জাতীয় সংসদে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি জাতির পক্ষ থেকে বিনম্র শ্রদ্ধা প্রদর্শনের প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে। বাসস।
সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৯ নভেম্বর সংসদ কার্যপ্রনালী বিধির ১৪৭ ধারায় জাতির পিতার জীবন, কর্ম, আদর্শ, দর্শন তুলে ধরে এ মহান নেতার প্রতি জাতির পক্ষ থেকে সংসদে বিনম্র শ্রদ্ধা প্রদর্শন করার এ প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
সংসদে পর পর ৫ কর্যদিবস সরকারী- বিরোধী দলের মোট ৭৯ জন সংসদ সদস্য বঙ্গবন্ধুর জীবনাদর্শ আর সংগ্রামমুখর জীবনের বিভিন্ন দিকের ওপর ১৯ ঘন্টা ৩ মিনিট বিস্তারিতভাবে আলোচনা, স্মৃতি রোমন্থন ও এ মহান নেতার আদর্শ ধারন করার প্রত্যয় ব্যক্ত করার মাধ্যমেই রবিবার এ প্রস্তাব সংসদ গ্রহণ করে। এর মধ্য দিয়ে মুজিববর্ষ উপলক্ষে সংসদের বিশেষ অধিবেশনের কার্যক্রম শেষ হয়। গত ৯ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির ভাষণের মাধ্যমে বিশেষ অধিবেশন শুরু হয়।
সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রবিবার সাধারণ আলোচনায় অংশ নেন।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ শেষে সংসদে ১৯৭২ সালে ৪ নভেম্বর গণপরিষদে দেয়া জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের রেকর্ড বাজানো হয়।
এর আগে আলোচনায় অংশ নেন, স্পিকার ড.শিরীন শারমিন চৌধুরী, বিরোধী দলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ, কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, বিরোধীদলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদের, চিফ হুইপ নূর-ই- আলম চৌধুরী, সরকারি দলের সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, ইমাজ উদ্দিন প্রামানিক, অধ্যাপক আলী আশরাফ, বেগম ওয়াসিকা আয়েশা খান এবং জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ।
আলোচনায় অংশ নিয়ে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, সংবিধানকে সুরক্ষিত ও সমন্বিত রাখার ক্ষেত্রে সবাইকে সদা জাগ্রত ও সচেতন থাকতে হবে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে সংবিধানের সুফল বাংলার সকল মানুষের কাছে দেয়ার অঙ্গীকার করতে হবে।
স্পিকার বলেন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। জনগণের অভিপ্রায় পরম অভিব্যক্তি এই সংবিধান। ১৯৭২ সালের সংবিধানের মূল প্রতিপাদ্য “ভবিষ্যৎ বংশধররা যদি সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারে তাহলে আমার জীবন স্বার্থক হবে, শহীদদের রক্তদান স্বার্থক হবে।”
তিনি বলেন, জাতির পিতার বক্তব্যের এই মর্মকথা সবাইকে উপলবদ্ধি করতে হবে। সংবিধানের মূল প্রতিপাদ্য স্মরণ রাখতে হবে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ছড়িয়ে দিতে হবে। এই সংবিধানকে পরিপূর্ণভাবে কার্যকর করার দায়িত্ব জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু এ দেশপর জনগণ, ভবিষ্যৎ বংশধরদের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরই ন্যাস্ত করেছেন। বঙ্গবন্ধুর দর্শন ধারণ করে এই সংবিধান যেন বাংলার মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণের মধ্য দিয়ে অর্থবহ হয়। সেই লক্ষ্য অর্জনে কাজ করতে হবো। এই সংবিধান তখনই স্বার্থক হবে যখন বাংলার মানুষ ক্ষুধা, দারিদ্র্য,বঞ্চনা ও বৈষম্য থেকে মুক্ত হয়ে উন্নত জীবন পাবে। সেই লক্ষ্য অর্জনে নিরলসভাবে কাজ করছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া বক্তব্যে তুলে ধরে স্পিকার বলেন, গত ১৩ নভেম্বর ২০২০ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার এক বক্তৃতায় বলেন “আমি মানবতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছি।” বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে অনুধাবন করে মানবতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে অবহেলিত ও সুবিধা বঞ্চিত মানুষের উন্নতির জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রীর আর একটি বক্তব্যের লাইন তুলে ধরে স্পিকার বলেন, “প্রধানমন্ত্রী বলেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সবকিছুর আগে মানবতাকে অগ্রাধিকার দিতেন এবং জনগণের প্রতি তার ভালবাসা ছিল সীমাহীন। আমি এখন যা করছি তা জাতির পিতার আদর্শের প্রতিচ্ছবি।”
ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দারিদ্র্য, ক্ষুধামুক্ত ও উন্নত সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে সকলের প্রতি আহবান জানান।
তিনি বলেন, বাঙালির প্রাণের গভীর হতে উৎসারিত নির্মল ভালবাসায় অশ্রুধারায় সিক্ত হৃদয় নিংড়ানো আবেগ ও পরম শ্রদ্ধায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব থাকবেন সদা সমুজ্জল। ইতিহাসের পাতায় চির জাগ্রত অমর এক নাম শেখ মুজিব। তারই প্রেরণায় বাঙালি গেয়ে যাবে জীবনের জয়গান। এক মুজিবের রক্ত থেকে লক্ষ মুজিব জন্ম নেবে।
কবি গুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের উক্তি তুলে ধরে স্পিকার বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করে বলেন, রবিন্দ্রনাথের ভাষায় এভাবেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানে জন্মশতবার্ষিকী মুজিববর্ষে এই বিশেষ অধিবেশনে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে চাই।
“তোমারই নাম বলব আমি বলব নানা ছলে, বলব বিনা ভাষায়, বলব আশায় ,বলব মুখের হাসি দিয়ে, বলব চোখের জ্বলে, তোমারই নাম বলব আমি বলব নানা ছলে” বিশ্ব কবির এ কবিতার পংক্তির আবৃতির মাধ্যমে স্পিকার তার বক্তব্য শেষ করেন।
বঙ্গবন্ধুর প্রতি জাতির পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা প্রদর্শনের প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে সংসদে গৃহীত
জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশনের সাক্ষি হলেন রাষ্ট্রপতি
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ রবিবার সন্ধ্যায় একাদশ জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশনের সমাপনী দিনে বঙ্গবন্ধুর জীবন, কর্ম ও দর্শন নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনার সাক্ষী হতে রাষ্ট্রপতি বক্সে বসেছিলেন।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী ‘মুজিব বর্ষ’ উদযাপন উপলক্ষে গত ৮ নভেম্বর এই বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করা হয়।
এর আগে রাষ্ট্রপ্রধান গত ৯ নভেম্বর জাতীয় সংসদে তাঁর বিশেষ ভাষণ প্রদান করেন।
রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব জয়নাল আবেদীন বাসসকে জানান, সন্ধ্যা ৭টায় রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ সংসদ ভবনে পৌঁছালে চিফ হুইপ নুর-ই-আলম চৌধুরী তাঁকে স্বাগত জানান।
জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার, রাষ্ট্রপতি তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বসে বসে বাংলাদেশের সংবিধান প্রনয়ণকালে ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে বঙ্গবন্ধুর দেয়া ঐতিহাসিক ভাষণ শোনেন।
পরে রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় ‘প্রদর্শনীতে বঙ্গবন্ধু’ প্যাভেলিয়ন পরিদর্শন করেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মের বিভিন্ন বিরল ছবি ঘুরে ঘুরে দেখেন।
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, সংসদ সদস্য আতিউর রহমান আতিক এবং বঙ্গভবনের সংশ্লিষ্ট সচিবগণ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনে নতুন আদেশ, গেজেটে নাম থাকতে হবে
মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান প্রদর্শনের নতুন আদেশ জারি করেছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। গত ১০ নভেম্বর মন্ত্রণালয় থেকে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান প্রদর্শন আদেশ, ২০২০’ জারি করা হয়েছে। এ আদেশ দ্বারা এ সংক্রান্ত ২০০৫ সালের আদেশ রহিত করা হয়েছে।
নতুন আদেশে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান প্রদর্শনের জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে (www.molwa.gov.bd) প্রকাশিত প্রমাণকের যেকোনো একটিতে নাম থাকতে হবে। প্রমাণকগুলোর মধ্যে রয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতীয় তালিকা, মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতীয় তালিকা (পদ্মা), মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতীয় তালিকা (মেঘনা), মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতীয় তালিকা (সেক্টর) এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতীয় তালিকা (সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী)। লাল মুক্তিবার্তার মধ্যে রয়েছে লাল মুক্তিবার্তা (চূড়ান্ত লাল বই), লাল মুক্তিবার্তা স্মরণীয় যারা বরণীয় যারা।

ফাইল ছবি।
