আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, বিচার বিভাগের উন্নয়ন হলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সুদৃঢ় হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রের চার মূলনীতি সুপ্রতিষ্ঠিত হবে, রাষ্ট্রের প্রধান তিনটি অঙ্গ সঠিকভাবে কাজ করতে পারবে, গণতন্ত্রের সঠিক চর্চা হবে। অবকাঠামো নির্মাণ করাই বিচার বিভাগের শেষ দায়িত্ব নয় উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত ন্যায়বিচার জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া না যাবে ততক্ষণ পর্যন্ত আসল সম্মান কিন্তু আমরা পাবো না। তাই জনগণের কাছ থেকে আসল সম্মান পাওয়ার জন্য বিচার বিভাগের সকলকে একনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে।
পটুয়াখালীতে ২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত চার তলা বিশিষ্ট চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বৃহস্পতিবার ভিডিও কনফারেন্সিং এর মাধ্যমে প্রধান অতিথি হিসেবে যুক্ত হয়ে এসব কথা বলেন আইনমন্ত্রী।
আইনমন্ত্রী বলেন,আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা-যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হবে- এই সাংবিধানিক অঙ্গীকারের আলোকে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। কারণ আইনের শাসনের মধ্যেই নিহিত রয়েছে আইনের প্রয়োগ ও কার্যকারিতা। যে সমাজে আইনের শাসন নেই, সেখানে আইনের মর্যাদা লুণ্ঠিত। আইন মানুষকে যেমন নিয়ন্ত্রণ করে, তেমনই মর্যাদাবান ও পরিশীলিত করে। আইন যেখানে অচল, মানবাধিকার সেখানে ভূলুণ্ঠিত। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মধ্যেই নিহিত রয়েছে সমাজ-সভ্যতার ক্রমবিকাশ।
তিনি বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার সাথে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সাথে বিচার বিভাগের মানোন্নয়ন জড়িত। সেজন্য মানসম্পন্ন বিচার ব্যবস্থা নিশ্চিত করে দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, ২০০৭ সালের ১লা নভেম্বর নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের পৃথক হলে আদালতগুলোতে বিশেষ করে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এজলাসের অপ্রতুলতা দেখা দেয়। ফলে বিচারকগণ এজলাস ভাগাভাগি করে বিচারিক কাজ চালাতে থাকেন। কিন্তু তাতে করে বিচারক, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থী জনগণ যেমন ভোগান্তির শিকার হতে থাকেন, তেমনি মামলার জট দিনের পর দিন বাড়তে থাকে। এমন অবস্থায় ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার গঠন করলে তিনি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং পৃথকীকরণকে সুদৃঢ়, দীর্ঘস্থায়ী এবং টেকসই করার জন্য বাস্তবমূখী বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন। প্রথমেই এজলাজ ভাগাভাগি সমস্যা দূরীকরণ এবং ভবিষ্যত প্রয়োজন মেটানোর জন্য আদালত ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করা হয় এবং বলা যায় আজ তা অনেক দূর এগিয়ে গেছে। যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পটুয়াখালী চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন।
ভবনটি ১২ তলা ভিত্তির ওপর নির্মিত হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, আজ চার তলা ভবন উদ্বোধনের ফলে বিচারক, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থী জনগণের দুর্ভোগ অনেকটাই লাঘব হবে। তিনি জানান, এটাকে আট তলা করা হবে এবং আগামী বছরই অবশিষ্ট ৪ তলার নির্মাণ কাজ শুরু হবে। তখন দুর্ভোগ পুরোপুরি কেটে যাবে। মন্ত্রী বলেন, এই আদালত ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্য তখনই সফল হবে যখন বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলেই স্ব-স্ব দায়িত্ব আন্তরিকভাবে পালন করে দ্রুত ন্যায়বিচার প্রদানে সহায়ক ভূমিকা পালন করবেন।
পটুয়াখালীর জেলা ও দায়রা জজ রোখসানা পারভীন এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে পটুয়াখালী জেলার বিভিন্ন আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মো. শাহজাহান মিয়া, আ.স.ম ফিরোজ, এস এম শাহজাদা ও মো. মহিববুর রহমান, জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের সদস্য কাজী কানিজ সুলতানা, আইন ও বিচার বিভাগের সচিব মো. গোলাম সারওয়ার, জেলা প্রশাসক মো. মতিউল ইসলাম চৌধুরী, চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. জামাল হোসেন, পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ মইনুল হাসান বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন আইন ও বিচার বিভাগের যুগ্ম সচিব বিকাশ কুমার সাহা।
অবকাঠামো নির্মাণ করাই বিচার বিভাগের শেষ দায়িত্ব নয়,ন্যায় বিচার জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে হবে- আইনমন্ত্রী
ফরিদপুরের সাংসদ নিক্সন চৌধুরীর বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের মামলা
ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবর রহমান চৌধুরী নিক্সনের বিরুদ্ধে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন, দায়িত্বরত কর্মকর্তাকে গালি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগে মামলা করেছে নির্বাচন কমিশন৷
চরভদ্রাসন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে উপনির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলার জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কর্মকর্তা নওয়াবুল ইসলাম বৃহস্পতিবার সকালে চরভদ্রাসন থানায় এ মামলা করেন৷ খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
ইসির নির্দেশনায় তিনি বাদী হয়ে এ মামলা করেছেন৷
ওই উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে জেলা প্রশাসক ও নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাদের হুমকি-ধামকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠায় গত কয়েক দিন ধরেই আলোচনা চলছে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া নিক্সন চৌধুরীকে নিয়ে৷
তবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে গালি ও হুমকি দেওয়ার অডিও ফেসবুকে ভাইরাল হলেও তা ‘সুপার এডিটেড’ বলে দাবি করেছেন মুজিবর রহমান চৌধুরী নিক্সন৷
ভোটের দিন সকালে বুথে ঢুকে ভেতরে সিগারেট খাওয়া ও জাল ভোট দেওয়ার চেষ্টা করায় নিক্সন চৌধুরীর এক অনুসারীকে আটক করেছিলেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে আসা ভাঙ্গা উপজেলার একজন সহকারী কমিশনার (এসি ল্যান্ড)৷
এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সাংসদ নিক্সন চৌধুরী তাকে ফোন করেন বলে জানান ইউএনও জেসমিন সুলতানা৷ ওই অডিওতে তাকে উদ্দেশ্য করে নিক্সন চৌধুরীকে বলতে শোনা যায়, ‘‘শুয়রের বাচ্চা, কুত্তার বাচ্চা…. আমার লোকদের গাড়িতে উঠায়ছে ক্যান; এখনই ছাড়তে বলেন৷ ওর কত বড় সাহস শুয়ারের বাচ্চা, আমি চরভদ্রাসন আসতেছি, ওরে আমি দেখতেছি৷”
সাংসদের এই ফোনের পর আটক ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়া হয় জানিয়ে ইউএনও বলেন, পাঁচ মিনিটের মধ্যে আটক ব্যক্তিকে না ছাড়লে লোকজন নিয়ে উপজেলা ঘেরাও করার হুমকি দিয়েছিলেন নিক্সন চৌধুরী৷
তবে এই অডিও তিনি সোশাল মিডিয়ায় দেননি জানিয়ে এই সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ‘‘নির্বাচনের দিন দায়িত্বরত সব কর্মকর্তার ফোন নজরদারিতে থাকে৷”
এই ঘটনার পর স্থানীয় আওয়ামী লীগ যেমন তার বিচার দাবি করেছে, তেমনি বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনও এই সাংসদকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে৷
করোনা ভাইরাসের টিকা পরীক্ষায় টাকা চায় চীনা কোম্পানি, না করে দিয়েছে সরকার
করোনা ভাইরাসের টিকা পরীক্ষায় টাকা চায় চীনের সিনোভ্যাক বায়োটেক কোম্পানি। কিন্তু সরকার এই টাকা দিতে রাজি নয়। ফলে চীনা টিকা বাংলাদেশে পরীক্ষার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। টিকা পরীক্ষার জন্য চীনের এই বেসরকারী প্রতিষ্ঠানটি সরকারের কাছে সহ- অর্থায়ন চাইলে তা না করে দেওয়া হয়েছে। বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে এমন কথাই জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। বলেছেন টিকা পরীক্ষার জন্য চীনের বেসরকারী এই প্রতিষ্ঠানটিকে অর্থায়ন করবে না সরকার।
সিনোভ্যাক সরকারকে বাংলাদেশে টিকার পরীক্ষার জন্য অর্থায়নের অনুরোধ করার কয়েক সপ্তাহ পরেই তিনি এই মন্তব্য করেন। সূত্রের মতে এই পরীক্ষায় প্রায় সাত মিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে।
সিনোভ্যাক এক চিঠিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে যে, বাংলাদেশে অনুমোদন পেতে দেরী হওয়ার ফলে অন্যান্য দেশে টিকার পরীক্ষায় অর্থ বরাদ্দ হয়েছে।
জাহিদ মালেক বলেন, “আমরা এই মামলায় সহ-অর্থায়ন করছি না। এটি চুক্তিতে ছিল না। তারা যখন আমাদের কাছে এসেছিল তখন টাকা চায়নি।”
“চুক্তি অনুসারে, তারা পরীক্ষার সমস্ত ব্যয় বহন করবে, আমাদের ১,১০,০০০ বিনামূল্যে টিকা দেবে এবং তারা উৎপাদনের প্রযুক্তিটি আমাদের সাথে ভাগ করে নেবে যাতে আমাদের ফার্মাসিউটিক্যাল সংস্থাগুলি টিকা তৈরি করতে পারে, এমনটাই কথা ছিল।”
সিনোভ্যাক, যা গত মাসে তুরস্কে “করোনাভ্যাক” নামক টিকার তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা শুরু করেছে, তাৎক্ষণিকভাবে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
সরকারকে সেপ্টেম্বরে পাঠানো চিঠিতে সিনোভ্যাক আরও বলেছে যে, তারা দাতব্য সংস্থা কোয়ালিশন ফর এপিডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস ইনোভেশনস (সিইপিআই) এর কাছ থেকে টিকার পরীক্ষার জন্য অর্থ বরাদ্দ চেয়েছিল – কিন্তু এই প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
“আমরা অক্টোবরের শেষ বা নভেম্বরের শুরুতে তহবিলের পরিস্থিতি আংশিকভাবে সংশোধন করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছি,” চিঠিতে সিনোভ্যাক জানিয়েছে। তবে এটাও উল্লেখ করেছে যে, বাংলাদেশে পরীক্ষা শেষ করতে এখনও তাদের অর্থায়নের প্রয়োজন হবে।
সরকারের রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা গবেষণা সংস্থা জুলাইয়ে তৃতীয় ধাপের পরীক্ষার জন্য সম্মতি দেয় এবং একমাস পরে সরকারের অনুমোদন আসে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সিনোভ্যাক এখনও তাদের নিজস্ব অর্থায়নে টিকার পরীক্ষা করতে পারে।
“তারা পরীক্ষা করতে পারে। তবে আমরা একটি বেসরকারী সংস্থার সাথে অর্থায়নের মাধ্যমে টিকার পরীক্ষা করতে পারি না। সহ-অর্থায়নের জন্য আমাদের সরকারের সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে হবে।”
মন্ত্রী বলেন, সরকার অ্যাস্ট্রাজেনেকাসহ কমপক্ষে পাঁচটি অগ্রণী সংস্থার সাথে টিকা নিয়ে আলোচনা করছে।
“আমরা আমাদের জনগণের জন্য সেরা টিকা প্রাপ্তি নিশ্চিত করব। আমরা এর জন্য অর্থ বরাদ্দ করেছি এবং আমাদের উন্নয়ন সহযোগীরাও আমাদের অর্থ সহায়তা দিতে আগ্রহী,” জাহিদ মালেক বলেন।
ভুয়া পরোয়ানায় গ্রেপ্তার ঠেকাতে হাইকোর্টের যুগান্তকারী নির্দেশনা, বন্ধ হবে পুলিশের হয়রানি
ভুয়া পরোয়ানায় গ্রেপ্তার ঠেকাতে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসরণ করে সঠিক ও সুস্পষ্টভাবে পরোয়ানা জারি ও কার্যকর করার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রতি সাত দফা নির্দেশনা দিয়েছে হাই কোর্ট।
এক রিট আবেদনে রুলের শুনানির সময় বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের বেঞ্চ বুধবার এসব নির্দেশনা দেন।
রিট আবেদনকারীর আইনজীবী এমাদুল হক বসির জানান, এখতিয়ার পরিবর্তন হওয়ায় নির্দেশনা দিয়ে রুলটি রিট এখতিয়ারাধীন বেঞ্চে উপস্থাপন করে শুনানি করতে বলেছেন আদালত। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
হাই কোর্টের ৭ দফা নির্দেশনা –
১. গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রস্তুতকারী ব্যক্তিকে ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৭৫ এর বিধান অনুয়ায়ী নির্ধারিত ফরম সঠিক ও সুস্পষ্টভাবে পূরণ করতে হবে-
১.১ যে ব্যক্তি বা যে সকল ব্যক্তি পরোয়ানা কার্যকর করবেন, তার বা তাদের নাম, পদবী ও ঠিকানা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
