্তরার ১০ নম্বর সেক্টরের ১২ নম্বর রোডের ৫১ নম্বর বাড়ির ঠিকানা ব্যবহার করা হয়, যার মালিক ছিলেন তখনকার প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা।
ঋণের জামানত হিসেবে আসামি রনজিৎ চন্দ্রের স্ত্রী সান্ত্রী রায়ের নামে সাভারের ৩২ শতাংশ জমির কথা উল্লেখ করা হয় ঋণের আবেদনে। ওই দম্পতি এস কে সিনহার পূর্ব পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ বলে উল্লেখ করা হয়েছে মামলার এজাহারে।

দুদক বলছে, ব্যাংকটির তৎকালীন এমডি এ কে এম শামীম কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই, ব্যাংকের নিয়ম-নীতি না মেনে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঋণ দুটি অনুমোদন করেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়, ৭ নভেম্বর ঋণের আবেদন হওয়ার পর ‘অস্বাভাবিক দ্রুততার’ সঙ্গে তা অনুমোদন করা হয়। পরদিন মোট চার কোটি টাকার দুটি পে-অর্ডার ইস্যু করা হয় এস কে সিনহার নামে। ৯ নভেম্বর সোনালী ব্যাংকের সুপ্রিম কোর্ট শাখায় এস কে সিনহার অ্যাকাউন্টে জমা হয়।
পরে বিভিন্ন সময়ে ক্যাশ, চেক ও পে-অর্ডারের মাধ্যমে ওই টাকা উত্তোলন করা হয়। এর মধ্যে এস কে সিনহার ভাইয়ের নামে শাহজালাল ব্যাংকের উত্তরা শাখার অ্যাকাউন্টে দুটি চেকে দুই কোটি ২৩ লাখ ৫৯ হাজার টাকা স্থানান্তর করা হয় ওই বছরের ২৮ নভেম্বর।
এজাহারে বলা হয়, “আসামি রনজিৎ চন্দ্র ঋণ দ্রুত অনুমোদনের জন্য প্রধান বিচারপতির প্রভাব ব্যবহার করেন। রনজিৎ চন্দ্রের ভাতিজা হলেন ঋণ গ্রহীতা নিরঞ্জন এবং অপর ঋণ গ্রহীতা শাহজাহান ও রনজিৎ ছোটবেলার বন্ধু। ঋণ গ্রহীতা দুইজনই অত্যন্ত গরিব ও দুস্থ। তারা কখনও ব্যবসা-বাণিজ্য করেননি।”