গেজেটের মধ্যে রয়েছে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা, খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা, বেসামরিক গেজেট, প্রবাসে বিশ্বজনমত গেজেট, ধারণাগত জ্যেষ্ঠতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের তালিকা, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) গেজেট, শব্দ সৈনিক- স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী ও কলা-কুশলীদের তালিকা, মুক্তিযোদ্ধাদের (বীরাঙ্গনা) তালিকা, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের খেলোয়াড়বৃন্দের তালিকা, ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি ছাত্র ইউনিয়ন, বিশেষ গেরিলা বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা, বিশ্রামগঞ্জ হাসপাতালে নিয়োজিত বা দায়িত্ব পালনকারী মুক্তিযোদ্ধা গেজেট, সরকারের মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রীবর্গের তালিকা এবং মুজিবনগর কর্মচারী তালিকা এবং জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের সুপারিশক্রমে মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত অন্য কোন নামীয় তালিকা সংক্রান্ত গেজেট।
বাহিনী গেজেটের মধ্যে রয়েছে যুদ্ধাহত সেনা মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা, যুদ্ধাহত পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ), যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) গেজেট, সেনা মুক্তিযোদ্ধাদের নামীয় তালিকা, বিমান বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা তালিকা, বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা, নৌ-কমান্ডোদের তালিকা, বাংলাদেশ রাইফেলসের (বর্তমান বিজিবি) মুক্তিযোদ্ধাদের নামীয় তালিকা, পুলিশ বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা।
আদেশে বলা হয়েছে, কোনো বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যু হলে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে জানাতে হবে। ঢাকায় অবস্থানরত খেতাবপ্রাপ্ত বা যুদ্ধাহত কোনো বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যু হলে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে অবহিত করবেন। বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, আত্মীয়-স্বজন বা কোনো নাগরিক প্রশাসনকে অবহিত করতে পারবেন। এমনকি সংবাদ মাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হলেও যাচাই করে প্রশাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।
মহানগর ও জেলা সদরে জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা পর্যায়ে হলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য সরকারের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করবেন। রাষ্ট্রীয় বা জনগুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত থাকলে জেলা প্রশাসকের পক্ষে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারের পক্ষে সহকারী কমিশনার (ভূমি) সরকারের প্রতিনিধিত্ব করবেন।
রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান প্রদর্শনের নিয়মের বিষয়ে আদেশে বলা হয়েছে, মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধার কফিন জাতীয় পতাকা দ্বারা আবৃত করতে হবে। তবে সৎকার বা সমাধিস্থ করার পূর্বে জাতীয় পতাকা খুলে ফেলতে হবে। সরকারের অনুমোদিত প্রতিনিধি কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। অনুমোদিত সংখ্যক পুলিশ বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যদের দ্বারা সশস্ত্র সালাম প্রদান করতে হবে এবং বিউগলে করুণ সুর বাজাতে হবে। সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গার্ড অব অনার পরিচালনা করবেন। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাষ্ট্রীয় বা জনগুরুত্বপূর্ণ কাজের কারণে থাকতে না পারলে থানার পরবর্তী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন। সশস্ত্র-বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে উক্ত বাহিনীর নিজস্ব রীতি অনুসরণ করতে হবে।
আদেশে আরো বলা হয়েছে, বীর মুক্তিযোদ্ধার অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী এবং ধর্মীয় নীতি অনুযায়ী সৎকার বা সমাধিস্থ করতে হবে। অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় হতে বরাদ্দকৃত অর্থ হতে অনুদান প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।
সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সামগ্রী ক্রয় ও রক্ষণাবেক্ষণে হাইকোর্টের ১১ দফা নির্দেশনা, ক্যান্সার গবেষণা ইন্সটিটিউটের সাবেক ৩ পরিচালকসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ
সরকারি অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সামগ্রী ও যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং রক্ষণাবেক্ষণে ১১ দফা নিয়ম অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।
বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের বেঞ্চ জনস্বার্থে জারি করা সুয়োমোটো রুলের শুনানি শেষে মঙ্গলবার এই রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইন্সটিটিউটে উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন আটটি জীবনরক্ষাকারী ভেন্টিলেটর কেনার ১২ বছর পরও স্থাপন না করায় প্রতিষ্ঠানটির সাবেক তিন পরিচালক ও আইসিইউ বিভাগের প্রধানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ারও নির্দেশ দিয়েছে।

রায়ে স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি ও অনিয়ম প্রতিরোধে দুদকের দেয়া সুপারিশমালার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণেরও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
ক্যান্সার গবেষণা ইন্সটিটিউটের ভেন্টিলেটর নিয়ে গত ২০ জানুয়ারি একটি ইংরেজি দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এটি হাইকোর্টের নজরে আনেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনোজ কুমার ভৌমিক। এরপর হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিতভাবে রুল জারি করেছিল।
মঙ্গলবার হাইকোর্ট সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সামগ্রী ও যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং রক্ষণাবেক্ষণে যে ১১ দফা নিয়ম অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছে সেগুলো হলো-
১.চিকিৎসার জন্য যেকোনো যন্ত্রপাতি, চিকিৎসা সামগ্রী ক্রয়ের পূর্বে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ কমিটি দ্বারা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের চাহিদা নিরূপণ করতে হবে। এ কমিটি দ্বারা চাহিদা নিরূপণ করে সরকারি ক্রয় বিধিমালা অনুসারে সর্বোচ্চ মানসম্পন্ন চিকিৎসা সামগ্রী বা যন্ত্রপাতি ক্রয় করতে হবে।
২.চাহিদা চূড়ান্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে উক্ত চাহিদাসম্পন্ন যন্ত্রপাতি স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ প্রয়োজন কি না তা নিরূপণ করতে হবে। অবকাঠামো প্রস্তুত হওয়া সাপেক্ষে যন্ত্রপাতি ক্রয় করতে হবে।
৩.সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক উপযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ এবং তাদের প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে।
৪.যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসা সামগ্রী ক্রয়ের ক্ষেত্রে অবাস্তব ও অতিমূল্য নির্ধারণ করে প্রাক্কলন তৈরি করা হয়। এ ক্ষেত্রে সঠিক ও বাস্তবসম্মত মূল্য নির্ধারণ করতে হবে।
৫.ঠিকাদারদের কাছ থেকে যন্ত্রপাতি বুঝে নেয়ার পূর্বে সরবরাহকৃত পণ্যের মান ও গুণ নিশ্চিত হতে হবে।
৬.জরুরিভিত্তিতে কোনো যন্ত্র ক্রয় ও চালু করার ক্ষেত্রে একইভাবে ১ ও ২ নম্বর শর্ত পূরণ করতে হবে।
৭.প্রতিটি হাসপাতালের যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসা সামগ্রীর যথাযথ মান নিরীক্ষা, যন্ত্রপাতিগুলো কার্যকর ও সচল রাখার বিষয়টি সার্বক্ষণিক তদারকি করতে একটি উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন কমিটি গঠন করতে হবে।
৮.কোনো যন্ত্রপাতি মেরামত কিংবা ওভার হোলিংয়ের প্রয়োজন হলে অবশ্যই উক্ত যন্ত্রপাতি চালু ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা অবিলম্বে তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নিয়মিতভাবে জানাবেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে তদারকির জন্য গঠিত কমিটিকে বিষয়টি অবহিত করতে হবে।
৯.এ বিষয়ে যথাসময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি তদন্ত করে দায় নির্ধারণ করবে এবং কোনো আর্থিক ক্ষতি হলে যার কারণে ক্ষতি হবে তার কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে।
১০.প্রতিটি স্থাপিত যন্ত্রের কক্ষের বাইরে উক্ত যন্ত্রের কর্মক্ষমতা ও মেয়াদকাল লিখিতভাবে উল্লেখ করে দেয়ালে টাঙিয়ে রাখতে হবে।
১১.যন্ত্রপাতিগুলোর ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের নজর রাখতে উপজেলা, জেলা এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কমিটি গঠন করা যেতে পারে বলেও রায়ে বলা হয়েছে।
স্বপ্ন পূরণের সারথি ডিজিটাল সেন্টার