১.২ যার প্রতি পরোয়ানা জারি করা হচ্ছে তার নাম ও ঠিকানা মামলার নম্বর ও সুনির্দিষ্ট ধারাসহ সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
১.৩ সংশ্লিষ্ট জজ বা ম্যাজিস্ট্রেটের স্বাক্ষরের নিচে নাম ও পদবীর সিলসহ সংশ্লিষ্ট আদালতের সুস্পষ্ট সিল ব্যবহার করতে হবে।
১.৪ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রস্তুতকারী ব্যক্তির (অফিস স্টাফ) নাম, পদবী ও মোবাইল নম্বরসহ সিল ও তার সংক্ষিপ্ত স্বাক্ষর ব্যবহার করতে হবে; যাতে পরোয়ানা কার্যকরকারী ব্যক্তি পরোয়ানার সঠিকতা সম্পর্কে কোনো সন্দেহের উদ্বেগ হলে পরোয়ানা প্রস্তুতকারীর সঙ্ড়ে সরাসরি যোগাযোগ করে নিশ্চিত হতে পারেন।
২. গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রস্তুত হলে স্থানীয় অধিক্ষেত্র কার্যকর করার জন্য সংশ্লিষ্ট পিয়ন বহিতে তা এন্ট্রি করে বার্তাবাহকের মাধ্যমে পুলিশ সুপারের কার্যালয় কিংবা সংশ্লিষ্ট থানায় পাঠাতে হবে।
পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের বা থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা পিয়ন বহিতে স্বাক্ষর করে তা বুঝে নিতে হবে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রেরণ ও কার্যকর করার জন্য পর্যায়ক্রমে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার কাজে লাগানো যেতে পারে।
৩. স্থানীয় অধিক্ষেত্রের বাইরের জেলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করার ক্ষেত্রে পরোয়ানা জারি করা কর্তৃপক্ষ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা সিলগালা করে এবং অফিসের সিলমোহরের ছাপ দিয়ে সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে পাঠাতে হবে।
৪. সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকতা সিলমোহরের ছাপ দেওয়া খাম খুলে প্রাপ্ত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন।
তবে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ক্ষেত্রে সন্দেহ হলে পরোয়ানা প্রস্তুতকারীর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেবেন।
৫. গ্রেপ্তারি পরোয়ানা গ্রহণকারী কর্মকর্তা পরোয়ানা কার্যকর করার আগে পুনরায় পরীক্ষা করে যদি সন্দেহ পোষণ করেন, তবে পরোয়ানা প্রস্তুতকারীর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হয়ে পরোয়ানা কার্যকর করবেন।
৬. গ্রেপ্তারি পরোয়ানা অনুযায়ী আসামি বা আসামিদের গ্রেপ্তারের পর সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিকটস্থ আদালতে পরোয়ানাসহ হাজির করতে হবে।
এবং ম্যাজিস্ট্রেট বা জজ গ্রেপ্তার করা আসামি বা আসামিদের জামিন না দিলে আদেশের অনুলিপিসহ জেল হাজতে পাঠাতে হবে। প্রয়োজনে সম্পূরক নথি তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা আদালতে পাঠাতে হবে।
৭. সংশ্লিষ্ট আসামি বা আসামিদের কোন থানার কোন মামলায়, কোন আদালতের আদেশে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে তা সংশ্লিষ্ট জেল সুপার কিংবা অন্য কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারিকারী আদালতকে জানাবেন। পরবর্তীতে আর কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পেলে তা নিশ্চিত হয়ে কার্যকর করবেন জেল সুপার।
আদেশ বাস্তবায়নের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব, সুরক্ষা ও সেবা বিভাগের সচিব, আইন সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, মহা-কারা পরিদর্শক ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে বলা হয়েছে।
সেই সাথে আদেশটি প্রত্যেক দায়রা জজ ও মহানগর দায়রা জজসহ দেশের সব ট্রাইব্যুনাল, বিশেষ জজ আদালতের বিচারক, মুখ্য বিচারিক হাকিম ও মুখ্য মহানগর হাকিমকে জানাতে বলা হয়েছে।
কোনো থানায় কোনো মামলা না থাকলেও গত বছর ৩০ অক্টোবর ভুয়া পরোয়ানায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন আশুলিয়ার মির্জা নগর এলাকার টাকসুর গ্রামের নূর মোহাম্মদের ছেলে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কৃষি বিভাগের প্রোগ্রাম অফিসার মো. আওলাদ হোসেন।
প্রথমে কক্সবাজারের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের নামে ভুয়া পরোয়ানায় আওলাদকে আশুলিয়া থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর একের এক একই মামলার ভুয়া পরোয়ানায় রাজশাহী, বাগেরহাটের আদালত, কারাগার হয়ে এখন শেরপুর কারাগারে তিনি। কিন্তু কোনো আদালতেই মামলার কোনো নথি পাওয়া যায়নি।
এর ফলে তাকে যে বেআইনিভাবে আটক রাখা হয়নি, তা নিশ্চিত হতেই আওলাদের স্ত্রী শাহনাজ পারভীন গত বছর ৯ ডিসেম্বর রিট আবেদন করেন।
পরদিন সে রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে আদালত রুলসহ আদেশ দেয়। ১৫ জানুয়ারি হাই কোর্টে আওলাদকে হাজির হতে বা হাজির করতে নির্দেশ দেয় হাই কোর্ট।
একই সঙ্গে তাকে ভুয়া পরোয়ানায় জড়ানোর ঘটনায় জড়িতদের খুঁজে বের করতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দেওয়া হয়।
এছাড়া তার বিরুদ্ধে আর কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা না থাকলে, যাচাইসাপেক্ষে তার মুক্তির বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।
আওলাদের বিরুদ্ধে আর কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা না থাকায় চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি তাকে মুক্তি দেয় কারা কর্তৃপক্ষ।
৬ জানুয়ারি মুক্তি পেয়ে আওলাদ নির্দেশমতো ১৫ জানুয়ারি আদালতে হাজির হন। আদালত ৯ মার্চ পরবর্তী আদেশের জন্য রাখে।
এর মধ্যে সিআইডি ভুয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানার সাথে জড়িত চার জনকে গ্রেপ্তার করে। চার জনের মধ্যে তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেয়।
আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিসহ গত ৯ মার্চ ভুয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বিষয়ে সিআইডি তদন্ত প্রতিবেদন দেয় আদালতে।
এরপর বুবধার রুল শুনানির জন্য উঠলে রুল শুনানি না করে ভুয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বন্ধে ব্যবস্থা নিতে সাত দফা নির্দেশনা দেয় উচ্চ আদালত।
