ঢাকা   বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ৪ আষাঢ় ১৪৩৩   রাত ৯:৫৮ 

Home Blog Page 151

অধ্যক্ষ গোপাল কৃষ্ণ মুহুরী হত্যায় ৩ আসামীর মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছে আপিল বিভাগ

0

দুই দশক আগে চট্টগ্রামের নাজিরহাট কলেজের অধ্যক্ষ গোপাল কৃষ্ণ মুহুরী হত্যা মামলায় জজ আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামির সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছে আপিল বিভাগ।

আসামিদের আপিল শুনানি শেষে বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলীর নেতৃত্বাধীন ভার্চুয়াল আপিল বেঞ্চ মঙ্গলবার এ রায় দেয়।
রায়ে সর্বোচ্চ আদালত আপিল খারিজের পাশাপাশি সাজা সংশোধন করে আসামিদের স্বাভাবিক মৃত্যু পর্যন্ত, অর্থাৎ আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছে তিন আসামিকে।   

এই তিন আসামি হলেন- তসলিম উদ্দীন ওরফে মন্টু, মোহাম্মদ আজম  ও আলমগীর কবির ওরফে বাইট্টা আলমগীর। তিনজনই জামাত-শিবিরের কর্মী।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত দাসগুপ্ত। আসামিদেরমধ্যে আলমগীর কবিরের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন, মন্টু ও আজমের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী হেলাল উদ্দিন মোল্লা।

পরে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত বিডিনিউজ টোয়ন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আজকে শর্ট অর্ডার হয়েছে। আসামিদের আপিল ও জেল আপিল খারিজ করে দিয়েছেন আপিল বিভাগ। তবে তাদের সাজা সংশোধন করে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন। কোন যুক্তিতে কেন সাজা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে তা পুরো রায় বের হলে জানা যাবে।”

তিন আসামি এতদিন কারাগারে কনডেম সেলে ছিলেন জানিয়ে অমিত দাশগুপ্ত বলেন, “তাদের এখন কারাগারে সাধারণ সেলে স্থানান্তর করা হবে।”

২০০১ সালের ১৬ নভেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর জামাল খান রোডে অধ্যক্ষ গোপাল কৃষ্ণ মুহুরীর (৬০) বাসায় ঢুকে তার মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে হত্যা করে জামায়াত-শিবির কর্মীরা।

তার স্ত্রী রেলওয়ের তৎকালীন অডিট কর্মকর্তা উমা মুহুরী সেদিনই চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

চট্টগ্রামের নাজিরহাট কলেজের অধ্যক্ষ গোপাল কৃষ্ণ মুহুরী হত্যার ওই মামলার বিচার শেষে নাসির ওরফে গিট্টু নাসির, আজম, আলমগীর ও মন্টুকে মৃত্যুদণ্ড দেয় জজ আদালত।

এছাড়া মহিউদ্দিন ওরফে মহিনউদ্দিন, হাবিব খান, সাইফুল ওরফে ছোট সাইফুল ও শাহাজাহানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় রায়ে।

বিচারিক আদালতের ওই রায়ের পর মামলার ডেথ রেফারেন্স হাই কোর্টে আসে, পাশাপাশি কারাগারে থাকা আসামিরাও আপিল করেন। এর মধ্যে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া গিট্টু নাসির ২০০৫ সালের ২ মার্চ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। মারা যান যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত ছোট সাইফুলও।

হাই কোর্ট শুনানি শেষে ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে ২০০৬ সালের ১৯ জুলাই রায় দেয়। সেই রায়ে যাবজ্জীবন সাজার আসামি শাহাজাহান ও সাইফুল ওরফে ছোটো সাইফুল খালাস পান, অন্যদের সাজা বহাল থাকে।

এরপর মৃত্যদণ্ডের তিন আসামির মধ্যে আলমগীর কবির খালাস চেয়ে আপিল বিভাগে আপিল করেন। আর তসলিম উদ্দীন ওরফে মন্টু, মোহাম্মদ আজম করেন জেল আপিল।

এসব আপিলের শুনানি করে সর্বোচ্চ আদালত মঙ্গলবার হাই কোর্টের রায় সংশোধন করে চূড়ান্ত রায় দিল।

সড়কপথে ঢাকা পৌঁছেছেন ভারতের নতুন হাইকমিশনার; বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন

0

ঢাকায় এসে পৌঁছেছেন নবনিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার বিক্রম দোরাইস্বামী। সোমবার তিনি আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে হেঁটে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন এবং সেখান থেকে সড়ক পথে ঢাকায় আসেন।
ঢাকায় পৌঁছে প্রথমেই তিনি বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় তার প্রতি সম্মান জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন ভারতীয় এই হাইকমিশনার। এরপর বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে থাকা মন্তব্য খাতায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে বঙ্গবন্ধুর অসামান্য অবদানের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করার কথা লেখেন তিনি।

এর আগে সকালে ভারতের ত্রিপুরা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে হেঁটে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন তিনি। আগামী ৮ অক্টোবর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো আব্দুল হামিদের কাছে পরিচয়পত্র পেশ করবেন ভারতীয় হাইকমিশনার।
বাংলাদেশে এসে বিক্রম দোরাইস্বামী বলেন, ভারতের সবচেয়ে নিকটতম প্রতিবেশী দেশ হলো বাংলাদেশ। আমি বাংলাদেশের প্রত্যাশার কথা শুনব। উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রীকে সেটি জানাব।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে আরো কিভাবে অংশীদারিত্ব বাড়ানো যায় সেটি নিয়ে আমি কাজ করব। বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলো দুই দেশের মৈত্রী বন্ধনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর-পূর্বের সঙ্গে বাংলাদেশের নৌ, সড়ক ও বাণিজ্য প্রসার গুরুত্ব পাবে।

রীভা গাঙ্গুলী দাসের উত্তরসূরি হিসেবে ঢাকায় নয়া দিল্লি মিশনের দায়িত্বে আসলেন দোরাইস্বামী।

১৯৯২ ব্যাচের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা বিক্রম দোরাইস্বামী সর্বশেষ অতিরিক্ত সচিব হিসেবে আন্তর্জাতিক সংগঠন ও সম্মেলন বিভাগের ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্বপালন করেছেন।

তার জন্ম ভারতের তামিলনাড়ুতে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বিক্রম দোরাইস্বামীর বাবা বিমান বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি মিত্রবাহিনীর পাশাপাশি থেকে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান সীমান্তে যুদ্ধ করেছেন।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগ দেওয়ার আগে বিক্রম দোরাইস্বামী কিছু সময় সাংবাদিকতাও করেছেন। দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে পড়েছেন তিনি।

সাতাত্তরের কোর্ট মার্শাল: কমিশন করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি, মরণোত্তর বিচার চাওয়া হয়েছে জিয়াউর রহমানের