বাল্যকাল থেকেই দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেন রংপুরের সদর উপজেলার সদ্যপুস্করিনী ইউনিয়নের কেশবপুর গ্রামের আকতারুল ইসলামের ছেলে আরিফুজ্জামান মুন (৩০)। আজ তিনিই একজন সফল আইসিটি উদ্যোক্তা।
২০১০ সালে সরকারের ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে আবেদন করেন তিনি। সেখানে কাজ শুরুর পর থেকে অদ্যাবধি সাধারণ মানুষকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। এই সেন্টার থেকে এ পর্যন্ত মোট ৪০০ জন শিক্ষিত যুবক ও যুব মহিলা কম্পিউটার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তাঁরা বর্তমানে আয়মূলক বিভিন্ন কার্যক্রমে জড়িত রয়েছেন। এখন তিনি আউটসোর্সিং ও অন্যান্য ডিজিটাল কার্যক্রমের ওপর মাস্টার ট্রেইনার হিসেবে কাজ করে মাসে ৪০-৫০ হাজার টাকা অতিরিক্ত আয় করছেন। পাশাপাশি ২০১২ সালে তিনি রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে রসায়নে সম্মান ডিগ্রি লাভ করেন।

কেশবপুর গ্রামের মনোয়ারা বেগম জানান, তার হারানো জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি এ সেন্টার থেকে খুব সহজেই সংগ্রহ করতে পেরেছেন। পালিচড়া গ্রামের আফরোজা বেগম সাত দিনের মধ্যেই এখানকার সেবার মাধ্যমে তাঁর জমির পর্চা পেয়েছেন।
ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে আরিফুজ্জামান মুনের মতো সারা দেশের আনাচে কানাচে ৬ হাজার ৬৮৬টি ডিজিটাল সেন্টারে কর্মরত ১৮ হাজারের অধিক উদ্যোক্তা এভাবেই বিশেষ ভূমিকা রাখছেন। তাঁরা ব্যাংকিং এবং ই-কমার্স সেবাসহ ২৭০টির অধিক সরকারি-বেসরকারি সেবা প্রদান করছেন। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রকল্পের আওতায় এই সেন্টার স্থাপিত হয়। বর্তমানে এসপায়ার টু ইনোভেট (এটুআই) প্রোগ্রাম-এর মাধ্যমে ডিজিটাল সেন্টারের কাজ চলছে সারাদেশে। দারিদ্র্যমোচন, স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অধিকাংশ অর্জনে এই ডিজিটাল সেন্টার ভূমিকা রাখছে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে জনগণের দোরগোড়ায় সহজে, দ্রুত ও স্বল্প ব্যয়ে সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ইউনিয়ন পরিষদ আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তাঁর কার্যালয় থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ২০১০ সালের ১১ নভেম্বর ভোলা জেলার চর কুকরিমুকরি ইউনিয়নের সাথে যোগাযোগ করে দেশের ৪ হাজার ৫০১টি ইউনিয়নে একযোগে ইউনিয়ন তথ্য ও সেবা কেন্দ্র উদ্বোধন করেন যা বর্তমানে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (ইউডিসি) নামে পরিচিত।
২০০৮ সালে রূপকল্প ২০২১ ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার মোবাইল ফোন সহজলভ্যতার নীতি গ্রহণের পাশাপাশি সাবমেরিন কেবলের সংযোগ স্থাপন করে। দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এসে তারা ডিজিটাল সেবা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ইন্টারনেট অবকাঠামোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া এবং দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবল স্থাপন করে। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে।
বর্তমানে দেশে ইন্টারনেটের মোট গ্রাহকসংখ্যা ১০৩ মিলিয়ন যা ২০০৮ সালে ছিল ৯৪ মিলিয়ন। একই সঙ্গে দেশকে ডিজিটাইজেশনের লক্ষ্যে এগিয়ে নেয়ার জন্য নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তি গ্রহণ করা হয়েছে। ২০১৪ সালে থ্রিজি ও ২০১৮ সালে ফোরজি টেকনোলজি গ্রহণ করা হয়েছে। এখন আমরা ৫জি নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। ইন্টারনেটের সূত্রে ডিজিটাল সেবার বহুমুখীকরণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। যার সরাসরি উপকারভোগী গ্রামের সাধারণ গরিব মানুষ।
গ্রামাঞ্চলে প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অবকাঠামোর উপস্থিতির কারণে গ্রাম ও শহরের ব্যবধান ক্রমান্বয়ে ছোট হয়ে আসছে। ডিজিটাল অবকাঠামো গ্রামীণ গতিশীলতা বৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে, তা বলাই বাহুল্যে। ২০১৮ সালে সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহারের ৩.১০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘আমার গ্রাম–আমার শহর’: প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা সম্প্রসারণ-এর বাস্তবায়ন ঘটে চলেছে এভাবেই। নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলে প্রতিটি গ্রামকে শহরে উন্নীত করার কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করার অংশ হিসেবে ইন্টারনেট বা তথ্য প্রযুক্তি সর্বত্র পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি সরকার বাস্তবায়ন করে চলেছে।
বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এর অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে সেই নির্বাচনি ইশতেহারের ৩.২১ অনুচ্ছেদের অঙ্গীকার ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নপূরণ: তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি’ বিশাল অবদান রয়েছে।
এসপায়ার টু ইনোভেট (এটুআই) প্রোগ্রাম-এর তথ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল সেন্টার বর্তমানে ২৭০-এর অধিক সেবা প্রদান করে থাকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জমির পর্চা, নামজারি, ই-নামজারি, পাসপোর্টের আবেদন ও ফি জমাদান, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, নাগরিক সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, হজ রেজিস্ট্রেশন, সরকারি সেবার ফরম, টেলিমিডিসিন, জীবন বীমা, বিদেশে চাকরির আবেদন, এজেন্ট ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, বাস-বিমান-লঞ্চ টিকেটিং, মেডিকেল ভিসা, ডক্টরের এপয়েনমেন্ট, মোবাইল রিচার্জ, সিম বিক্রয়, বিভিন্ন ধরনের কম্পিউটার এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ, ই-মেইল, কম্পোজ-প্রিন্ট-প্রশিক্ষণ, ফটো তোলা, ফটোকপি, সরকারি ফরম ডাউনলোড করা পরীক্ষার ফলাফল জানা, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবদেন করা, অনলাইন ভিসার আবেদন করা, কৃষি পরামর্শ ও তথ্য সেবা ইত্যাদি।
একজন উদ্যোক্তা সেবা প্রদানের মাধ্যমে মাসে প্রায় ৫ হাজার থেকে ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন। গড়ে প্রতিমাসে ডিজিটাল সেন্টার থেকে ৬০ লক্ষেরও বেশি মানুষ সেবা গ্রহণ করে থাকে বলেও এটুআই সূত্রে জানা গেছে।
এ যাবৎ ডিজিটাল সেন্টার হতে মোট ৫৫.৪ কোটি সেবা প্রদান করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে নাগরিকদের ১৬৮ কোটি সমপরিমাণ কর্মঘণ্টা ও ৭৬,৭৭৫ কোটি টাকা ব্যয় সাশ্রয় হয়েছে। নাগরিকদের জীবনমান পরিবর্তনে ইতিবাচক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ডিজিটাল সেন্টার ২০১৪ সালে ই-গভর্নমেন্ট ক্যাটাগরিতে জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (ITU)-এর ওয়ার্ল্ড সামিট অন ইনফরমেশন সোসাইটি (WSIS) অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়েছে।
২০১৩ সালে দেশে দেশের সকল পৌরসভার ‘পৌর ডিজিটাল সেন্টার (পিডিসি) এবং ১১টি সিটি কর্পোরেশনের সকল ওয়ার্ডে ‘নগর ডিজিটাল সেন্টার (সিডিসি)’ চালু করা হয়, ২০১৮ সালে ৬টি ‘স্পেশালাইজড ডিজিটাল সেন্টার (এসডিসি)’ চালু করা হয়। যার মধ্যে গার্মেন্টস কর্মীদের জন্য গাজীপুরে ৫টি এবং মৎসজীবী শ্রমিকদের জন্য খুলনার রূপসায় ১টি, ২০১৮ সালে সৌদিআরবে ১৩টি ‘এক্সপাট্রিয়েট ডিজিটাল সেন্টার (ইডিসি)’ স্থাপন করা হয়, বর্তমানে সারাদেশে ডিজিটাল সেন্টারের সংখ্যা ৬৬৮৬টি (ইউডিসি-৪৫৭১, পিডিসি-৩২৮, সিডিসি-৪৬৫, এসডিসি-৬, ইউপিডিসি-৪৯২, ইডিসি-১৩, সাবসেন্টার-৮৮১), মোট উদ্যোক্তা ১৩ হাজারের অধিক এবং নারী উদ্যোক্তা ৫ হাজারের অধিক।
করোনা মহামারির সময়ে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারগুলো টেলিমেডিসিন সেবার মাধ্যমে জনগণকে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ‘মুজিববর্ষে’ তৃণমূল জনগণকে ই-সেবা সম্পর্কে অবহিতকরণ, সেবাগ্রহণে মধ্যস্বত্বভোগী ও দুর্নীতির আশ্রয় নিরোধে ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে ‘মুজিব শতবর্ষ ই-সেবা ক্যাম্পেইন-২০২০’ পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ১১ অক্টোবর হতে ১০ নভেম্বর ২০২০ পর্যন্ত এই ক্যাম্পেইন ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে সারাদেশে চলছে।
নাগরিকদের ২ কি.মি. আওতায় মধ্যে সেবাপ্রদান কার্যক্রম আনয়নের জন্য ২০২৩ সালের মধ্যে ১০ হাজার ডিজিটাল সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে এটুআই। সেবা তালিকায় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নতুন নতুন সেবা সংযুক্তিকরণের মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় প্রায় ৫০০ সরকারি-বেসরকারি সেবা এসকল সেন্টারের মাধ্যমে প্রদান করা হবে।