হঠাৎ তারকা হয়ে যাওয়া রাণু মণ্ডল আবার ফিরলেন রেল স্টেশনেই, জুটছে না দুবেলা খাবার
পশ্চিমবঙ্গের রানাঘাট স্টেশেন থেকে উঠে এসে হিমেশ রেশমিয়ার ঝাঁ চকচকে বলিউডি স্টুডিয়োতে পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি। নদিয়ার বোগোপাড়ার বাসিন্দা রানুর জীবনযুদ্ধ সাড়া জাগিয়েছিল গোটা দেশে। মুহূর্তের মধ্যে হয়ে গিয়েছিলেন সোশ্যাল মিডিয়া সেনসেশন! রাতারাতি স্টার বনে গিয়েছিলেন রানাঘাট স্টেশনের ভবঘুরে রাণু মন্ডল। তবে কয়েক মাস যেতে না যেতেই তিনি চলে গেলেন আঁধারে। ফিরে গেলেন আবার সেই রানাঘাট স্টেশনেই।

ছবি- ইন্টারনেট
ঠিক যেন বাস্তবের মাটি থেকে আকাশে, আবার আকাশ থেকে বাস্তবের মাটিতে। খোঁজ নিয়ে জানা যাচ্ছে, সেই পুরনো দিনের মতোই এখন রোজ দুবেলা পেট ভরে দুমুঠো খেতেই কালঘাম ছুটছে তাঁর। কার্যত অনাহারেই দিন কাটছে তাঁর। সেই আগের মতোই পথচলতি মানুষ যা দিতেন, সেই খেয়েই যেমন দিন কাটত তাঁর, তেমনই চলছে রাণুর আজকালকার দিন। এখনও তাঁর সম্বল হয়ে দাঁড়িয়ছে পাড়া-প্রতিবেশীদের সাহায্য।
যে সময় রাণুর উত্থান, সেই সময়ই জানা গিয়েছিল, দীর্ঘদিন আগে স্বামীর সঙ্গে কাজের সন্ধানে মুম্বই গিয়েছিলেন রাণু। অভিনেতা ফিরোজ খানের বাড়িতে তিনি কাজও করতেন। সেখানে থাকার সূত্রে হিন্দি বলা এবং শব্দ উচ্চারণে দক্ষতা অর্জন করেন। তার পর নদিয়াতে ফিরে আসার কিছুদিন পর স্বামী চলে যান। বিয়েও হয়ে যায় মেয়েদের। তবে আশার আলো ছিল, মাসি-মেসো একা হয়ে যাওয়া রানুকে নিজেদের বাড়িটি দিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু খাবার সন্ধানে রাণু রোজ হাজির হতে শুরু করেছিলেন রানাঘাট স্টেশনের পাঁচ নম্বর প্ল্যাটফর্মে। ওই প্ল্যাটফর্মে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে গিয়ে অতীন্দ্র নামে এক যুবক নিজের মোবাইল ফোনে রেকর্ড করেন রানুর কণ্ঠে লতার গান ‘এক প্যায়ার কা নাগমা হ্যায়’। সোশ্যাল মিডিয়ায় তা পোস্ট হতেই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায় সেই ভিডিও। আর ফিরে তাকাতে হয়নি এই ফুটপাথের গায়িকাকে। সোজা মুম্বই। হিমশে রেশমিয়ার নজরে পড়ে যাওয়া। গান রেকর্ড, রিয়েলিটি শো, আরও কত কী…
রানাঘাট স্টেশনে লতা মঙ্গেশকরের গান গেয়ে রাতারাতি স্টার হয়ে উঠেছিলেন রাণু মন্ডল ৷ সোশ্যাল মিডিয়ায় রাণু হয়ে উঠেছিলেন ভাইরাল।রানাঘাট স্টেশন থেকে শুরু হয়েছিল তাঁর যাত্রা৷ লতার গান গেয়ে রীতিমত তারকার সম্মান পেয়েছেন রাণু ৷হিমেশ রেশমিয়ার সঙ্গে গান গেয়ে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে পৌঁছে গিয়েছিলেন ৷

ছবি- ইন্টারনেট।
রানাঘাট স্টেশনের রাণুর জীবন পাল্টে যায় ৷ সেই সময় তিনি যা করছিলেন, যেমন জামা কাপড় পরা থেকে গান গাওয়া বা কী কথা বলছিলেন সবকিছু তখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল ৷ গত বছর সমস্ত পুজো প্যান্ডেলে তাঁর গাওয়া গান ‘তেরি মেরি কাহানি’ বাজতে শোনা যায় ৷ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়া সেনসেশন হয়ে উঠেছিলেন তিনি ৷ কিন্তু এখন কোথায় রাণু মন্ডল ?
এখন যেন আবার সবাই তাঁকে ভুলে গিয়েছে ৷ ২০১৯ সালে হিমেশ রেশমিয়ার সঙ্গে তিনটি গান রেকর্ড করেছিলেন রাণু মন্ডল ৷ তবে বর্তমানে কেউ তাঁর বিষয়ে কিছুই জানে না ৷ সূত্রের খবর অনুযায়ী, কয়েকদিনের জনপ্রিয়তার পর রাণুর জীবনে ফের যেন নেমে এসেছে অন্ধকার ৷ করোনা ভাইরাসের জেরে এমনিতেই সকলকে আর্থিক সমস্যার মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে ৷ এই মুহূর্তে লতাকন্ঠী রাণুকে মুম্বইয়ে কেউ কাজ দিচ্ছেন না ৷ এর জেরে বেশ সমস্যায় পড়তে হয়েছে তাঁকে ৷
জনপ্রিয়তার পাশাপাশি রাণুকে নিয়ে একাধিকবার বির্তকেরও সৃষ্টি হয়েছে ৷ প্রচারের আলোয় চলে এসে তিনি একাধিক সাক্ষাৎকারে বিভিন্ন অহংকারী কথাবার্তা বলেছেন। বাস্তব জীবনেও যখন লোক তাকে চিনতে পেরে তার সঙ্গে কথা বলার জন্য এগিয়ে গিয়েছে তিনি তাদের সঙ্গে অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করেছেন।
এই মুহূর্তে রানাঘাটের এই লতা কন্ঠীর অবস্থা বিশেষ ভাল নয়। পুরনো বাড়ি ছেড়ে নতুন বাড়িতে সিফট করেছিলেন রানু ৷ কিন্তু হাতে কাজ না থাকায় ফের পুরনো জায়গায় ফিরে যেতে হয়েছে রাণুকে ৷ (ভারতীয় পত্রিকা অবলম্বনে)।
ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি এখন মৃত্যুদণ্ড, রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে অধ্যাদেশে সই করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।
একের পর এক যৌন নিপীড়নের ঘটনায় দেশজুড়ে প্রতিবাদ আর বিক্ষোভের মধ্যে ‘জরুরি’ বিবেচনায় আইনটি সংশোধন করে তা অধ্যাদেশ আকারে জারি করছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে আইন সংশোধন করে অধ্যাদেশ আকারে জারির জন্য এর খসড়ার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। মঙ্গলবার রাষ্ট্রপতি তাতে সই করেন বলে তার প্রেস সচিব মো. জয়নাল আবেদীন জানান। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
সংসদ অধিবেশন না থাকায় সরকার অধ্যাদেশ আকারে আইনটি জারি করল। সংসদের পরবর্তী অধিবেশনে এই অধ্যাদেশ উপস্থাপন করতে হবে। আইনটি বলবত্ রাখতে চাইলে পরে বিল আকারে তা আনবে সরকার।
২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি এতদিন ছিল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। আর ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশুর মৃত্যু হলে বা দলবেঁধে ধর্ষণের ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। পাশাপাশি দুই ক্ষেত্রেই রয়েছে অর্থ দণ্ডের বিধান।
এ আইনে শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ডের বিধান করার পাশাপাশি দ্রুততম সময়ে বিচার ও রায় কার্যকর করার জন্য আইন সংশোধনের দাবি দীর্ঘদিন ধরেই করা হচ্ছিল বিভিন্ন সংগঠনের তরফ থেকে।
সম্প্রতি নোয়াখালীতে বিবস্ত্র করে নির্যাতন, সিলেটের এমসি কলেজে তুলে নিয়ে ধর্ষণসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যৌন নিপীড়নের ঘটনার প্রেক্ষাপটে দেশজুড়ে প্রতিবাদ-বিক্ষোভে সেই দাবি আবারও জোরালো হয়ে ওঠে।