0

কথিত অভ্যুত্থানের অভিযোগ তুলে ১৯৭৭ সালে ২রা অক্টোবর দেশের সুর্য সন্তান হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেন অবৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকারী জিয়াউর রহমান। সামরিক ট্রাইব্যুনাল গঠনের আগেই জিয়া ও তার অনুসারীরা হত্যার নৃশংসতায় মেতে উঠেন। কথিত বিচারের নামে সেনা ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে, ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যাসহ বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচারের নামে যে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে তা নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা জাতির সামনে তুলে ধরার জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তাদের পরিবারের সদস্যরা।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এক মানববন্ধন থেকে এমন দাবি জানানো হয়।
জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনামলে ১৯৭৭ সালে মার্শাল ল ট্রাইব্যুনাল কোর্টের বিচারে ফাঁসি দেওয়া সেনা ও বিমান বাহিনীর সদস্যরা নির্দোষ ছিলেন বলে জানান স্বজনরা। সরকারিভাবে তাদের নির্দোষ ঘোষণা করার দাবি জানানো হয় একইসঙ্গে আজিমপুর কবরস্থানে তাদের সমাধিতে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করতে সরকারের কাছে আবেদন করছেন তারা। 
কোর্ট মার্শালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের স্বজন এবং চাকরিচ্যুতদের ‘সাতাত্তরের ষড়যন্ত্রের শিকার আমরা’ নামের সংগঠনের উদ্যোগে এই মানববন্ধন থেকে জিয়াউর রহমানের মরণোত্তর বিচার দাবি করা হয়েছে।
ফাঁসিতে নিহত বিমানবাহিনীর সার্জেন্ট বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইদুর রহমানের ছেলে মো. কামরুজ্জামান মিয়া লেলিনের বয়স ১৯৭৭ সালে ছিল ছয় বছর। মানববন্ধনে তিনি বলেন, ‘দেশের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু আমি এতই হতভাগ্য যে, বাবার লাশ দেখার সুযোগ পাইনি। ১৯৯৬ সালে তিনি জানতে পারেন ১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবরের ঘটনায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসি হওয়া সেনা ও বিমান বাহিনীর ১২১ সদস্যের লাশ আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। তার মধ্যে আমার বাবার লাশও ছিল। তিনি জানান তার বাবার ফাঁসি হয় ১৯৭৭ সালের ২৫ অক্টোবর।’
মো. কামরুজ্জামান মিয়া লেলিনের কথায়, ‘কথিত অভ্যুত্থানের অভিযোগে ১৯৭৭ সালের ৮ অক্টোবর থেকে সেনা ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের ফাঁসি দিতে শুরু করেন তৎকালীন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান। কিন্তু এর ছয় দিন পর তিনি মার্শাল ল আইন পাস করেন। তার মানে আগে ফাঁসি দিয়ে পরে আইনটি পাস হয়েছে।’
নিয়ম অনুযায়ী, মার্শাল ল ট্রাইব্যুনালে বিচারক থাকেন পাঁচজন সেনা কর্মকর্তা। মো. কামরুজ্জামান মিয়া লেলিনের দাবি, ‘তাদের মধ্যে একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল এবং বাকি চারজন ক্যাপ্টেন থাকার কথা। সবার চাকরির বয়স ন্যূনতম তিন বছর হতে হয়। কিন্তু জিয়াউর রহমান তা পরিবর্তন করে নিজের মতো করে সিপাহী ও হাবিলদারদের বিচারক করেন। তারা নিজেদের খেয়ালখুশি মতো রায় দিয়েছে।’
বিচারের নামে আমার বাবাসহ যাদের হত্যা করা হয়েছে তারা সবাই নির্দোষ ছিলেন। এটা প্রমাণিত, কিন্তু আনঅফিসিয়াল। আমরা এখন এ বিষয়ে সরকারি স্বীকৃতি চাই। তখন ফাঁসিতে নিহত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা ১০-১২ বছর সরকারি চাকরি করেছিলেন। আমাদের চাওয়া, যোগ্যতা অনুযায়ী তাদের ছেলেমেয়ে বা নাতি-নাতনিদের চাকরি বা আর্থিক সুবিধা দেওয়া হোক।’
সেই সময় যাদের লাশ আজিমপুরে দাফন করা হয়েছে তাদের কবর চিহ্নিত করে সেখানে সরকারি স্বীকৃতি দিতে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপনের দাবি উঠেছে। এ বিষয়ে ২০১৯ সালের ২৬ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে ‘সাতাত্তরের ষড়যন্ত্রের শিকার আমরা’ সংগঠন। স্বজনরা অতি দ্রুত এর বাস্তবায়ন দেখতে চান।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে কোর্ট মার্শালে বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে হাইকোর্টে একটি রিট করা হয়েছে। এ তথ্য উল্লেখ করে কামরুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। সামনে আবারও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করবো। আশা করি, আমরা ন্যায়বিচার পাবো।’
কোর্ট মার্শালে সাজা পেয়ে চাকরিচ্যুত সার্জেন্ট মোবাহের আলীর ছেলে কে এম তমাল মানববন্ধনে বলেন, ‘বিনা অপরাধে যাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে ও চাকরিচ্যুত করে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, তারা নির্দোষ ছিলেন। বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। তাদের কাছে একটাই দাবি, আমার বাবা ও তার সহকর্মীরা যে নির্দোষ ছিলেন, সেটি ঘোষণা করা হোক। বাবা কিছুদিন আগে মারা গেছেন। আমরা ন্যায়বিচার পেলে বাবার আত্মা কিছুটা হলেও শান্তি পাবে।’

কক্সবাজার সৈকতের ৫২ স্থাপনা উচ্ছেদের বাধা কাটল, হাইকোর্টের আদেশ আপিল বিভাগে বাতিল

0

কক্সবাজার সৈকতের ৫২ স্থাপনা উচ্ছেদের বাধা কাটল, হাইকোর্টের আদেশ আপিল বিভাগে বাতিল

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের কলাতলীর সুগন্ধা পয়েন্টে ৫২ ব্যক্তির অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে হাই কোর্টের দেওয়া স্থগিতাদেশ বাতিল করে দিয়েছে আপিল বিভাগ।

ফলে সমুদ্র সৈকতের ওই পয়েন্ট থেকে ৫২ ব্যক্তির অবৈধ সব স্থাপনা উচ্ছেদে কোনো বাধা থাকল না বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।

হাই কোর্টের আদেশ বাতিল চেয়ে ভূমি মন্ত্রণালয় ও রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের শুনানি নিয়ে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন চার বিচারকের ভার্চুয়াল আপিল বেঞ্চ বৃহস্পতিবার এ আদেশ দেয়।

আদালতের আদেশের পর কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেছেন, তারা এখন স্থাপনা উচ্ছেদে দ্রুতই উদ্যোগ নেবেন।

হাই কোর্টে ভূমি মন্ত্রণালয়ের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিৎ দেবনাথ। আর ৫২ ব্যক্তির রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মাহবুব উদ্দিন খোকন।

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে কক্সবাজার পৌরসভা থেকে লাইসেন্স নিয়ে ৫২ ব্যক্তি সৈকতে কলাতলীর সুগন্ধা পয়েন্টে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করে ব্যবসা শুরু করে।