আগামী দিনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ব্লকচেইন, রোবটিকসের মতো প্রযুক্তিগুলো নিয়ে কাজ করতে হলে আমাদের দক্ষ জনবলের বিকল্প নেই। ডিজিটাল সেন্টারগুলো আমাদের দেশের তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সেই জনবল সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো এখন আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। ডিজিটাল বাংলাদেশের যে স্বপ্ন আমাদের দেখিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয়, সেটা আজ বাস্তবতা। আমরা এখন ঘরে বসে অনেক কাজ করছি, অনলাইনে শিক্ষার্থীরা অনলাইনে ক্লাস করছে, জরুরি মিটিং করা যাচ্ছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রস্তুতি হিসেবে ডিজিটাল সেন্টারকে সাথে নিয়ে আমাদের আরো দ্রুত এগোতে হবে। গ্রাম হবে শহর, এই স্বপ্নপূরণের দোরগোড়ায় আমরা প্রায় পৌঁছে গেছি।
পরীক্ষিৎ চৌধূরী, তথ্য কর্মকর্তা, তথ্য অধিদপ্তর।
ইতিহাস থেকে কখনো বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলা যাবে না : সংসদে প্রধানমন্ত্রী
ইতিহাস প্রতিশোধ নেয়, উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, অতীতে বহুবার ইতিহাস থেকে জাতির পিতার নাম মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র হলেও তা মোছা যায়নি, আর কোনদিনও মোছা যাবেনা।
তিনি বলেন, ‘ইতিহাস আসলে মুছে ফেলা যায়না। ইতিহাসও প্রতিশোধ নেয়। আজকের ইতিহাস এবং সেই নাম আর কেউ মুছতে পারবেনা, এটা হচ্ছে বাস্তবতা।’
মুজিববর্ষে জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ১৪৭ এর (১) বিধির আওতায়
প্রস্তাব উত্থাপনকালে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা একথা বলেন।
‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কর্মময় জীবন নিয়ে আলোচনা এবং জাতির পিতার প্রতি জন্মশতবার্র্ষিকীতে শ্রদ্ধা নিবেদনে’ এই প্রস্থাবটি সংসদ নেতা নিজেই উত্থাপন করেন।
এ সময় স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
প্রধানমন্ত্রী ’৭৫ এর ১৫ আগষ্টের সেই বিয়োগান্তক অধ্যায় স্মরণ করে বলেন,‘ সেদিন কেবল একজন রাষ্ট্রপতিকেই হত্যা করা হয়েছে তা নয়, আমার ১০ বছর বয়সী ছোট ভাইটিও খুনীদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। আমি ও রেহানা বিদেশে থাকায় বেঁচে যাই। তাওতো দেশে ফেরায় আমাদের অনেক বাঁধা ছিল। তারপরেও আমি ফিরে আসতে পারায় এবং সরকার গঠন করতে পারায় বাংলাদেশের জনগণের প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা জানাই।
নিজের ওপর বার বার হত্যা প্রচেষ্টার কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সরকার গঠন প্রসংগে বলেন, ‘জনগণ সেই সুযোগটা দিয়েছে বলেই আজকে আমরা তাঁর জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপন করতে পারছি, আওয়ামী লীগ সরকারের রয়েছে এবং স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীও ২০২১ সালে আমরা উদযাপন করবো।’
আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যদের মধ্যে সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, মুহম্মদ ফারুক খান এমপি, মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার এমপি, অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম এমপি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপি, সিমিন হোসেন রিমি এমপি এবং গণফোরামের সংসদ সদস্য সুলতান মোহম্মদ মনসুর এমপি আলোচনায় অংশ গ্রহণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা ১৪৭ এর (১) বিধির সাধারণ প্রস্তাবে যে বিষয়টি তুলে ধরেন তা হল- “সংসদের অভিমত এই যে, ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা ও স্থপতি, বাঙ্গালির অবিসংবাদিত মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙ্গালী জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনে তিনি সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন। জেল-জুলুম অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করেছেন। কিন্তু অন্যায়ের সাথে কখনো আপস করেননি।”
“১৯৪৭-৪৮ থেকে ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট গঠন, ১৯৬৬ এর ছয় দফা ১৯৬৮ এর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ এর নির্বাচন- দীর্ঘ ২৪ বছরের সংগ্রাম ও আন্দোলনের পথ ধরে ১৯৭১ এর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা। ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণে বজ্রকণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’।”
“বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলার নিরস্ত্র জনগণ ঘরে ঘরে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে দুর্গ গড়ে তুলেছিল। ২৬ মার্চ ১৯৭১ এর প্রথম প্রহরে জাতির পিতা শেখ মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ৩০ লক্ষ শহীদ ও দুই লক্ষ মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে স্থান লাভ করে। বঙ্গবন্ধু আমাদের দিয়েছেন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। লাল-সবুজের পতাকা ও সংবিধান।”
প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রস্তাবে বলেন, “বঙ্গবন্ধু বিশ্বসভায় বাঙ্গালিকে আত্মপরিচয় নিয়ে গর্বিত জাতিরূপে মাথা উঁচু করে চলার ক্ষেত্র রচনা করেছেন। স্বাধীনতার পর একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ে তোলার জন্য মাত্র সাড়ে তিন বছর সময় পেয়েছিলেন তিনি। সেই সময়কালেই বাংলাদেশের উন্নয়নের সামগ্রিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেন তিনি।”
বঙ্গবন্ধু কন্যা এবং সংসদ নেতা আরো বলেন, “২০২০ সালে জন্মশতবার্ষিকীতে মুজিব বর্ষ উদযাপন উপলক্ষে তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক এবং কর্মজীবন ও দর্শনের উপর জাতীয় সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করা হোক।”
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে জাতির পিতার অনুপম দেশ প্রেম এবং দু:খী মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার জন্য আজন্ম জীবন সংগ্রামে জেল, জুলুম, অত্যাচার-নির্যাতনের করুণ উপাখ্যানের কিয়দংশ জাতীয় সংসদে তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতার ১ ফেব্রুয়ারী ১৯৭২ সালে দেয়া ভাষণের উল্লেখযোগ্য অংশ উদ্ধৃতি তুলে ধরেন।
জাতির পিতা বলেছিলেন,‘আমরা একটা আদর্শের জন্য সংগ্রাম করেছি। আমার সরকারের নীতি হচ্ছে স্বাধীনতার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া। সাধারণ মানুষ আর মুক্তিযোদ্ধারা তাদের রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। তাই স্বাধীনতার সুফল তারা যেন ভোগ করতে পারে অবশ্যই তার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে।’
কাজেই বাঙ্গালি জাতির মুখে হাসি ফোটানোটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি,বলেন প্রধানমন্ত্রী।
১৯৭৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের ভৈরবে একটি জনসভায় দেওয়া ভাষণে জাতির পিতা আরো বলেন,‘ভিক্ষা করে কেউ কোনদিন সম্মান নিয়ে বাস করতে পারেনা। আমি আমার সাড়ে ৭ কোটি লোককে সারাজীবনের জন্য ভিক্ষুকের জাত করতে চাইনা। আমি চাই একটি স্বয়ংসম্পূর্ন দেশ, একটি শোষণহীন দেশ, যে দেশের মানুষ পেট ভরে ভাত খাবে,সুখে বসবাস করবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির পিতা সব সময় বলতেন ভিক্ষুক জাতির কোন ইজ্জত থাকেনা। বাংলাদেশটাকেও আমরা বঙ্গবন্ধুর সেই আদর্শ নিয়েই গড়ে তুলতে চাই, সেটাই আমাদের লক্ষ্য।’
তিনি বলেন,‘ দুর্ভাগ্য আমাদের বাঙ্গালির জীবনে ’৭৫ এর ১৫ আগষ্ট না আসলে জাতি হিসেবে বাঙ্গালি অনেক আগেই উন্নত হতে পারতো। কারণ জাতির পিতার মধ্যে একটা আত্মবিশ^াস ছিল । কারণ এই বাঙ্গালি জাতিকে নিয়েই তিনি মুক্তিযুদ্ধে করে বিজয় অর্জন করেছিলেন।
১৯৭৪ সালে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে ১৫ ডিসেম্বর দেয়া ভাষণে জাতির পিতা বলেন,‘এই বাংলায় সম্পদের অভাব নেই। কিন্তু তা সদ্ব্যবহারের জন্য সময়ের প্রয়োজন। আমরা যদি বাংলার সম্পদ বাংলার মাটিতে রাখতে পারি, সমাজতান্ত্রিক উপায়ে বিলি-বন্টন ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করতে পারি এবং সকলে মিলে কঠোর পরিশ্রম করে কল-কারখানায়, ক্ষেতে-খামারে উৎপাদন বাড়াতে পারি তবে, ইনশাল্লাহ আমাদের ভাবি বংশধরদের শোষণমুক্ত সুখী ও সমৃদ্ধশালী এক ভবিষ্যত উপহার দিতে পরবো।’
অর্থাৎ জাতির পিতা কেবল স্বাধীনতাই দেননি, দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের কার্যকর পদক্ষেপও গ্রহণ করেছিলেন, যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী ’৭০ এর নির্বাচন এবং নিখীল পাকিস্থানে আওয়ামী লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন প্রসংগে বলেন, ’৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ২০টি রাজনৈতিক দলের আরো একটি জোট অংশগ্রহণ করেছিল। তাদের ধারণা ছিল আওয়ামী লীগ কখনও জিততে পারবেনা, কিন্তু গোটা পাকিস্তানেই আওয়ামী লীগ যখন সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেল তখন আর ক্ষমতা হস্তান্তর হলোনা। ’
সংসদ নেতা বলেন, তখনই তিনি (বঙ্গবন্ধু) অসহযোগের ডাক দিলেন, দিলেন ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ। তিনি পুরো ভাষণে একটি যুদ্ধের নির্দেশনা দিয়ে যান। তাঁর বিখ্যাত উক্তি ছিল-‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
শেখ হাসিনা বলেন,যে ভাষণ আজ বিশে^ ঐহিহ্যের প্রামান্য দলিল হিসেবে স্থান করে নিয়েছে কিন্তু ’৭৫ এর পর তা এ দেশে বাজানো নিষিদ্ধ ছিল। এমনকি ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুর নামও সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে জাতির পিতার বিভিন্ন কুটনৈতিক সাফল্যের প্রতি আলোকপাত করে বলেন, ‘জাতির পিতা যুদ্ধ বিধ্বস্থ দেশ পুণর্গঠনকালেই ১৪০টি দেশের স্বীকৃতি আদায় করেন, ’৭২ সালে আমরা কমনওয়েলথ ও আইএমএফ এবং ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘ এবং ওআইসি’র সদস্য পদ ও লাভ করি। কারণ জাতির পিতার মত বলিষ্ঠ নেতৃত্বের দেশ প্রেমকে বিশ^ স্বীকৃতি দিয়েছিল। সে জন্য এত দ্রুত এতগুলো স্বীকৃতি এবং সুযোগ লাভ করি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাকিস্তানের কারাগার থেকে স্বদেশে ফিরে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারির ভাষণে বঙ্গবন্ধু সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে বলেছিলেন, কিন্তু ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারে নাই। তাঁকে এই বাংলাদেশে, যাদেরকে তিনি গভীরভাবে ভালবাসতেন আর সেই মানুষের হাতেই তাঁকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে।
‘যেখানে ফিদেল ক্যাষ্ট্রো তাঁকে সাবধান করেছিলেন। মিসেস গান্ধীও বলেছিলেন- একটা ষড়যন্ত্র হচ্ছে সাবধান। অথচ, বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন এরা আমার দেশের ছেলে, এরা আমার সন্তানের মত, কাজেই এরা আমাকে মারবেনা, মারতে পারেনা। আমি তাদের জন্য কাজ করি। তারা আমাকে কেন মারবে।,’যোগ করেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘তাঁর (বঙ্গবন্ধু) একটা বিশ^াস এদেশের মানুষের ওপরে ছিল। তিনি এই বিশ^াস ঘাতকদের স্বচক্ষে দেখে গেলেন । কিন্তু কারা এর পেছনে রয়েছে জানতে পারলেন না। এটাই দুর্ভাগ্য যে তাঁর বিশ^াসটা বাঙ্গালি জাতি রাখতে পারলোনা। এরা অবশ্যই একটি মুষ্টিমেয় ক্ষুদ্র গোষ্ঠী। এদেশের আপামা জনগণ নয়।’
তিনি বলেন, ‘কারণ কর্ণেল ফারুক বিবিসিতে দেয়া একটা স্বাক্ষাৎকালে বলেছেন তিনি (বঙ্গবন্ধু) এতই জনপ্রিয় ছিলেন যে, অনেক অপ্রপচার করেও তাঁর জনপ্রিয়তা এতটুকু কমানো যায়নি। তাই তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য হত্যা করা ছাড়া কোন উপায় ছিলনা। কাজেই তারাতো আত্মস্বীকৃত খুনী।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পকিস্তানের কারাগারে জাতির পিতা কেমন অত্যাচার নির্যাতনের মধ্যে দিন কাটান তা কখনও বলেন নি। রেহানা জিজ্ঞেস করলে শুধু বলতেন- জানতে চাসনা, সহ্য করতে পারবি না। ইয়াহিয়া খান তাঁকে ফাঁসির হুকুম দেয় এবং জেলখানার মধ্যে তাঁর সেলের কাছে তাঁর জন্য কবরও খোঁড়া হয়। অথচ তাঁর মৃত্যুর পর কত অপ্রচার চালানো হয়, কত অপবাদ দেয়া হয়।’
তৎকালিন বিখ্যাত সাংবাদিক ডেভিড ফ্রষ্টকে দেওয়া জাতির পিতার ঐতিহাসিক স্বাক্ষাৎকারের প্রসংগও টেনে আনেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন,ডেভিড ফ্রস্টের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তাঁর (বঙ্গবন্ধু) কোয়ালিফিকেশন সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন,‘আই লাভ মাই পিপল।’ আর ডিসকোয়ালিফিকেশন-‘আই লাভ দেম টু মাচ।’
শেখ হাসিনা এ দিনের বিশেষ অধিবেশণে রাষ্ট্রপতির দেয়া ভাষণের ওপর আলোচনায় বলেন, রাষ্ট্রপতি অনেক সুন্দর একটা ভাষণ দিয়ে গেছেন। ইতিহাসের অনেক না জানা কথা অনেকে জানার সুযোগ পেয়েছেন। অনেক সংসদ সদস্য বক্তব্য রাখবেন, যারমধ্য দিয়ে আরো অনেক কিছু জানার সুযোগ হবে। আর এর মাধ্যমে এই মহান নেতার প্রতি আমরা আমাদের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করবো।
প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদ নেতা বলেন, ‘জাতির পিতা আমাদের যে একটা আত্মপরিচয় দিয়েছেন, একটা রাষ্ট্র দিয়েছেন এটাই সব থেকে বড় কথা। এই রাষ্ট্রটাকে আমরা ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মুক্ত করে উন্নত সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলবো সেটাই আমাদের প্রতিজ্ঞা।’ বাসস।
বঙ্গবন্ধুর কর্ম, চিন্তা, আদর্শ ও দর্শন বাংলাদেশসহ বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়ার আহ্বান রাষ্ট্রপতির
রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কর্ম, চিন্তা, আদর্শ ও দর্শন বাংলাদেশসহ বিশ্বের তরুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে দেশের রাজনীতিক, ঐতহিাসিক, শিক্ষাবিদ, গবেষক, এবং সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র, দেশ ও জীবন গড়তে বঙ্গবন্ধুর জীবন,কর্ম ও আদর্শ নতুন প্রজন্মর জন্য বড় অনুপ্রেরনা হয়ে আছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকী মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশনের ভাষণে তিনি সোমবার এ আহবান জানান। এর আগে রাষ্ট্রপতি সন্ধ্যা ৬টা ৮ মিনিটে অধিবেশন কক্ষে প্রবশে করলে নিয়ম অনুযায়ি জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হয়। সবাই দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শণ করেন। এ সময় ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে বঙ্গবন্ধুর দেয়া ঐতিহাসিক ভাষণ বাজানো হয়। এর পর সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটে রাষ্ট্রপতি ভাষণ শুরু করেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশকে জানতে হলে, বাঙালির মুক্তি সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে হবে, বঙ্গবন্ধুকে জানতে হবে। এই দুই সত্তাকে আলাদাভাবে দেখার চেষ্টা যারা করেছেন তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন। আজকের বাস্তবতা এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর জাতির পিতার আদর্শকে ধারণ করে জাতি এগিয়ে যাক ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথে, নোঙ্গর ফেলুক বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলায়’।’
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একটি নাম নয়। বঙ্গবন্ধু একটি প্রতিষ্ঠান, একটি সত্তা, একটি ইতিহাস। জীবিত বঙ্গবন্ধুর মতোই অন্তরালের বঙ্গবন্ধু শক্তিশালী। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, বাঙালি থাকবে, এদেশের জনগণ থাকবে, ততদিনই বঙ্গবন্ধু সকলের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন। নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষের মুক্তির আলোকবর্তিকা হয়ে তিনি বিশ্বকে আলোকময় করেছেন । তাই দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে বঙ্গবন্ধুর নীতি, আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বেড়ে উঠতে পারে সে লক্ষ্যে সকলকে উদ্যোগী হতে হবে।
করোনা ভাইরাস সংক্রমনের এ সময় সব স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের এ বিশেষ (দশম) অধিবেশনের দ্বিতীয় কার্যদিবসে রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও সরকার এবং বিরোধী দলীয় সদস্যরা সংসদে উপস্থিত ছিলেন।
আবদুল হামিদ বলেন, বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাস মানবসভ্যতাকে ইতিহাসের এক চরম বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছে। একবিংশ শতাব্দীর অপার সম্ভাবনাময় বিশ্বকে ঠেলে দিয়েছে মারাত্মক হুমকির মুখে। করোনার প্রভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে গোটা বিশ্বের অর্থনীতি, কর্মহীন হয়ে পড়েছে কোটি কোটি মানুষ। উন্নত বিশ্ব হিমশিম খাচ্ছে করোনা দুর্যোগ মোকাবেলায়। বাংলাদেশও এর ব্যাতিক্রম নয়। ইতোমধ্যে করোনায় দেশ অনেককে হারিয়েছে, যাঁদের মধ্যে রয়েছেন বরেণ্য রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, শিল্পী-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, চিকিৎসক, নার্সসহ নানা পেশা ও বয়সের মানুষ।
তিনি বলেন, করোনার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পসহ অর্থনীতির সকল সেক্টরে। ঘরবন্দি হয়ে পড়েছে কোটি কোটি মানুষ। জীবনযাত্রায় নেমে আসে অচলাবস্থা। এ অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩১ দফা নির্দেশনা প্রদান এবং প্রতিনিয়ত ভার্চুয়াল কনফারেন্সের মাধ্যমে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাগণের সঙ্গে মতবিনিময় ও দিক-নির্দেশনা প্রদান করেছেন। তাঁর এই সময়োচিত সাহসী সিদ্ধান্ত এবং অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে বাংলাদেশ করোনা পরিস্থিতি সাফল্যের সাথে মোকাবেলা করে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তাঁর সাহসিকতা ও দূরদর্শী নেতৃত্বের জন্য রাষ্ট্রপতি আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