মন্ত্রিসভায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(১) উপ-ধারা সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়। সেখানে এতদিন বলা ছিল- যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে, তাহলে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দণ্ডিত হবেন এবং অতিরিক্ত অর্ধদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
আইন সংশোধনে ‘যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড’ শব্দগুলোর পরিবর্তে ‘মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপিত হয়েছে বলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১১ এর ১ (গ) ধারায় যৌতুকের জন্য সাধারণ জখম করার ঘটনা আপসযোগ্য ছিল না। সংশোধনে সেটা আপসযোগ্য করা হয়েছে বলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছেন।
এ আইনের মামলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সাত দিন থেকে এক মাস এবং মামলা নিষ্পত্তির জন্য একশ আশি দিন (ছয় মাস) সময় বেঁধে দেওয়া থাকলেও বাস্তবে ওই সময়ের মধ্যে রায় দেওয়া সম্ভব হয় না।
তাছাড়া ধর্ষণ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের এক একটি ঘটনা কিছু দিন পর পর সারা দেশকে নাড়া দিয়ে গেলেও এসব ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও শাস্তির নজির কম।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ বছরে ধর্ষণের ঘটনায় ওয়ান–স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার থেকে মামলা হয়েছে ৪ হাজার ৫৪১টি। এর মধ্যে আসামির শাস্তি হয়েছে মাত্র ৬০টি ঘটনায়।
ধর্ষণের বেশিরভাগ মামলা বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় ধামাচাপা পড়ে যায়। তাছাড়া ঠিকমত ডাক্তারি পরীক্ষা না হওয়া, সামাজিক জড়তা, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপসহ নানা কারণে বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।
এসব কারণে শাস্তি বাড়ালেই এ ধরনের অপরাধ কমবে কি না, সেই প্রশ্নও আছে অনেকের মধ্যে।
তাদের ভাষ্য, সাক্ষ্য আইনের জটিলতা দূর করে বিচার পাওয়ার পথ সহজ করতে হবে। সেই সঙ্গে সামাজিকভাবে বিষয়টি মোকাবেলা করা জরুরি।
তবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বিশ্বাস, ধর্ষণের সাজা যাবজ্জীবন থেকে মৃত্যুদণ্ড করায় এই অপরাধ কমে আসবে।
“আপনারা জানেন বিশ্বে মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপারে অনেক বিতর্ক আছে। তারপরেও আমাদের দেশে এই ঘৃণ্য অপরাধটির যে চিত্র দেখতে পাচ্ছি, সে কারণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন এটা বাড়ানো উচিত। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপারটি সংশোধনীতে এনেছি।”
অবৈধ অস্ত্র রাখার মামালায় পাপিয়া ও তার স্বামীর ২৭ বছর কারাদণ্ড, তারা দেশের জন্য বিপজ্জনক: রায়ে পর্যবেক্ষণ
নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক শামীমা নূর পাপিয়া ও তার স্বামী মফিজুর রহমান সুমন অবৈধ অস্ত্র ও গুলি রাখার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে দুই ধারায় ২০ বছর ও সাত বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন ঢাকার ১ নম্বর বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক কেএম ইমরুল কায়েশ।
সোমবার এই রায় ঘোষণা করেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, রাজনীতিতে জড়িত থাকলেও জনগণের কল্যাণে তারা নিয়োজিত ছিলেন না, বরং দেশের জন্য তারা ‘মারাত্মক বিপজ্জনক’ ছিলেন।
বিচারক বলেন, “শামিমা নূর পাপিয়া এবং তার স্বামী মফিজুর রহমান সুমন সজ্জন রাজনীতিবিদ ছিলেন না। তাদের বাসা থেকে ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়, যার কোনো বৈধতা থাকতে পারে না। এত টাকা থাকার কোনো যুক্তিও থাকতে পারে না।
“তারা তথাকথিত রাজনীতিবিদ। নিজেদের প্রাপ্তি নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। দেশ ও জনগণের কল্যাণে তারাতো নিয়োজিত ছিলেনই না বরং দেশের জন্য তারা মারাত্মক বিপজ্জনক ছিলেন। যে কোনো অন্যায় কাজে লাগানোর জন্য তারা তাদের খাটের তোষকের তলায় একটি বিদেশি পিস্তল দুটি ম্যাগজিন, ২০ রাউন্ড গুলি রেখেছিলেন। এ অবৈধ অস্ত্র ও গুলি তাদের নিয়ন্ত্রণ, দখল ও জ্ঞানের মধ্যে ছিল।”
নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক পাপিয়া ও তার স্বামী সুমনকে গত ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সে সময় তাদের কাছ থেকে সাতটি পাসপোর্ট, দুই লাখ ১২ হাজার ২৭০ টাকা, ২৫ হাজার ৬০০ টাকার জাল নোট, ১১ হাজার ৪৮১ ডলার, শ্রীলঙ্কা ও ভারতের কিছু মুদ্রা এবং দুটি ডেবিট কার্ড জব্দ করা হয়।
অস্ত্র আইনের মামলায় সোমবার ২০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়াকে রায় ঘোষণার পর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত থেকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
পরে পাপিয়ার ফার্মগেইটের ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে সেখান থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, ২০টি গুলি, পাঁচ বোতল বিদেশি মদ, ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা এবং বিভিন্ন ব্যাংকের ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ড উদ্ধারের কথা জানায় র্যাব।
র্যাবের পক্ষ থেকে সে সময় বলা হয়, পাপিয়া গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেল ভাড়া নিয়ে ‘অসামাজিক কার্যকলাপ’ চালিয়ে যে আয় করতেন, তা দিয়ে হোটেলে বিল দিতেন কোটি টাকার উপরে।
গ্রেপ্তারের পর পাপিয়া ও তার স্বামীর বিরুদ্ধে শেরেবাংলা নগর থানায় অস্ত্র ও মাদক আইনে দুটি মামলা করে র্যাব।
এর মধ্যে অস্ত্র মামলায় গত ২৩ অগাস্ট অভিযোগ গঠন করে পাপিয়া ও তার স্বামী বিচার শুরু করে আদালত। শুনানি শুরুর আড়াই মাসের মাথায় সোমবার তার রায় হল।
রায়ে বিচারক বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনের ১৯(এ) ও ১৯ (এফ) ধারার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছে।
তবে আসামি পাপিয়া নারী হওয়ায় এ আইনের সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড তাকে দেওয়া হয়নি। তার স্বামীকে একই শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