স্থাপনা তৈরির দুই মাস পর, অর্থাৎ ২০১৮ সালের ১০ এপ্রিল কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ স্থাপনা সরাতে নোটিস দেয়।  

ওই নোটিসের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ওই ৫২ ব্যক্তি হাই কোর্টে রিট আবেদন করলে আদালত ১৬ এপ্রিল রুলসহ স্থগিতাদেশ দেয়।

এরপর ভূমি মন্ত্রণালয় ও রাষ্ট্রপক্ষ হাই কোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করে। সে আবেদনের শুনানি করেই হাই কোর্টের দেওয়া স্থগিতাদেশ ও রুল সর্বোচ্চ আদালত বাতিল করে দিল। 

আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, “সমুদ্র সৈকতের সৌন্দর্য রক্ষার জন্য অনেক আগেই আদালতের নির্দেশনা পেয়েছিলাম। ২০১১ সালে সমুদ্র সৈকত থেকে সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়ে গিয়েছিল।

“পরবর্তীতে প্রতিবেশ সঙ্কটাপন্ন এলাকা বিবেচনায় আপিল বিভাগ কিন্তু আরও কঠিন রায় দিয়েছে। সে রায়ে বড় বড় অবৈধ স্থাপনাগুলোও ভেঙে ফেলতে বলেছেন আদালত।”

তারপরও কিছু ‘স্বার্থান্বেসী লোক’ সমুদ্র সৈকতের সৌন্দর্য নষ্ট করে পৌরসভার কাছ থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে স্থাপনা তৈরি করেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “যখন উচ্ছেদের নোটিস দেওয়া হয়, তখন তারা গোপনে হাই কোর্টে এসে নোটিসের স্থগিতাদেশও নিয়ে নেয়।

“বিষয়টি আমাদের দৃষ্টিতে আসার পর আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়। শুনানির পর আপিল বিভাগ হাই কোর্টের আদেশ বাতিল করে দিয়েছে।”

প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মনজিল মোরসেদ বলেন, “আমার প্রশ্ন থাকবে প্রশাসন কেন সেখানে চোখ বুজে থাকে? প্রশাসন তো জানে এ নিয়ে আদালতের নির্দেশ আছে, রায় আছে। আর পৌরসভাই বা কেন তাদের লাইসেন্স দেবে!”

পৌরসভার যিনি বা যারা ওই ৫২ ব্যক্তিকে ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে ‘আইনগত ব্যবস্থা’ নেবেন বলে জানান সুপ্রিম কোর্টের এ আইনজীবী।

এ নিয়ে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফোরকান আহমদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সৈকত এলাকায় এসব বৈধ-অবৈধ স্থাপনা তৈরি হয়ে আসছে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে।

“উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এসব স্থাপনা উচ্ছেদ করলেও জায়গাটার মালিক জেলা প্রশাসন। এটা খাস জায়গা। খাস জায়গার দায়িত্ব কালেক্টরের। আর কালেক্টরেট হলেন ডিসি, ল্যান্ড মিনিস্ট্রি।”

তাই এসব অবৈধ স্থাপনা অপসারণের পর প্রশাসনকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে মন্তব্য করেন তিনি।

“আমরা যদি যৌথভাবে এটা না করি, আমি সরাই দিলাম; অপসারণ করলাম। কিন্তু জেলা প্রশাসন যদি এটা ধরে রাখতে না পারেন, অন্য একটা কিছু করার মতো ব্যবস্থা না করেন; তাহলে এ সমস্যাগুলো হবেই।”

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক কামাল হোসেন বলেন, সৈকতের ৫২টি স্থাপনা উচ্ছেদের বিরুদ্ধে দায়ের রুল জারি ও স্থগিতাদেশ খারিজ করার আদেশের খবর আইনজীবীর মাধ্যমে জেনেছেন।

“আদালতের আদেশ হাতে পাওয়ার পর তা কার্যকর করার জন্য দ্রুত উচ্ছেদের ব্যবস্থা করা হবে।”

মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঘরে করোনা থাবা, কোয়ারেন্টাইনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মেলানিয়া

0

করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তারপরেই কোয়ারেন্টাইনে গেলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর এবং ট্রাম্পের স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্পের করোনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। টুইট করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন তিনি এবং তাঁর স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্প কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন।
হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের এক সহযোগীর করোনা ধরা পড়ায় বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন তিনি এবং ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া কোয়ারান্টাইনে যাবেন।
ইতিমধ্যে তাঁরা করোনা পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প টুইটারে বলেন, “হোপ হিকস এর কোভিড-১৯ পরীক্ষা ইতিবাচক এসেছে। ফার্স্ট লেডি আর আমি আমাদের পরীক্ষার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছি। আমরা আমাদের কোয়ারান্টাইন প্রক্রিয়া শুরু করব”।

সাতাত্তরে বিমান বাহিনীতে অভ্যুত্থান, হত্যা ও ১১৪৩ জন অফিসার ও সৈনিক নিখোঁজ রহস্য!

0

কলঙ্কিত ২ অক্টোবর। ১৯৭৭ সালের এই দিন বিমানবাহিনী থেকে এক ব্যর্থ অভ্যুত্থানের জের ধরে পরবর্তি ২ মাসে হাজার হাজার সৈনিককে ফাঁসি, ফায়ারিং স্কোয়াডে হত্যা করা হয়। বিষয়টি নিয়ে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত কেউ টু শব্দটি করতে পারেনি।নানা ভয় ও ভীতির কারণে। লেখক ও গবেষক আনোয়ার কবির এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা ও অনুসন্ধান করেন এবং দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় ২ অক্টোবর ১৯৯৬ সালে এ লেখাটি লিখেন। বলা যায় জেনারেল জিয়ার শাসনামলে বিমান বাহিনীতে যে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়ছিল তা নিয়ে মিডিয়ায় এটিই প্রথম প্রকাশ। বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে ” আইন আদালত” এর জন্য লেখাটি পুনরায় প্রকাশিত হলো। (সম্পাদক)