তিনি বলেন, করোনা ভাইরাস বৈশ্বিক সমস্যা। একক বা আঞ্চলিক ভিত্তিতে এর প্রাদুর্ভাব মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। আজ কেউই সুরক্ষিত নই, যতক্ষণ না পর্যন্ত সুরক্ষার জন্য ভ্যাকসিন আবিষ্কার হচ্ছে। অতীতে মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্লেগ, স্প্যানিশ ফ্লু, কলেরা, টাইফয়েড, যক্ষা, হাম, ম্যানিনজাইটিস, পোলিও ইত্যাদি মহামারী ও সংক্রামক ব্যাধিতে কোটি কোটি লোক প্রাণ হারিয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞান থেমে থাকেনি। সময়ের অগ্নিপরীক্ষায় মানুষ এসবের প্রতিষেধক আবিষ্কার করেছে। তাই একসময় যা মহামারী ছিল আজ তা বিশ্ব থেকে নির্মূল হয়েছে।
তিনি বলেন,‘গোটা বিশ্ববাসীর মতো আমরাও আশাবাদী অচিরেই করোনা ভাইরাসের টিকা আবিষ্কৃত হবে, যা গোটা মানবজাতিকে এক চরম অনিশ্চয়তা, হতাশা, উৎকন্ঠা থেকে মুক্তি দেবে। স্বস্তি ফিরে আসবে ঘরে ঘরে। তবে এ ভ্যাকসিন বিশ্বের সকল দেশ ও অঞ্চল যাতে একইসময়ে ও সমভাবে পায় তা নিশ্চিত করতে বিশ্বসম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে।’
তিনি জাতিসংঘসহ বহুজাতিক সংস্থা ও উন্নত বিশ্বকে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসার উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশবাসী এ জেনে আশাবাদী যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার যথাসময়ে ভ্যাকসিন পাওয়ার সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, “৭ কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না”। করোনা মহামারী দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারাকে সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত করলেও থামিয়ে দিতে পারেনি। তিনি আশা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে করোনাসহ সকল বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে বাঙালি জাতি কাঙ্খিত লক্ষ্যে এগিয়ে যাবে এবং গড়ে তুলবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সুখী-সমৃদ্ধ ‘সোনার বাংলা’।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত, দুর্নীতি ও শোষণহীন সমৃদ্ধ এক বাংলাদেশ। জাতির পিতার দর্শন ছিল ‘বাংলার মানুষের মুক্তি’। সেই মুক্তি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি। তিনি কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের লক্ষ্যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো উন্নয়নে ভবিষ্যত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। পরিকল্পিত উন্নয়নের ওপর ভিত্তি করে বঙ্গবন্ধু আধুনিক রাষ্ট্রের রূপরেখা প্রণয়ন করেছিলেন, যা দেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৭৩-১৯৭৮) প্রতিফলিত হয়েছিল। তাঁর সুযোগ্য উত্তরাধিকারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ ২০১৫ সালে এমডিজির অধিকাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনসহ নিম্ন মধ্যআয়ের দেশের মর্যাদায় উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ ২০১৮ সালে প্রথমবারের মত স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ উত্তীর্ণ হওয়ার সকল শর্ত পূরণ করেছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। কিছু কিছু সূচকে বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে। বাংলাদেশ আজ এশিয়ার সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশ।
তিনি বলেন, পরপর তিন বছর ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জনের পর গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক এক-পাঁচ শতাংশে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু করোনা মহামারীর কারণে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক দুই-চার শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব না হলেও প্রবৃদ্ধির এ হার ছিল এশিয়া এমনকি বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের চেয়েও বেশি। দেশের জনগণের মাথাপিছু আয় দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় দুই হাজার চৌষট্টি মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও এখন ৪১ বিলিয়ন ডলারের উপরে। দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় মানুষের গড় আয়ু ছিল ৪৭, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২ বছরের উপরে। প্রাথমিক স্কুলে যাওয়া ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা প্রায় শতভাগ। স্বাক্ষরতার হার ৭৪ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। শিশু ও মাতৃ মৃত্যুহার হ্রাস পেয়েছে।
আবদুল হামিদ বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে সরকার ‘রূপকল্প-২০৪১’ কে সামনে রেখে বহুমাত্রিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত, উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন দর্শন ‘রূপকল্প ২০৪১’-এর প্রধান অভীষ্ট হলো ২০৩১ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্যের অবসান, উচ্চ-মধ্য আয়ের দেশের মর্যাদায় উত্তরণ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের অবলুপ্তিসহ উচ্চ আয়ের দেশের মর্যাদায় আসীন হওয়া যেখানে মাথাপিছু আয় হবে ১২ হাজার ৫শ’ মার্কিন ডলারেরও বেশি। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ২০২১-২০৪১ মেয়াদে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৯ শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন। সেইসাথে নিশ্চিত করতে হবে পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা, ব্যাপক শিল্পায়ন, অর্থনীতি সুসংহতকরণ, নগরায়ন, শতভাগ বিদ্যুতায়ন, জ্বালানি বহুমুখীকরণ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলাসহ মেধাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ।
তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ড বিস্তারিতভাবে তুলে ধরে খাধ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত, কৃষি, শিক্ষা, আবাসন, বিদুৎ-জ্বালানি, ব্যবসা-বাণিজ্য, স্বাস্থ্য, সুশাসন, নারী ও শিশুদের সর্বোচ্চ কল্যাণ নিশ্চিত, নারীর ক্ষমতায়ন, তথ্য ও প্রযুক্তি, ক্রীড়া ও যুব উন্নয়ন, পল্লী উন্নয়নসহ সব খাতে অর্জিত ব্যাপক সাফল্যের খতিয়ান দেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, উন্নয়নের জন্য শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ নির্মূল, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন ও বিকাশ, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিভিন্ন পুরস্কার এবং সম্মাননায় ভূষিত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রদত্ত এ সকল আন্তর্জাতিক পুরস্কার এবং সম্মাননাসমূহ সমগ্র বিশ্বে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। এ বিরল সম্মান দেশ ও জাতির জন্য গৌরবজনক। এজন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান।
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর সময়ে সংসদে নবীন সদস্য হিসাবে তিনি সিনিয়র ও অভিজ্ঞ সদস্যদের কার্যক্রম গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ এবং অনুসরণ করতেন।
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু জাতীয় সংসদের কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন এবং বিরাধী দলের সদস্যদের মতামতকেও অধিক গুরুত্ব দিতেন। সেময় বিরোধী দলের স্বল্প সংখ্যক সদস্য থাকা সত্বেও তাদের সংসদে মতামত তুলে ধরার জন্য অনেক সময় দেয়া হতো ।
এর আগে রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণের শুরুতেই স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করনে । সাথে সাথে তিনি সকল বীর মুক্তিযোদ্ধা ও অমর শহিদদের সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করেন, যাঁদের অসীম সাহস ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে সার্বভৌম দেশ ও স্বাধীন জাতিসত্তা, পবিত্র সংবিধান ও লাল-সবুজ পতাকা অর্জিত হয়েছে।
ভাষণ শেষে মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতিকে জাতীয় সংসদের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীমূলক স্মারক গ্রন্থসমূহ উপহার দেয়া হয়। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী রাষ্ট্রপতির হাতে উপহার তুলে দেন। এর পর রাষ্ট্রপতি প্রস্থান করলে স্পিকার অধিবেশন ১৫ মিনিটের জন্য মুলতবি করেন। বাসস।
মামলার রায় বাংলায় লিখতে বিচারকদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান, দরকার হলে ট্রান্সলেটর নিয়োগ দিন
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আদালতের রায় বাংলায় লেখার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রয়োজনে এ ক্ষেত্রে ট্রান্সলেটর নিয়োগ দানের ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং বিচার বিভাগের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বিচারাধীন মামলাগুলোর দীর্ঘসূত্রিতা কমিয়ে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গ্রহণে বিচারক এবং আইনজীবীদের প্রতি আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রায় যদি কেউ বাংলায় লিখতে না পারেন, ইংরেজীতে লেখেন কোন আপত্তি নেই। কিন্তু সেই রায়টা বাংলায় ট্রান্সলেশন করে যেন প্রচার হয় সে ব্যবস্থাটা করে দিতে হবে।’