দুই ধারার সাজা একসঙ্গে কার্যকর হবে বলে পাপিয়াকে মোট ২০ বছেরের সাজাই খাটতে হবে।
আলোচিত এই দম্পতির বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত যে চারটি মামলা হয়েছে, তার মধ্যে অস্ত্র আইনের এই মামলাতেই সবার আগে রায় এল।
দায়িত্ব নিলেন নতুন এটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন; বললেন, মামলা জট কমানোই হচ্ছে প্রধান চ্যালেঞ্জ
দেশের ১৬তম এটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এএম আমিন উদ্দিন। রোববার সকালে তিনি এ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর পর আপিল বিভাগের ভার্চুয়াল আদালতে মামলা পরিচালনায় এটর্নি জেনারেল হিসেবে শুনানিতে অংশ নেন তিনি।
বিকেলে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন এটর্নি জেনারেল আমিন উদ্দিন। এ সময় তিনি বলেছেন, মামলাজট কমানোই এখন বিচার বিভাগের সবচেয়ে ‘বড় চ্যালেঞ্জ’।
ধর্ষণের শাস্তি বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড করা হলে এ ধরনের অপরাধ কমে আসবে বলে মনে করেন রাষ্ট্রের নবনিযুক্ত প্রধান আইন কর্মকর্তা।
সাম্প্রতিক ধর্ষণ ও নিপীড়নের ঘটনাগুলোর বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, “সরকার কিন্তু আগামীকালই (সোমবার) বিষয়টা কেবিনেট মিটিংয়ে তুলবে। শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করে দেওয়া হচ্ছে। আমার মনে হয়, যারা এ ধরনের অপরাধ করে, শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার পরে তারা সাবধান হবে।
“এ অপরাধ করতে তখন অনেকবার ভাববে। আমার মনে হয় সরকারের এই উদ্যোগটা যখন আইনে পরিণত হবে, তখন কিন্তু এটা অনেকখানি কমে যাবে।”
আমিন উদ্দিন বলেন, “আমি তো আজকে কেবল বসলাম। আমি উনাদের (ডেপুটি ও সহকারী এটর্নি জেনারেলদের) সাথে বসব বিকালে। বসে আমি দেখব কোন কোন মামলা (নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা) পেন্ডিং আছে।
“সেখান থেকে কিছু মামলা হয়ত রিভিশনের কারণে বন্ধ হয়ে আছে। সেগুলো খুঁজে বের করে সচল করার চেষ্টা করব। আর যেগুলো আপিলে আছে, সেগুলো শুনানি করে নিষ্পত্তির চেষ্টা করব।”
রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে বিচার বিভাগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি কী মনে করছেন- এই প্রশ্নে আমিন উদ্দিন বলেন, “সব চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মামলা জট কমানো। আমাদের দেশে অনেক মামলা রয়ে গেছে, অনেক মামলা জট হয়ে আছে। এই জট কমানো হচ্ছে বিচার বিভাগে আমার প্রধান চ্যালেঞ্জ।”
তিনি বলেন, আপিল বিভাগের ভার্চুয়াল কোর্ট প্রায় চার হাজার মামলার নিস্পাত্তি করে দিয়েছে। পুরনো মামলাগুলো সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শোনা হচ্ছে।
“এটর্নি জেনারেল হিসেবে এবং আইনজীবী সমিতির সভাপতি হিসেবে আমি মাননীয় প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ করব, হাই কোর্টেও যেসব পুরনো মামলা রয়েছে, সেগুলো নিষ্পত্তি করার জন্য বেঞ্চগুলোকে যেন বিশেষ নির্দেশনা দেন।
“তাছাড়া আমি চেষ্টা করব, বিভিন্ন জেলায় যারা পাবলিক প্রসিকিউটর আছেন, তাদের সাথে যোগাযোগ করতে। বিচারাধীন যেসব মামলা স্থগিত হয়ে আছে, সেগুলোর দ্রুত শুনানির উদ্যোগ নিতে।”
২০০৯ সাল থেকে এটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করে আসা মাহবুবে আলম ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
এরপর গত ৮ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এএম আমিন উদ্দিনকে দেশের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার।
আমিন উদ্দিন তিন দশক ধরে সর্বোচ্চ আদালতে আইনজীবী হিসেবে কাজ করে আসছেন। এক সময় ডেপুটি এটর্নি জেনারেলের দায়িত্বও পালন করেছিলেন তিনি।
প্রয়াত এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমেকে স্মরণ করে আমিন উদ্দিন বলেন, “দক্ষতা ও সততায় মাহবুবে আলম এই অফিসটাকে, এই পদটাকে যে উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, আমি চেষ্টা করব সেটা বজায় রাখার জন্য। আমি চেষ্টা করব তিনি যে উচ্চতা সৃষ্টি করে গেছেন, সেটা নিম্নগামী হতে না দিতে।”
দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সাংবাদিক ও সংবাদ মাধ্যমের সহযোগিতাও চান এটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন।
“অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে আমি আপনাদের সহযোগিতা চাই। আমি আপনাদের অনুরোধ করছি, আপনারা যদি আমাদের সহযোগিতা করেন, তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেন, তাহলে দুর্নীতি বন্ধ করা অনেক সহজ হবে। আমি এটর্নি জেনারেল হিসেবে এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি হিসেবে যে কোনো ধরনের দুর্নীতিকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করব।”
আমিন উদ্দিন এটর্নি জেনারেল হিসেবে যোগ দেওয়ার দিনই অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা ও মো. মোমতাজ উদ্দিন ফকিরের পদত্যাগের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন করেন সাংবাদিকরা।
জবাবে এটর্নি জেনারেল বলেন, “এই অফিসে সবসময় আসা-যাওয়া থাকেই। উনারা হয়ত অনেক দিন কাজ করেছেন, ব্যক্তিগত কোনো সমস্যার কারণে উনারা হয়ত আর থাকছেন না। আমার সাথে উনাদের কথা হয়নি।
“এখন সরকার যদি তাদের পদত্যাপত্র গ্রহণ করেন, তাহলে সরকার অবশ্যই আরও দুজন অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল দিবেন।”
অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা ও মোমতাজ উদ্দিন ফকিরের পদত্যাগ
মমতাজ উদ্দিন ফকির রোববার সকালে এটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের সলিসিটর অফিসে তার পদত্যাগপত্র জমা দেন। আর মুরাদ রেজা সরাসরি আইন মন্ত্রণালয়ে তার পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, “দুজন পদত্যাগপত্র দিয়েছেন। শিগগিরই এসব পদে নতুন নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হবে।”
মুরাদ রেজা ২০০৯ সালের ২৭ মার্চ থেকে অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। আর মোমতাজ উদ্দিন ওই পদে নিয়োগ পান ২০১০ সালের ৪ জুলাই।