“গুলিবর্ষণের মধ্যে এগোতে না পেরে ফিরে এলাম ভি.আই.পি লাউঞ্জে। আর সেখান থেকেই দেখলাম এই বীভৎস দৃশ্য। হ্যাঙ্গারের সামনে কিছু জওয়ানের জটলা ছিল। তাদেরই কয়েকজন হ্যাঙ্গারের ভিতর থেকে অস্ত্রের মুখে বের করে নিয়ে এলো বিমান বাহিনীর একদল অফিসারকে। পরনে সবার ইউনিফর্ম, দু’হাত মাথার ওপর তোলা। ভি.আই.পি লাউঞ্জ থেকে কারও চেহারা স্পস্ট দেখা যাচ্ছিল না। শুধু দেখলাম, সবার সামনে যিনি ছিলেন তিনি খোঁড়াচ্ছিলেন। হাঁটতে পারছিলেন না। হাঁটতে গিয়ে পড়ে যাচ্ছিলেন। তবুও অস্ত্রের মুখে এসে হ্যাঙ্গারের সামনে খোলা জায়গায় দাঁড়ালেন এক লাইনে। গুনে দেখলাম ওরা সাতজন। বেশ কয়েকজন জওয়ান অস্ত্র তাক করে দাঁড়াল ওদের সামনে। তখনই বুঝলাম ওরা ফায়ারিং স্কোয়াড, ওরা এই সাতজন অফিসারকে গুলি করে হত্যা করবে। বেশি দেরি করেনি জওয়ানরা। সবার হাতের অস্ত্র একসঙ্গে গর্জে উঠল। ওদের প্রথম শিকার হলেন লাইনের প্রথম অফিসারটি। যিনি খুড়িয়ে হাটছিলেন। দাঁড়াতে পারছিলেন না। পড়ে যাচ্ছিলেন। তারপর একে একে বাকি ছয়জন। গুলি খেয়ে মানুষ ছিটকে পড়ে এ কথাই জেনে এসেছি এতদিন। কিন্তু এদিন স্বচক্ষে দেখলাম, কেউ ছিটকে পড়ল না। ঘাতকদের গুলিবৃষ্টিতে টগবগে স্বাস্থ্যের এই তরুণ অফিসাররা সবাই লুটিয়ে পড়লেন টারমার্কের কংক্রিটে বাঁধানো শক্ত মাটিতে, নিজেদের রক্তের সলিলে।”
২ অক্টোবর ১৯৭৭। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাস্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান। এদিন বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীতে সংঘটিত এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান সম্পর্কে এভাবেই প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ দেন সিনিয়র সাংবাদিক মনজুর আহমদ। অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পরে রাস্ট্রপতি জেনারেল জিয়া ডিজিএফআই প্রধান এয়ার মার্শাল আমিনুল ইসলামকে চাকরি হতে অপসারণ করেন। একইসঙ্গে তিনি ২২ ইস্ট বেঙ্গল, আর্মি ফিল্ড সিগন্যাল ব্যাটালিয়ন, সিগন্যাল সেন্টার এন্ড স্কুল এবং আর্মি সাপ্লাই এ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট ব্যাটালিয়ন বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। জেনারেল মীর শওকত আলীকে যশোরে ৫৫ ডিভিশনের অধিনায়ক এবং জেনারেল মঞ্জুরকে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের অধিনায়ক হিসেবে চট্টগ্রামে বদলি করা হয়। এছাড়াও সশস্ত্র বাহিনীতে চালানো হয় এক ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ। সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী পরবর্তী দু’মাসের মধ্যে এ হত্যাযজ্ঞের শিকার হিসেবে ১১৪৩ জন সৈনিকের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়, যার মধ্যে বিমান বাহিনীরই ছিল ৫৬১ জন। বিশেষ সামরিক আদালতে বিচার এবং রুল ৩১ অনুযায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবেই এই হত্যাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তিসহ জেলে ঢোকানো হয় কয়েক’শ সৈনিককে।
এ সময় জেনারেল জিয়া বিদ্রোহী সৈনিকদের বিচার করার জন্য যে স্পেশাল সামরিক আদালত গঠন করেছিলেন তা করেছিলেন মূলত দ্রুত ফাঁসি কার্যকর করার জন্যই। কারণ বাংলাদেশ আর্মি ও এয়ার ফোর্স এ্যাক্ট অনুযায়ী শুধুমাত্র জেনারেল কোর্ট মার্শাল মৃত্যুদন্ড দিতে পারে। সুবিচারের স্বার্থে এ সামরিক আদালত উর্ধতন ও বিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত হতে হবে। তাই এ রকম কোর্ট মার্শালে জজ হিসেবে কমপক্ষে ৫ জন সামরিক অফিসার থাকতে হবে। জজদের মধ্যে একজনকে অন্ততপক্ষে লে. কর্নেল হতে হবে এবং বাকি চারজনের কেউই ক্যাপ্টেনের নিচে হতে পারবে না এবং ক্যাপ্টেন হিসেবে কমিশন প্রাপ্তির পর কমপক্ষে তিন বছর চাকরি অতিবাহিত করতে হবে। অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ দিতে হবে। রাস্ট্রপতি জেনারেল জিয়া দেখলেন এই সকল নিয়ম-কানুন দ্রুত মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার উদ্দেশ্য সাধনের পথে বিরাট অন্তরায়। সেজন্য জিয়া একটি মার্শাল ল’ অর্ডার জারি করেন। ঐ অর্ডারে বিশেষ আদালতের নামে এমন কোর্ট সৃস্টি করা হয় যেগুলোতে বিচারের জন্য একজন লেঃ কর্নেলের সঙ্গে হাবিলদার ও নায়েক সুবেদারের মতো সৈনিক আদালতের জজ হন। এক কলমের খোঁচায় জেনারেল জিয়া রাতারাতি দুই ডজনেরও বেশি এই ধরনের কোর্ট সৃষ্টি করলেন। আর এ ধরনের আদালতে ন্যায় বিচারের প্রশ্নই উঠে না। এমন একটি কোর্টের উদাহরণ হলো মার্শাল ল ট্রাইব্যুনাল নং-১৮ ঢাকা। কেস নং-১/১৯৭৭, তাং ৮ই অক্টোবর ১৯৭৭। জজ- ঃ (১) লেঃ কর্নেল কাজী সলিমুদ্দিন মোঃ শাহরিয়ার, (২) সুবেদার মোঃ আবদুল হালিম, (৩) নায়েক সুবেদার আবদুল হাকিম, (৪) হাবিলদার আনোয়ার হোসেন, (৫) হাবিলদার এম এফ আহমদ। অভিযুক্তরা হলেন (১) ৬২৭৪০২৮ নায়েক এনামুল হক, (২) ৬২৮৪৫৪ সিগন্যালার কাজী সাইদ হোসেন, (৩) ৬২১১৮৬ নায়েক আব্দুল মান্নান, (৪) ৬২৮৪৭৩৬ সিগন্যালার এস কে জাবেদ আলী। বিশেষ সামরিক আদালত চারজনের সবাইকে মৃত্যুদন্ডাদেশ প্রদান করে। পরদিন ৯ অক্টোবর স্বয়ং জেনারেল জিয়া তাদের মৃতুদন্ডাদেশ অনুমোদন করে মন্তব্য করেন, যতক্ষণ পর্যন্ত ওরা না মরে ততক্ষণ পর্যন্ত ওদের গলায় ফাঁসি ঝুলিয়ে রাখো। ১০ অক্টোবর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে এ চারজন হতভাগ্য সৈনিককে হত্যা করা হয়। সে সময় ঢাকা জেলে সিকিউরিটি ওয়ার্ডের বন্দী রইস উদ্দীন আরিফ প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে এই হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা দেন এভাবে- “১৯৭৭ সালের আগস্ট মাসে ঢাকা বিমান বন্দরে জাপান এয়ারলাইন্স-এর ৭০৭ বোয়িং বিমান হাইজ্যাকের উত্তপ্ত মুহূর্তে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর নিম্নস্তরের অফিসার ও জওয়ানদের মুস্টিমেয় কিছু লোক জেঃ জিয়ার বিরুদ্ধে একটি হঠকারী ক্যু-দেতা করার চেষ্টা চালায়। এই ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মুষ্টিমেয় যে কয়জন অফিসার ও জওয়ান জড়িত ছিলেন তাদের সংখ্যা বড় জোর বিশ-পঁচিশ। কিন্তু এই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে জেঃ জিয়া অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে যে পদক্ষেপ নিলেন তার ফলে এক রাতের মধ্যে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হৈ হৈ, রৈ রৈ কান্ড বেঁধে গেল। বিমান বাহিনীর প্রায় তের শ’ অফিসার ও জওয়ানকে একরাতে পাকড়াও করে জেলে পোরা হলো। এমনিতেই আওয়ামী লীগ ও অপরাপর সংগঠনের হাজার হাজার কর্মী দিয়ে জেলখানা ঠাসা। তার ওপর বাড়তি তেরশ’ লোকের আগমণে জেলখানা জুড়ে তুলকালাম কান্ড শুরু হয়ে গেল। একে তো জেল ভর্তি সকল কয়েদী, হাজতী ও রাজবন্দী জিয়া সরকারের বিরুদ্ধে দারুণ ক্ষ্যাপা। তার মাঝে জিয়া সরকারকে উৎখাতের জন্য সংঘটিত ক্যু-দেতার ‘নায়করা’ জেলখানায় ঢোকার পর সমগ্র জেলখানায় এক মারাত্মক থমথমে ভাব বিরাজ করতে লাগল। হয়ত এ কারণেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে গ্রেফতারকৃত সৈনিকদের অর্ধেকেরও বেশি সংখ্যক রাতারাতি দেশের বিভিন্ন কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হলো। এর পরের ঘটনা এমন লোমহর্ষক, যা সে সময়ে যাঁরা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী ছিলেন, আমি হলপ করে বলতে পারি, তাঁদের সবার কাছেই জেলখানার সে কয়টি বিভীষিকাময় রাতের স্মৃতি জীবনের এক দুঃস্বপ্নের স্মৃতি হয়ে বেঁচে আছে। সেই সব বিভীষিকাময় রাতের লোমহর্ষক ঘটনাবলী খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষভাবে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম বিশেষভাবে আমরা, যারা ছিলাম সিকিউরিটি ওয়ার্ডের বন্দী। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিকিউরিটি ওয়ার্ডের অবস্থানটি হলো কারা কর্তৃপক্ষের অফিসটি যেখানে ঠিক তার পাশেই। এই অফিসটিতে বসেছিল জিয়ার সংক্ষিপ্ত কোর্ট মার্শাল।
বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে অফিসার-সিপাইদের এক সাথে পনেরো বিশজন করে বুকে পিঠে আড়মোড়া দিয়ে বেঁধে বলির পাঁঠার মতো টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে আসা হচ্ছিল কোর্ট মার্শালের সামনে। তারপর এক তেলেসমাতি কান্ড। রামরাজত্বের বিচার। দুই মিনিটে রায়। ৯ জনের ফাঁসি, ১১ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা। আবার এই ফাঁসির হুকুম কার্যকরী করার সময়টি ছিল যেন রায় ঘোষণার সময়ের চেয়েও কম। পারেতো এক মিনিটেই ৯ জনকে একসাথে ঝুলায়। কিন্তু বাস্তবে তা কি আর সম্ভব? প্রথমত যাদের ফাঁসির হুকুম হলো তাদেরকে তো আগে বধ্যভূমিতে নিয়ে যেতে হবে। কোর্ট মার্শাল থেকে বধ্যভূমির দূরত্ব তাও নেহাৎ কম নয়। দেড় দু’শ গজতো হবে। কোর্ট মার্শাল থেকে বধ্যভূমিতে যাওয়ার পথটি ছিল আমাদের ওয়ার্ডের ঠিক পাশেই। তার জন্যই এ লোমহর্ষক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হতে পেরেছিলাম আমরা। একপাল ছাগলকে জবাই করার জন্য যেমন করে কসাইখানায় নিয়ে যাওয়া হয় এদেরকেও সেভাবে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্চে বধ্যভূমিতে। কিন্তু তফাতটি হচ্ছে- এরা অবুঝ জানোয়ার নয়, এরা মানুষ। এদের ফাঁসির হুকুম নিজেদের চোখের সামনেই ঘোষিত হয়েছে এবং দড়িতে ঝুলানোর জন্য তাদেরকে সে মুহূর্তে জোর করে টেনে নেয়া হচ্ছে বধ্যভূমিতে।”
প্রহসনমূলক এ বিচার ছাড়াও অনেক সৈনিক এবং অফিসারকে সরাসরি ফায়ারিং স্কোয়াড গঠন করে মারা হয়। এ ফায়ারিং স্কোয়াডের স্থান ছিল পুরনো বিমান বন্দর ও আশপাশের কিছু এলাকা। সে সময়ে এ সকল এলাকায় বসবাসকারী কিছু লোকের কাছ থেকে জানা যায, এ ঘটনার পরে প্রায রাতেই তারা ঐসকল হতভাগ্য সৈনিক ও অফিসারদের আর্তচিৎকারে ঘুমাতে পারতেন না। ফাঁসি দেয়া, ফায়ারিং স্কোয়াডে মারা কোন সৈনিক, অফিসার-কারও লাশই আত্মীয়-স্বজনের কাছে ফেরত দেয়া হয়নি। একটি বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, এ সকল হতভাগ্য সৈনিক এবং অফিসারের লাশ হেলিকপ্টারে করে সদ্য আবিস্কৃত (তৎকালীন সময়ে) জনমানবহীন “নিঝুম দ্বীপ”-এ নিয়ে সাগরে ফেলে দেয়া হয়। আবার কিছু লাশ সেনানিবাসগুলোর ভিতরেও পুঁতে ফেলা হয়।
“বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ইতিহাস”-শীর্ষক পুস্তকে এ অভ্যুত্থানের নিম্নোক্ত বিবরণ ছাপা হয়-
“২৮ সেপ্টেম্বর বিমানবাহিনী দিবসে পুরনো বিমানবন্দরের নিকটস্থ বিমানবাহিনী মেসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল। সামরিক বাহিনীর সকল পদস্থ কর্মকর্তাও এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। ২৭ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এ.জি.মাহমুদকে এক চিঠিতে জানান, তারপক্ষে এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা সম্ভব না। আগেরদিন ২৬ সেপ্টেম্বর একটি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় স্কোয়াড্রন লিডার ইসলামসহ আরও ২ জন মারা যায়। জাপানি রেড আর্মির ৫ সদস্য “হিদাকা কমান্ডো ইউনিটের” সদস্যরা ১৫৬ জন যাত্রীসহ জাপান এয়ারলাইন্সের একটি ডিসি-৮ বিমান ব্যাংককের পথে ঢাকা ত্যাগ করার পরই ঢাকায় অবতরণে বাধ্য করে। ঢাকায় এ নিয়ে ব্যাপক শোরগোল। বিমানবাহিনী প্রধান এজি মাহমুদকে বিমান ছিনতাইকারীদের সাথে আলোচনার দায়িত্ব দেয়া হয়। এই অবস্থায় বিমানবাহিনী দিবসের অনুষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হয়ে যায়। অনুষ্ঠান স্থগিত হওয়ায় তথাকথিত ২৮ সেপ্টেম্বরের ষড়যন্ত্রকারীদের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। এসময় বগুড়া সেনানিবাসের একটি রেজিমেন্টের সেনারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এতে দু’জন প্রাণ হারান। পরদিন পহেলা অক্টোবর ঢাকা সেনানিবাসেও উত্তেজনা দেখা দেয়। একটি ব্যাটালিয়নের কিছু বিপথগামী সৈন্য বিদ্রোহের উদ্যোগ নেয়। তাতে কতিপয় বিমানসেনাও যোগ দেয়। পহেলা অক্টোবর দিবাগত রাতে সেনা ও বিমানবাহিনীর সেনারা ২৫টি ট্রাক ও জীপ নিয়ে সেন্ট্রাল অর্ডন্যান্স ডিপোতে হানা দেয়। ২ অক্টোবর সকালে সাতটি ট্রাকে সেনা ও বিমানসেনারা রেডিও ষ্টেশন দখল করে এবং সেখানে তারা সিপাহী বিপ্লবে যোগ দেয়ার জন্য সর্বস্তরের মানুষকে আহ্বান জানান। একজন বিমানসেনা (সার্জেন্ট আফসার) নিজেকে নেতা ঘোষণা দিয়ে বেতারে বক্তৃতা দেন। দেশবাসী এই বক্তৃতা শোনার আগেই নবম ডিভিশন হেড কোয়ার্টারের নির্দেশে সাভার ট্রান্সমিশন কেন্দ্রটি বন্ধ করে দেয়া হয়। ইতোমধ্যে বিদ্রোহ নৃশংস রূপ নেয়। বিদ্রোহীরা বিমানবন্দর হ্যাঙ্গারের সামনে বিমানবাহিনীর দু’জন অফিসারকে গুলি করে হত্যা করে। বিমানবাহিনী প্রধানের সামনেই গ্রুপ ক্যাপ্টেন রাস মাসুদকে গুলি করে হত্যা করা হয়। বিমানবাহিনী প্রধান