তিনি বলেন, আমাদের দেশে মামলার রায়গুলো ইংরেজীতে দেওয়া হয়। অনেকে সেই রায়টা বুঝতে না পারায় আইনজীবীরা যেভাবে বোঝান সেভাবে তাদের বুঝতে বা জানতে হয়।

তিনি আরো বলেন, দীর্ঘদিন যাবত ইংরেজীতে লিখতে লিখতে অনেকে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। তাই, বাংলাতেই রায় লিখতে হবে, এ ধরনের চাপ প্রয়োগ ঠিক নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে, আমি বলবো, এগুলো ট্রান্সলেশন করা এমন কোন কঠিন কাজ নয়, অনেক প্রফেশনাল ট্রান্সলেটর আছেন। তাদেরকেও আপনারা প্রশিক্ষণ দিয়ে নিতে পারেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুধবার সকালে ঢাকা জেলার নবনির্মিত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ভবন উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির ভাষণ দেন।
প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রাজধানীর জনসন রোডস্থ আদালত পাড়ায় ঢাকা জেলার নবনির্মিত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট ভবনের মুল অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ট্রান্সলেটরদের কাজ হবে যেটাই লেখা হোক সব ট্রান্সলেশন হয়ে যাবে এবং সেটাই প্রচার হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষ জানতে পারবে। ফলে, বিচারের কি রায় হলো তারা সেটা নিজে দেখে বুঝতে পারবে, জানতে পারবে।
তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতিকেও আমি অনুরোধ করবো, আইনমন্ত্রীও এখানে আছেন, আপনারা কিছু ব্যবস্থা নেন। কারণ, এটা জুডিশিয়াল ব্যাপার, এর অনেক কথা, শব্দ, টার্মস যেগুলো আমাদের সাধারণক্ষেত্রে ব্যবহার হয় না সেগুলোর অনুবাদ যদি সহজভাবে করা যায়।
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘এ ব্যাপারে যদি কোন ফান্ড লাগে সেটারও ব্যবস্থা করবো। কিন্তু, আমি চাই, এটা যেন হয়।’
মানুষের ন্যায় বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে যেকোন প্রকার সহযোগিতায় তাঁর সরকার সর্বদা প্রস্তুত উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বিচারাধীন মামলাগুলোর দীর্ঘসূত্রিতা কমিয়ে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গ্রহণেও বিচারক এবং আইনজীবীদের প্রতি আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জুন ২০২০ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন আদালতে ৩৭ লক্ষ ৯৪ হাজার ৯০৮টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলার দীর্ঘসূত্রিতা কমিয়ে দ্রুততম সময়ে রায় প্রদানের উপায় বের করার জন্য সকল বিচারক এবং আইনজীবীগণের কাছে আমি অনুরোধ জানাচ্ছি। ’
তিনি বলেন, ‘এই এত মামলা এভাবে জমে যেন না থাকে, কিভাবে এইসব মামলার বিচার কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা যায় অবশ্যই এ ব্যাপারে একটু আন্তরিক হবেন এবং ব্যবস্থা নেবেন।
‘এজন্য যে কোন ধরনের সহযোগিতা করতেও সরকার প্রস্তুত রয়েছে। কিন্তু এতগুলো মামলা এভাবে পড়ে থাকুক সেটা আমরা চাই না,’যোগ করেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, স্বল্প সময়ে ও স্বল্প খরচে ভোগান্তি মুক্ত বিচার প্রাপ্তি মানুষের অধিকার। তাহলে বিচার বিভাগের ওপর মানুষের যে আস্তা ও বিশ^াস রয়েছে তা আরো বৃদ্ধি পাবে।
আইন মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এবং প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন। আইন সচিব গোলাম সারোয়ার অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ যেন ন্যায় বিচার পায়, বাংলাদেশের মানুষ যেন ভাল থাকে,স্বস্তিতে থাকে, শান্তিতে থাকে, নিরাপদে থাকে এবং উন্নত জীবন পায়। আর এভাবেই যেন আমরা জাতির পিতার স্বপ্নের উন্নত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে পারি, সে লক্ষ্য নিয়েই সরকার কাজ করে যাচ্ছে।’
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে আইন সচিব গোলাম সারোয়ার মূল অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত থেকে ভবনের ফলক উন্মোচন করেন। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকা জেলার নবনির্মিত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ভবনের একটি রেপ্লিকাও উপহার দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘আইনের দৃষ্টিতে সকলেই সমান এবং সকলেই আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ আবার ১৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবে।’
কিন্তু তিনি এবং তাঁর বোন (শেখ রেহনা) জাতির পিতার হত্যান্ডের বিচার চাইতে পারেননি ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করে জিয়াউর রহমান সে বিচারের পথ রুদ্ধ করে দেন, বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার মাধ্যমে এদেশের মানুষের মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠা করা হয় বিচারহীনতার সংস্কৃতি। আমরা এ জঘন্য হত্যাকা-ের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করেছি।
তাঁর সরকারের সময়ে চাঞ্চল্যকর ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা, বিডিআর বিদ্রোহ ও হত্যাকান্ডের বিচার, নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত ৭ খুনের মামলা এবং হলি আর্টিজেন হত্যাকান্ডের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলাসহ সকল চাঞ্চল্যকর মামলার বিচার সম্পন্ন করা উল্লেখ করে এজন্য সংশ্লিষ্ট সকল বিচারকগণকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।
আওয়ামী লীগ সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারবদ্ধ উল্লেখ কওে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এ লক্ষ্যে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার জন্য সমতার ভিত্তিতে সুবিচার নিশ্চিত করা এবং বিচার ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন করে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আমাদের সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ ও এজলাস সংকট নিরসনের পাশাপাশি মামলা ব্যবস্থাপনার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। ২০১০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ১১ বছরে অধঃস্তন আদালতে ১১২৬ জন বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া, দরিদ্র-অসহায় ও সুবিধা বঞ্চিত মানুষদের সরকারিভাবে আইনি সহায়তা প্রদান করার লক্ষ্যে দেশের ৬৪টি জেলা সদরে এবং সুপ্রীম কোর্টে লিগ্যাল এইড অফিস স্থাপন করা হয়েছে, বলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০০৯ থেকে জুলাই ২০২০ পর্যন্ত জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার মাধ্যমে সর্বমোট ৫ লক্ষ ২৫ হাজার ৩০ জনকে বিনামূল্যে আইনি সেবা প্রদান করা হয়েছে।’
বাংলাদেশে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠায় আওয়ামী লীগ সরকার সব সময়ই আন্তরিক উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, তাঁর সরকার ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর পরই ‘দি কোড অব ক্রিমিন্যাল প্রসিডিউর (সংশোধন) আইন, ২০০৯’ পাশের মাধ্যমে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের কাজটিকে স্থায়ী রূপ দিয়েছে।
অধঃস্তন আদালতের বিচারকদের জন্য পৃথক বেতন স্কেল বাস্তবায়ন, বিচারকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির পাশাপাশি জুডিশিয়াল ভাতা প্রদানসহ বিচার বিভাগের বিভিন্ন উন্নয়নের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৪২টি জেলায় চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জন্য ৮-১০ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ২৯টি জেলায় নবনির্মিত আদালত ভবন উদ্বোধন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এসব ভবনে স্থাপিত আদালতে এখন উন্নত পরিবেশে বিচারিক কাজ চলছে। অবশিষ্ট জেলাগুলোতেও চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।’
শেখ হাসিনা বলেন, আজ ঢাকা চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ভবনের উদ্বোধন করা হলো। আমার প্রত্যাশা, এ ভবন নির্মাণের মধ্য দিয়ে জনগণের বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ভোগান্তি অনেকাংশে কমবে।
সন্ত্রাস বিরোধী মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ৭টি সন্ত্রাস বিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল স্থাপন, ৭টি বিভাগীয় শহরে সাইবার ট্রাইবুন্যাল স্থাপন, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ২০১৮ সালে ৪১টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল স্থাপনের পর ২০২০ সালে আরও ৬টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া ৭টি মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করা হয়েছে উল্লেখ করেন তিনি।
সরকার প্রধান আরো বলেন, ধর্ষণের মামলায় ধর্ষকদের কঠোর শাস্তি প্রদানের জন্য মৃত্যুদ-ের বিধান রেখে তাঁর সরকার ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২০’ প্রণয়ন করেছে এবং মাদক সংক্রান্ত মামলাগুলোর দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ প্রণয়ন করেছে।