মমতাজ উদ্দিন ফকির বলেন, “ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগ করেছি। এর বাইরে কিছু নয়।”
২০০৯ সাল থেকে এটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করে আসা মাহবুবে আলম ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
এরপর গত ৮ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এএম আমিন উদ্দিনকে দেশের ষোড়শ এটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার।
আমিন উদ্দিনের নেতৃত্বে এটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে এখন অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল থাকলেন এম এম মুনীর। এছাড়া ৬৭ জন ডেপুটি এটর্নি জেনারেল এবং ১৫৫ জন সহকারী এটর্নি জেনারেল মিলিয়ে মোট ২২৪ জন আইন কর্মকর্তা রয়েছেন এটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে।
ভালো নেই পাকিস্তানের করাচির ২০ লাখ বাঙালী, আনুগত্য দেখিয়েও তকমা জুটেছে মিরজাফরের, কাজে আসছে না ‘ধর্ম’
ভালো নেই পাকিস্তানের করাচিতে থাকা অন্তত ২০ লাখ বাঙালি। সেখানে তাদের থাকতে হচ্ছে অস্পৃশ্য,অবহেলায়। কাটাতে হচ্ছে মানবেতর জীবন। শুধু বাঙালী হওয়ার কারণে পাকিস্তানের প্রতি প্রশ্নাতীত আনুগত্য দেখিয়েও তারা নাগরিকের মর্যাদা পাচ্ছেন না। জাতীয় পরিচয়পত্র মেলেনা, ফলে উচ্চশিক্ষা এবং সরকারি চাকরিও তাদের কপালে জুটে না। জমি বাড়ি কিনতে পারেন না। বাড়ি ভাড়া করে থাকতে হয়। ধর্মের কারণে যারা পাকিস্তানকে আপন ভেবে গিয়েছিলেন তাদের এখন ভুল ভাঙছে। শুধু ধর্ম তাদের বন্ধন সৃষ্টি করাতে পারে নি। ভিন দেশী তকমা আর বাঙালী হওয়ায় তারা পাকিস্তানে ‘মিরজাফর’ হিসেবে চিহ্নিত। পাকিস্তানে বাঙালিদের এই দুর্ভোগের চিত্র এসেছে বিবিসিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে।
পাকিস্তানের বন্দর শহর করাচি। দেশের অর্থনৈতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত এবং সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহর। ২০১৭ সালে ‘দ্য ইকোনোমিস্ট’ পত্রিকার ইনটেলিজেন্স ইউনিট-এর করা এক সমীক্ষায় দাবী করা হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক শহর হলো পাকিস্তানের করাচি। আন্ডারওয়ার্ল্ডের গ্যাংওয়ারের জন্য যেখানে বিখ্যাত। প্রতিনিয়ত খুনোখুনি ধর্ষণ লেগেই থাকে।
এই করাচি শহরে বাস করেন প্রায় ২০ লাখ বাংলাভাষী মানুষ, যারা বাঙালী। বাংলা ভাষায় কথা বলেন। বোয়াল মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খেয়ে জর্দা পান মুখে দেন। তাঁদের কলোনির রাস্তায় হাঁটলে শুনতে পাবেন বাংলাদেশের মমতাজের হিট গান, ‘খায়রুল লো তোর লম্বা মাথার কেশ’ বা ‘ তুমি দিও নাগো বাসর ঘরের বাত্তি নিভাইয়া।‘ হ্যাঁ, পাকিস্তানের করাচির বাঙালিদের বাড়িতে বাড়িতে আজও চলে রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, মুমতাজ, অ্যান্ড্রু কিশোরের সঙ্গে কিশোর কুমার, আশা ভোঁসলের বাংলা গান।
(ছবি- ইন্টারনেট)।
করাচি ইউনিভার্সিটি থেকে বাংলায় মাস্টার্স করা যায়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে পড়ানো হয় রবীন্দ্রনাথের গোরা, নজরুলের অগ্নিবীণা থেকে জসীমউদ্দীনের নকশী কাঁথার মাঠ। পড়ানো হয় হুমায়ুন আহমেদ, সুনীল, শক্তি, মাণিকও। একসময় কওমী-বন্ধন এবং মুক্তি নামে বাংলাভাষার দুটি দৈনিক সংবাদপত্রও প্রকাশিত হতো করাচি থেকে। তাই করাচিকে ‘মিনি বাংলাদেশ’ বলে থাকেন পাকিস্তানের মানুষ। করাচির মাচ্ছি কলোনি, বাঙালী কলোনি, বাংলাবাজার কলোনি, চিটাগাং কলোনি, মুসা কলোনি, ইব্রাহিম হায়দারির মতো প্রায় ১৩২টি বাঙালি কলোনি আছে আশপাশে। এসব কলোনিতেই বাঙালিদের বসবাস। তাদের আত্মীয়দা, বিয়ে শাদি সবই সারতে হয় নিজেদের মধ্যে এসব কলোনিতে। বাইরে বরোবার জো নেই। অন্য কোনো সস্প্রদায়ের সঙ্গেও তাদের মেলামেশা হয় না।
কী ভাবে বাঙালিরা করাচি গেলেন ঃ
করাচিতে বাঙালিরা প্রথম আসেন ব্রিটিশ আমলেই। মাছ ধরার কাজে বাঙালির পারদর্শিতার জন্য বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চল থেকে জেলেদের নিয়ে যান করাচির উর্দুভাষী ব্যবসায়ীরা। বাংলাভাষী হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই ছিলেন সেই দলে। ব্যবসায়ীরা সমুদ্রের ধারে জেলেদের কলোনি গড়ে দেন। সময়টা ছিলো বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ। এই বাঙালী মৎসজীবীরা দ্রুত করাচির উর্দুভাষী বাসিন্দাদের সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেন।
দ্রুত শিখে নেন উর্দুভাষা, কিন্তু বাংলাভাষা ও সংস্কৃতি ভোলেননি। পরবর্তীকালে, ভারত স্বাধীন হওয়ার পর পুর্ব-পাকিস্তান (বাংলাদেশ) থেকে প্রচুর সংখ্যায় বাঙালি করাচিতে আসেন। তবে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর পাকিস্তান থেকে বেশ কিছু বাঙালি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন। কিন্তু বেশিরভাগই রয়ে যান করাচিতে।
(ছবি- ইন্টারনেট)।
বিভিন্ন সূত্রের মতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর খুলনা অঞ্চল থেকে প্রচুর সংখ্যক রাজাকার, স্বাধীনতা বিরোধী পালিয়ে এসে করাচিতে বসবাস শুরু করেছিলেন। ৮০ ও ৯০-এর দশকে জীবিকার সন্ধানে প্রচুর বাঙালি বাংলাদেশের নোয়াখালী ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে করাচিতে এসেছিলেন। কারণ ঐ সময় বাংলাদেশি টাকার তুলনায় পাকিস্তানি টাকার দাম ছিল প্রায় দ্বিগুণ। আয় রোজগারও ছিল ভালো।
১৯৯৫ সালে পাকিস্তানে বাংলাভাষীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল প্রায় ২৫ লাখ। এর মধ্যে করাচিতেই প্রায় ২০ লাখ।
এরমধ্যে ভারত থেকে করাচিতে স্থায়ীভাবে চলে আসে প্রায় এক কোটি হিন্দি ও উর্দুভাষী মুসলিম। তা ছাড়াও করাচিতে ছিলেন ছয় থেকে সাত লাখ আফগানি, হাজার পাঁচেক ইরানি, কয়েক হাজার নেপালি, শ্রীলঙ্কান এবং ফিলিপিনো। এ ছাড়াও বার্মিজ বৌদ্ধদের অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচতে ৫ লাখ রোহিঙ্গা সমুদ্রপথে করাচিতে এসে উঠেছিলেন। সুতরাং জীবিকার তাগিদে, অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে করাচিতে শুরু হয়ে গিয়েছিল জায়গা দখলের লড়াই।
কেমন আছেন করাচির বাঙালিরা?