কোনভাবে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। সেখানে গ্রুপ ক্যাপ্টেন আনসার উদ্দিন চৌধুরী, উইং কমান্ডার আনোয়ার শেখ, স্কোয়াড্রন লিডার এ মতিন, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট শওকত জাহান চৌধুরী, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সালাহউদ্দিন, ফ্লাইং অফিসার আখতারুজ্জামান, পাইলট অফিসার এম এইচ আনসার, পাইলট অফিসার নজরুল ইসলাম ও পাইলট অফিসার শরিফুল ইসলামকে গুলি করে হত্যা করা হয়। বিদ্রোহীদের গুলিতে স্কোয়াড্রন লিডার সিরাজুল হকের ১৬ বছরের তরুণ ছেলেও নির্মমভাবে মারা যায়।” এই পুস্তিকায় ঘটনার বিবরণে আরও বলা হয়েছে- এই বিদ্রোহ বেশি দূর আগাতে পারেনি। কারণ বিদ্রোহের নায়করা অন্যান্য ইউনিট হতে সৈন্যদের দলে টানতে সক্ষম হয়নি। অবিলম্বে দেশপ্রেমিক অনুগত সৈন্যদের সহায়তায় বিদ্রোহ দমন করা হয়। কয়েকটি রাজনৈতিক দলকে দেশের স্বার্থবিরোধী কাজ করার অভিযোগে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তখন ধারণা করা হয়েছিল যে, জাপানী বিমান হাইজ্যাকের সঙ্গে বিমানবাহিনীর এই বিদ্রোহের যোগসূত্র ছিল।
বিদ্রোহের অপরাধে সরকার অপরাধীদের প্রতি কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সরকার নির্দেশিত বিশেষ সামরিক আদালতে বিচার এবং পরবর্তীকালে রুল ৩১ অনুযায়ী যে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হয় তাতে মোট ৫৬১ জন বিমানসেনাকে প্রাণ হারাতে হয়েছিল। যা এই ক্ষুদ্র বিমানবাহিনীর জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। এই বিচারে বেশ কিছুসংখ্যক এমওডিসিও বিভিন্ন দন্ডে দ‌ন্ডিত হয়। এদিনের ঘটনা সারা দেশের সশস্ত্র বাহিনী ও বিমানবাহিনীর জন্য “কালো দিন” ছিল বলে পুস্তিকায় উল্লেখ করা হয়। অভ্যুত্থানে জড়িত থাকার অভিযোগে ফাঁসি হওয়া অনেক পরিবারের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায় যে, ফাঁসি হওয়া অনেকেই ঘটনার সময়ে ছুটিতে বাসায় অবস্থান করছিলেন। পরবর্তীতে তাদেরকে জড়ানো হয়। ফাঁসি দেয়া কোন ব্যাক্তিরই আত্মীয়-স্বজনের কাছে ফাঁসির বিষয়টি স্বীকার করা হয়নি। সম্ভবত ফাঁসি হওয়া একজন বিমান সৈনিক করপোরেল (corporal) আবদুল ওয়াদুদ B/D 440094 B.A.F Base Kurmitola -এর আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, “অভ্যুত্থানের তিন হতে চার মাস পরে অফিস থেকে লোকজন এসে জনাব ওয়াদুদের ব্যবহৃত কিছু জিনিসপত্র দিয়ে যায় এবং বলে যায়, অভ্যুত্থানের পর থেকে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।” পরিবারের লোকজন অফিশিয়াল সহকর্মী, সহ-অবস্থানকারী ও বন্ধু-বান্ধবের মাধ্যমে জানতে পারে যে, অভ্যুত্থানের পর প্রায় প্রতিদিন রাতেই বিমানবাহিনীর মেস থেকে বিমানসেনা এবং অফিসারদেরকে চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে যাওয়া হতো। তারা আর ফিরে আসত না। এ রকমই এক রাতে হামলা চালানো হলে মেসের সকলে বাতি নিভিয়ে খাটের নিচে যেয়ে লুকিয়ে পড়ে। শরীর অসুস্থ থাকায় খাটের ওপর সৈনিক ওয়াদুদ শুয়ে থাকেন। শায়িত অবস্থা থেকেই তাকে তুলে চোখ বেঁধে নেয়া হয়। তিনি আর ফিরে আসেননি। তারা আজও তার খোঁজ পাননি। এভাবেই ফাঁসির প্রায় সকল অফিসার, সৈনিক নিখোঁজ হয়ে যায় এবং আর ফিরে আসেনি। এদের আত্মীয়-স্বজন আজও এদের খবর পায়নি। তারা তাদের লাশ দেখাতো পরের ব্যাপার, তাদের মৃত্যু সংবাদটিও সরাসরি নিশ্চিত হতে পারেনি। অথচ এরা ছিল দেশমাতৃকার এক একজন গর্বিত সৈনিক। এ ঘটনার পরে প্রাণের ভয়ে শত শত বিমান সৈনিক এবং কিছুসংখ্যক বিমান অফিসারও বিমানবাহিনীর চাকরি ছেড়ে দেন। বিমানবাহিনীর একজন সাবেক প্রধান থেকে জানা যায়, তিনি বিমানবাহিনীর প্রধান থাকা অবস্থায় এ সকল হতভাগ্য সৈনিক, অফিসারের নামের তালিকা তৈরি করান। এদের নামের তালিকা তৈরি করলেও তিনি পরিবারগুলোকে তাদের মৃত্যুর সংবাদ জানাতে পারেননি। আর এভাবেই চাপা পড়ে যায় এত মৃত্যু এবং লাশের খবর। ব্রিটিশ সাংবাদিক এন্থনি ম্যাসকারেনহাসের “এ লিগেসি অব ব্ল্যাড” বইয়ে সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় এ মৃত্যুর খবর। এত মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হলেও এন্থনি ম্যাসকারেনহাস তার বইতে এই সকল মৃত্যু, মৃত্যু পরবর্তী অবস্থা, মৃত্যুস্থান সম্পর্কে কিছুই জানাননি। পরবর্তীতে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ইতিহাস লিখতে গিয়ে বিমানবাহিনী হতে প্রকাশিত “বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ইতিহাস”-শীর্ষক পুস্তকে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয় এবং এদিনকে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর জন্য একটি “কালো দিন’” হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে জনগণ সর্বদা সঠিক ইতিহাস আশা করে। আশা করে পূর্বে বিভিন্ন সময়ে হঠাৎ করে রাজনৈতিক কারণে গায়েব হয়ে যাওয়া স্বল্প পরিচিত, সকল দলের নেতা-নেত্রীদের খবর জানতে। দেশে দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার কারণেই জনগণ এবং নিখোঁজ হয়ে যাওয়া ব্যাক্তির পরিবারবর্গের এ সরকারের কাছে এই আশা। তারা প্রত্যাশা করে সরকার কিছু করতে না পারুক অন্ততপক্ষে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন করে হলেও স্বল্প পরিচিত ও নিখোঁজ হয়ে যাওয়া এই সকল ব্যাক্তির রহস্য উদঘাটন করবে। তেমনিভাবে ’৭৭ সালে সশস্ত্র বাহিনী হতে হঠাৎ করে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া ব্যাক্তিদের পরিবারবর্গও দীর্ঘ ১৯ বছর পর হলেও তাদের নিখোঁজ ব্যাক্তিদের খবর জানতে চায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে নির্বাচিত এসরকার কি তাদের সেই আশা পূরণ করবে? না, পূর্ববর্তী সরকারগুলোর মতোই ধামাচাপা দিয়ে রাখবে ব্যাপারটি? এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিলে সরকার নিশ্চয়ই গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর সমর্থন ও সহযোগিতা পাবে। আর এটি করা হলে এই সকল অফিসার ও সৈনিকের আত্মীয়-স্বজন বিদ্রোহের সঙ্গে ঐ হতভাগ্যদের জড়িত থাকা বা না থাকার সঠিক ইতিহাস জানতে পারবে। এতে করে কাটবে তাদের মনের কুয়াশা। প্রয়োজনে তারা আইনের আশ্রয়ও নিতে পারবে। বর্তমান সরকার কি এ সৎ উদ্যোগটুকু নেবে? উদঘাটন করবে কি সশস্ত্র বাহিনীতে এ গণহত্যার কারণসমূহ? নাকি পূর্ববর্তী সরকারগুলোর মতোই কুয়াশাচ্ছন্নই রাখবে পুরো ব্যাপারটি?