তিনি বিচারপতি এবং আইনজীবীদের কল্যাণ কামনা করে তারা যেভাবে মানুষের পাশে রয়েছেন সেভাবেই তাদেরকে মানুষের পাশে থাকার আহ্বান জানান ।
তাঁর সরকার দারিদ্রের হার ৪০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছে এবং শিক্ষার হার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের অর্থনৈতিক কার্যক্রম, সামাজিক খাতে নিরাপত্তা বিধান এবং দেশের মানুষের জীবন যাত্রার মানোন্নয়ে যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ন্যায়বিচার প্রদান অব্যাহত রাখতে ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনার জন্য ‘আদালত কর্তৃক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার, আইন ২০২০’ প্রণয়ন করা হয়েছে। কেরানীগঞ্জের কারাগারে এ ধরনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দাগী আসামীদের বিচারের ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে দেশের সব কারাগারেই ভার্চুয়াল কোর্টের ব্যবস্থা রাখতে সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে।
করোনাভাইরাসে সাবেক এটর্নী জেনারেল মাহবুবে আলমসহ দেশ বিদেশে যারা মারা গেছেন তাদের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
যতদিন পর্যন্ত এর ভ্যাকসিন না আবিস্কার হবে বা সহজলভ্য হবে সে পর্যন্ত এর সুরক্ষা অত্যন্ত কঠিন আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী সকলকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং বাইরে বের হলে বা কর্মক্ষেত্রে গেলে মাস্ক ব্যবহারের আহ্বান পুণর্ব্যক্ত করেন এবং বলেন, ‘এই করোনাভাইরাস থেকে নিজেকে এবং অপরকে সুরক্ষিত রাখতে হবে।’বাসস।
দুদকের তলব: ডিএজি ফেরদৌসী রূপা করোনায় আক্রান্ত, সময় চাইতে বলেছে হাই কোর্ট
অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে জিজ্ঞাসাবাদে হাজির হওয়ার জন্য ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জান্নাতুল ফেরদৌসী রূপাকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে সময় চাইতে বলেছে হাই কোর্ট।
দুদকের পাঠানো নোটিস চ্যালেঞ্জ করে রূপার রিটের শুনানি ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত মুলতবি রেখে আদালত বলেছে, তিনি দুদকের কাছে ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় চাইতে পারবেন।
বিচারপতি মো. মঈনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের হাই কোর্ট বেঞ্চ মঙ্গলবার এ আদেশ দেয়। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
আদালতে রিটবারী রূপার পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, জেডআই খান পান্না ও সালাহউদ্দিন দোলন। দুদকের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান।
আইনজীবী জেড আই খান বলেন, “আদালত রিট মামলাটির শুনানি ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত মুলতবি রেখেছেন। আর যেহেতু উনি (জান্নাতুল ফেরদৌসী রূপা) এবং উনার পুরো পরিবার কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত, তাই স্বাভাবিকভাবেই তিনি হাজির হতে পারবেন না। তাই উনাকে ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় চেয়ে দুদকে আবেদন করতে বলেছেন।”
দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, ৩ ডিসেম্বর আবার শুনানির জন্য হাই কোর্টে আসবে রিট আবেদনটি।
“কাল যদি জান্নাতুল ফেরদৌসী রূপা দুদকে যান, তাহলে তিনি আবেদন করে ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় নেবেন। যদি না যান, তাহলে উনার পক্ষ থেকে কেউ আবেদন করবেন, উনি যেহেতু অসুস্থ।”
‘অবৈধ সম্পদ’ অর্জনের অভিযোগে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গত বুধবার দুর্নীতি দমন কমিশন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জান্নাতুল ফেরদৌসী রূপাকে ওই নোটিস পাঠায়। বুধবার সকাল ১০টায় তাকে সেগুনবাগিচায় কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে উপস্থিত থাকতে বলা হয় সেখানে।
নোটিসে বলা হয়, রাষ্ট্রের এই আইন কর্মকর্তা ‘বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও জালিয়াতির মাধ্যমে ঘুষ গ্রহন করে জি কে শামীমসহ বিভিন্ন আসামির সাথে আঁতাত করে জামিন করিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়াসহ জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন’ বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরপর ওই নোটিসের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাই কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিট আবেদন করেন রূপা। ওই নোটিসের কার্যক্রম স্থগিত চাওয়ার পাশাপাশি রুল জারির আর্জি জানানো হয় সেখানে।
‘হয়রানি করার জন্য অসৎ উদ্দেশ্যে বিধি বিহির্ভূতভাবে জারি করা ওই নোটিস কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না’- তা জানতে রুল চেয়েছেন রূপা।
তার আবেদনে স্বরাষ্ট্র সচিব, দুর্নীতি দমন কমিশেনর চেয়ারম্যান, দুদকের মহাপরিচালক (বিশেষ অনুসন্ধান এবং তদন্ত-২) এবং উপরিচালক (বিশেষ অনুসন্ধান এবং তদন্ত-২) কে বিবাদী করা হয়।
রিট আবেদনটি সোমবার বিচারপতি মো.নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের হাই কোর্ট বেঞ্চে আবেদনটি শুনানির জন্য উঠলেও তা কার্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
এরপর মঙ্গলবার সেটি বিচারপতি মো. মঈনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের হাই কোর্ট বেঞ্চে উপস্থাপন করা হলে আদালত ডিএজি রূপাকে দুদকে সময় চেয়ে আবেদন করতে বললো।
রূপার আইনজীবী পান্না বলেন, “কোনো ডিএজি, এএজি কাউকে জামিন দিতে পারেন না। দুদকের নোটিসে যেহেতু জামিনের কথা বলা হয়েছে, তাই ধরে নিতে হবে এখানে আদালতও জড়িত। এটা তো আদালত অবমাননার শামিল।”
তিনি বলেন, রিট আবেদনকারী ইতোমধ্যে প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন করে এ বিষয়ে তদন্ত চেয়েছেন। অ্যাটর্নি জেনারেলকেও এর অনুলিপি দেওয়া হয়েছে।
বৈবাহিক ধর্ষণ: আইন সংশোধন প্রশ্নে হাই কোর্টের রুল জারি
সংবিধান স্বীকৃত সমতা, আইন, অধিকার ও ব্যক্তি স্বাধীনতাকে লঙ্ঘন করে নারী ও ১৩ বছরের বেশি বয়সী মেয়েদের ‘বৈবাহিক ধর্ষণ’ অনুমোদন দেওয়ার আইনি বিধান বাতিলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সরকারকে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, জানতে চেয়েছে হাই কোর্ট।
বৈবাহিক ধর্ষণ সংক্রান্ত চারটি মানবাধিকার সংস্থার করা একটি রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি মো. মুজিবর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মহি উদ্দিন শামীমের ভার্চুয়াল হাই কোর্ট বেঞ্চ মঙ্গলবার এ রুল জারি করে।
আইন সচিব, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ও স্বারাষ্ট্র সচিবকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), ব্র্যাক, নারীপক্ষ ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন গত রোববার এ রিট আবেদনটি করে।
রিটে দণ্ডবিধির ৩৭৫, ৩৭৬ ধারা ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর ৯(১) ধারা চ্যালেঞ্জ করা হয়। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
রিট আবেদনকারী পক্ষে শুনানি করেন জেড আই খান পান্না, সারা হোসেন, জেনিফা জব্বার ও শারমিন আক্তার। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নওরোজ মো. রাসেল চৌধুরী।
শারমিন আক্তার বলেন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২৭ শতাংশ নারী বিবাহিত জীবনে ধর্ষণের শিকার হন।
দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারা অনুযায়ী, বিবাহিত একটি মেয়ের বয়স যদি ১৩ বছরের নিচে না হয় এবং তার স্বামী যদি জোরপূর্বক যৌনসঙ্গম করে তাহলে সেটা ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে না।
দণ্ডবিধির ৩৭৬ ধারা অনুযায়ী, যদি বিবাহিত নারী বা মেয়ের বয়স ১২ বছরের নিচে না হয় তাহলে ধর্ষণের শাস্তি হবে না। আবার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(১) ধারার ব্যাখ্যায় বৈবাহিক ধর্ষণকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
শারমিন বলেন, “বৈবাহিক ধর্ষণ সংক্রান্ত এই ব্যতিক্রমগুলো আমাদের সংবিধানের ২৭, ২৮ এবং ৩১ অনুচ্ছেদেরে সম্পূর্ণ পরিপন্থি। কারণ এই ধারাগুলোতে বিবাহিত নারী এবং অবিবাহিত নারীর মধ্যে বৈষম্য করা হয়েছে। স্বামী কর্তৃক ধর্ষণের বিচার প্রাপ্তির অধিকারকে ক্ষুন্ন করা হয়েছে। তাই এই ধারাগুলো সংশোধন করা প্রয়োজন। কোর্ট এই মর্মেই রূল জারি করেছেন।”
টাঙ্গাইলের এক বিবাহিত কিশোরীর মৃত্যুর ঘটনায় এ রিট আবেদন করা হয়।
গত ২৫ অক্টোবর টাঙ্গাইলে ১৪ বছরের ওই কিশোরী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ডিএমসিএইচ) ভর্তি হওয়ার পরে যৌনাঙ্গে মাত্রাতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে মারা যায়।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ফেরত ৩৪ থেকে ৩৫ বৎসর বয়সী এক ব্যক্তির সঙ্গে গত ২০ সেপ্টেম্বর বিয়ে হয়েছিল মেয়েটির।
বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিয়ের প্রথম রাত থেকেই ওই কিশোরীর যৌনাঙ্গে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল।