ভালো নেই, করাচির বাঙালিরা। ১৯৭১ পাল্টে দেয় পাকিস্তানের ২৫ লাখ বাঙালির ললাটলিখন। পূর্ব-পাকিস্তানের বাঙালিরা গঠন করেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশ। কপাল পুড়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানে থাকা বাঙালির। সেই থেকে তাঁরা পাকিস্তানে ‘মীরজাফর’। পাকিস্তানি সমাজের সর্বস্তরে ঘৃণা, বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হয়ে কোনও মতে বেঁচে রয়েছেন পাকিস্তানকে আপন ভাবা এই মানুষগুলি ।
ভারত থেকে আগত উর্দুভাষী মোহাজির জনগোষ্ঠীর পরেই জনসংখ্যার দিক থেকে শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল বাংলাভাষী ‘বাঙ্গালী’ জনগোষ্ঠী। করাচি ক্রমশ বেরিয়ে যেতে শুরু করেছিল ভূমিপুত্রদের হাত থেকে। তাই বেনজির ভুট্টো পাকিস্তানে ‘বাংলাদেশি হটাও‘ অভিযান শুরু করেন। বেনজির ভুট্টোর অতি সক্রিয়তার পিছনে আরেকটি কারণ খুঁজে পান সমালোচকেরা। সেটি হল ভোটাধিকার না থাকলেও, করাচির বাঙালিরা বেশিরভাগই পাকিস্তান মুসলিম লীগের সমর্থক। যেটি বেনজির ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান বিরোধী দল।
বেনজির ভুট্টো সরকার বেনজিরভাবেই পাকিস্তান থেকে বিমানে করে বেশকিছু বাঙালিকে পাঠিয়ে দেন বাংলাদেশে। যা নিয়ে বেনজির ভুট্টোর পাকিস্তানের সঙ্গে খালেদা জিয়ার বাংলাদেশের সম্পর্কের চুড়ান্ত অবনতি ঘটেছিল। খালেদা জিয়া, পাকিস্তানের পাঠিয়ে দেওয়া দুই বিমানভর্তি বাংলাভাষী শরণার্থীকে নিতে অস্বীকার করেছিলেন। দুটি বিমানকেই পত্রপাঠ ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিলেন পাকিস্তানে। ইতিমধ্যে পাকিস্তান মুসলিম লিগ ও ধর্মীয় সংস্থাগুলি বেনজির ভুট্টোর এই কাজকে ইসলামবিরোধী বলে আন্দোলনে নেমে পড়েছিল। ফলে বেনজির ভুট্টোকে ‘বাংলাদেশি হটাও‘ অভিযান পিছিয়ে আসতে হয়েছিল। ২০ লাখ বাঙালি রয়ে গিয়েছিলেন করাচিতেই।
(ছবি- ইন্টারনেট)।
বংশপরম্পরায় পাকিস্তানে থেকেও আজও পাকিস্তানের জাতীয় পরিচয়পত্র মেলে না বাংলাভাষীদের। নাগরিকত্ব দূরের কথা, আজও ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে কাজ করতে হয়। তাও নিতে হয় ঘুরপথে, অনেক টাকা ঘুষ দিয়ে। করাচির মফস্বলে ‘পাকিস্তানি বেঙ্গলি অ্যাকশন কমিটি‘ নামে বাঙালিদের একটি সংগঠন সক্রিয়। তাঁদের কাছ থেকে জানা যায়, জাতীয় পরিচয়পত্র মেলেনা বলে পাকিস্তানের বাঙালিরা উচ্চশিক্ষা এবং সরকারি চাকরি পান না। জমি বাড়ি কিনতে পারেন না। বাড়ি ভাড়া করে থাকতে হয়।
বহুকাল আগে দেশ ছেড়েছেন, তবুও তৃতীয় প্রজন্মের ভবিষ্যত সুরক্ষিত করতে পারেননি।
আজও করাচির বাঙালিদের বাস করতে হয় ঘিঞ্জি বস্তিতে চারদিকে নোংরা জল এবং আবর্জনার মধ্যে। যে বস্তিগুলিতে দিনের মধ্যে কুড়ি ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। পানীয় জল আসে দিনে মাত্র একবার। উচ্চশিক্ষা না থাকার ফলে নবীন প্রজন্মের বাঙালিরা ছোটখাটো কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কেউ রাস্তার পাশে সবজি বেচেন, কেউ চায়ের দোকানে বা মুদি দোকানে কাজ করেন, কেউ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যান।
বেশির ভাগ বাঙালিই কলোনির বাইরে খুব একটা বের হন না। এলাকার বাইরে বের হলে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। ফলে কলোনির ভেতরেই ‘পাঠান’ আর আফগানিদের ছোটখাটো কারখানায় নামমাত্র পয়সায় দিনমজুরের কাজ করতে হয় অধিকাংশ বাঙালিকে। অথচ করাচির মৎস্যশিল্প দাঁড়িয়ে আছে বাঙালি শ্রমিকদের ওপর। পাকিস্তানি ব্যবসায়ীরা সস্তা শ্রমিক পান। তাই তাঁরা চান না বাঙালিরা পাকিস্তান ছেড়ে চলে যান। কিন্তু বাঙালিদের নাগরিকত্ব বা তাঁদের জীবনযাত্রার মানের উন্নয়নের জন্য তাঁরা আদৌ চিন্তিত নন।
পাকিস্তানের মানবাধিকার কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারম্যান আসাদ ইকবাল বাট একবার বিবিসিকে বলেছিলেন বাঙালিদের মর্মান্তিক অবস্থার কথা। তিনি বলেছিলেন “একজন অবাঙালি পাকিস্তানি শ্রমিক যেখানে মাসে ১২-১৩ হাজার রুপি মজুরি পান, একজন বাঙালি শ্রমিক পান তার অর্ধেক। বাঙালি মেয়েরা কারখানা এবং লোকের বাড়িতে কাজ করতে গিয়ে শুধু যে পয়সা কম পান তা নয়, অনবরত যৌনশোষণের শিকারও হচ্ছেন তাঁরা।“
পাকিস্তানে বাঙালিদের জীবনযাত্রার মান একশো বছরেও উন্নত না হওয়ার বড় কারণ হলো, বাঙালিরা পাকিস্তানের নাগরিক নন। যেহেতু নাগরিক নন তাই তাঁদের ভোট নেই। যেহেতু ভোট নেই, পাকিস্তানের রাজনীতিকদের কাছে বাঙালিদের কোনও দাম নেই। সম্প্রতি অবশ্য পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন, বাঙালিদের জাতীয় পরিচয়পত্র এবং পাসপোর্ট দেবেন। কিন্তু পাকিস্তানের বাঙালি আর রাজনৈতিক নেতাদের স্তোতিবাক্যে ভুলতে রাজি নন। তাই করাচির বেশিরভাগ বাঙালি নেমেছেন অধিকার আদায়ের আন্দোলনে।
অমানুষিক বৈষম্য ও নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে করাচির বেশ কিছু বাঙালি পরিবার বাংলাদেশে ফিরে যাবার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। ঠিক যেভাবে পাকিস্তানের হিন্দুরা চেষ্টা করছেন ভারতে ফেরার। প্রতিদিনই শয়ে শয়ে বাঙালি করাচির বাংলাদেশি কনস্যুলেটে গিয়ে বাংলাদেশের ভিসার জন্য আবেদন করছেন। তাঁরা হয়ত বুঝেছেন এক গাছের ছাল কখনও অন্য গাছে লাগানো যায়না। তাঁরা বুঝেছেন ‘ খাঁটি সোনার চাইতে খাঁটি আমার দেশের মাটি’। কিন্তু বুঝতে অনেক দেরি হয়ে গেল।