তথ্যসূত্র
১.আন্ডার গ্রাউন্ড জীবন- রইসউদ্দীন আরিফ
২.এ লিগেসি অব ব্ল্যাড- এন্থনি ম্যাসকারেনহাস
৩.বর্ষপূর্তি সংখ্যা ’৯৩ -দৈনিক বাংলা

সংসদে কোরাম সংকটে ক্ষতি ২২ কোটি টাকা,সদস্যদের ৬১ ভাগ ব্যবসায়ী, মাত্র ৫ ভাগ রাজনীতিক ; টিআইবির রিপোর্ট

0

সংসদ সদস্যদের মধ্যে শতকরা ৬১ ভাগই ব্যবসায়ী, পেশায় রাজনীতিক আছেন মাত্র ৫ ভাগ। রাজনীতিকদের মধ্যে সংসদ সদস্যের হার ক্রমান্বয়ে কমছে। সে স্থান দখল করছেন ব্যবসায়ীরা। আর সংসদের প্রথম বছরের পাঁচ অধিবেশনে কোরাম সংকটে যে সময় ব্যয় হয়েছে, তার অর্থমূল্য ২২ কোটি টাকার বেশি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল- টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদন পার্লামেন্ট ওয়াচে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বুধবার এক ওয়েবিনারে এটি উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম পাঁচটি অধিবেশনে মোট কার্যদিবস ছিল ৬১টি। প্রতিদিন গড়ে ১৯ মিনিট ছিল কোরাম সংকট। মোট কোরাম সংকট ছিল ১৯ ঘণ্টা ২৬মিনিট। কোরাম সংকটের এই সময়ের আর্থিক মূল্য ২২ কোটি ২৮ লাখ ৬৩ হাজার ৬২৭টাকা।
টিআইবির প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, প্রতিটি বিল পাসে গড়ে সময় লেগেছে ৩২ মিনিট। গত সংসদে বিল পাসে গড়ে সময় লেগেছিল ৩১ মিনিট। তবে বিল পাস প্রক্রিয়ায় সংসদ সদস্যদের অনাগ্রহ ছিল লক্ষণীয়। একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম বছরে সংসদ বর্জনের ঘটনা ঘটেনি। ঘটেনি বিরোধী দলের ওয়াকআউটের ঘটনা। এই সময়ে সংসদীয় কমিটিগুলোকে খুব একটা কার্যকর দেখা যায়নি।
টিআইবি বলছে, পরিসংখ্যান যাই বলুক না কেন, বর্তমান জাতীয় সংসদ নিয়ম রক্ষার সংসদে পরিণত হয়েছে। এখানে পরিসংখ্যানগত তথ্য তুলনাযোগ্য নয়।

প্রতিবেদনটি উপস্থাপনের পর টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জমান বলেন, অষ্টম ও নবম সংসদে সমস্যার মূল যে জায়গা সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি অগ্রহণযোগ্য ছিল। সেটি বন্ধ হয়েছে চড়া দামে। এত বেশি চড়া দামে যে মাথা ব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার মতো হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ‘প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত নির্বাচনের সংস্কৃতি আমাদের দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। শান্তিপূর্ণ এবং স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা রদবদলের সম্ভাবনা দূরীভূত হয়েছে। তারই প্রভাব আমরা দেখতে পাচ্ছি জাতীয় সংসদের মধ্যে। এরই ধারাবাহিকতায় একাদশ জাতীয় সংসদে একদলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা সৃষ্টি হয়েছে। যার ফলে সংসদীয় কার্যক্রমে একচ্ছত্র ক্ষমতার সুযোগ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। ফলে সংসদের মৌলিক দায়িত্ব আইন প্রণয়ন, সরকারের জবাবদিহি এবং জন প্রতিনিধিত্ব এই তিনটি ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ভূমিকা আমরা দেখতে পারছি না।’
এক প্রশ্নের জবাবে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কার্যকর বিরোধী দলের অনুপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। বিরোধী দল থাকলে সংসদ বর্জন করে, সেই সংস্কৃতি আমাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য ছিল। বর্জন বন্ধ হয়েছে। কারণ কার্যকর বিরোধী দল বলতে যা বোঝায় সেটি আমাদের কাছে নেই। এবারে সংসদে যাদের প্রধান বিরোধী দল বলা হয়েছে বা উপস্থাপন করা হয়েছে তারা কিন্তু বিরোধী দলে বসবেন সেই প্রত্যাশা নিয়ে নির্বাচন করেন নাই। তারা ক্ষমতাসীন জোটের অংশ হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। কিন্তু তাদের বসানো হয়েছে বা বসেছেন এমন একটি ভূমিকায় যেটার জন্য তারা প্রস্তুত ছিলেন না। বাস্তবে প্রধান বিরোধী দল বলতে যা বোঝায় সেটি কিন্তু অনুপস্থিত।
টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়, একাদশ জাতীয় সংসদের সদস্যদের মধ্যে ৬১% ব্যবসায়ী, পেশায় রাজনীতিক আছেন মাত্র ৫ ভাগ। অন্যদিকে ভারতের লোকসভায় রাজনীতিক আছেন ৩৯ শতাংশ এবং ব্যবসায়ী আছেন ২৩ শতাংশ। দিন দিন দেশের সংসদে ব্যবসায়ী সংখ্যা বাড়ছে।
প্রতিবেদনটিতে টিআইবি পর্যবেক্ষণে বলেছে, ‘প্রশ্নবিদ্ধ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারি দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের ফলে সংসদীয় কার্যক্রমে বিশেষত আইন প্রণয়ন, বাজেট প্রণয়ন এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে একচ্ছত্র ক্ষমতার চর্চা আরও জোরদার হয়েছে। অন্যদিকে নির্বাচনকালীন মহাজোটের একটি দল নিয়ম রক্ষার প্রধান বিরোধী দল হওয়ায় সরকারের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় তাদের জোরালো ভূমিকার ঘাটতি লক্ষ করা গেছে।
একাদশ সংসদে ৬১ শতাংশ এমপি ব্যবসায়ী : টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একাদশ জাতীয় সংসদ সদস্যদের হলফনামায় উল্লিখিত প্রধান পেশা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সর্বোচ্চ শতকরা ৬১ শতাংশ সদস্য ব্যবসায়ী, আইনজীবী প্রায় ১৩ শতাংশ, রাজনীতিক মাত্র ৫ শতাংশ এবং অন্যান্য পেশার সদস্য রয়েছেন ২১ শতাংশ। অন্যান্য পেশার মধ্যে শিক্ষক, চিকিৎসক, কৃষক, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তা, গৃহিনী, পরামর্শক ইত্যাদি পেশা উল্লেখযোগ্য।

আওয়ামী লীগ ও শরিক দলের শতকরা ৫৯ শতাংশ এবং জাতীয় পার্টির শতকরা ৫৬ শতাংশ সদস্য ব্যবসায়ী। অন্যদিকে ভারতের ১৭তম লোকসভায় সংসদ সদস্যদের মধ্যে রাজনীতিক ৩৯%, ব্যবসায়ী, ২৩%, আইনজীবী ৪% এবং অন্যান্য পেশার সদস্য রয়েছেন ৩৮%।

টিআইবি বিগত কয়েকটি সংসদের সদস্যদের প্রধান পেশা বিশ্লেষণ করে বলছে, প্রথম সংসদে আইনজীবীদের শতকরা হার ৩১ শতাংশ ছিল, যা ক্রমাগত হ্রাস পেয়ে একাদশ সংসদে ১৩ শতাংশে পৌঁছেছে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের শতকরা হার প্রথম সংসদে ১৮ শতাংশ ছিল, যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে একাদশ সংসদে ৬১ শতাংশে পৌঁছেছে।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা বদলের সম্ভাবনা দূরীভূত : দেশে শান্তিপূর্ণ এবং স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা রদবদলের সম্ভানা দূরীভূত হয়েছে বলে টিআইবির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংসদকে ‘কার্যকর’ করতে টিআইবি বেশকিছু সুপারিশ করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-

১. জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাস্তবিক অর্থে অংশগ্রহণমূলক, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হতে হবে।

২. সদস্যদের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের জন্য সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করতে হবে, যেখানে স্বীয় দলের বিরুদ্ধে অনাস্থার ভোট এবং বাজেট ব্যতীত অন্য সব ক্ষেত্রে সদস্যদের নিজ বিবেচনা অনুযায়ী ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকবে।

৩. সংসদ সদস্যদের জন্য আচরণ আইন প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে সংসদ সদস্যদের সংসদের ভেতরে এবং বাইরের আচরণ ও কার্যক্রম সম্পর্কে আন্তর্জাতিক চর্চা অনুসারে নির্দেশনা থাকবে।

৪. সংসদীয় কার্যক্রম এমন হবে যেখানে সরকারি দলের একচ্ছত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার পরিবর্তে কার্যকর বিরোধী দলের অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত হবে।

জাহালমকে ১৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে ব্র্যাক ব্যাংককে হাইকোর্টের নির্দেশ, দুদকের প্রতি একগুচ্ছ পর্যবেক্ষণ

0

আসামি না হয়েও ঋণ জালিয়াতির মামলায় তিন বছর জেল খাটার ঘটনায় পাটকলকর্মী জাহালমকে ১৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে ব্র্যাক ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট।
বিচারপতি এফ আর নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের ভার্চুয়াল হাই কোর্ট বেঞ্চ বুধবার এই রায় দেয়।
ব্র্যাক ব্যাংককে বলা হয়েছে, রায়ের কপি পাওয়ার এক মাসের মধ্যে জাহালমকে ওই ১৫ লাখ টাকা দিতে হবে। আর টাকা দেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের দপ্তরে হলফনামা আকারে বাস্তবায়ন প্রতিবেদন দিতে হবে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
সোনালী ব্যাংকের সাড়ে ১৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০১২ সালের এপ্রিলে ৩৩টি মামলা করে দুদক। দুদক তদন্ত করে বলে, জালিয়াত চক্র সোনালী ব্যাংকের ক্যান্টনমেন্ট শাখায় আবু সালেকসহ তিনজনের হিসাব থেকে ১০৬টি চেক ইস্যু করে। চেকগুলো ১৮টি ব্যাংকের ১৩টি হিসাবে ক্লিয়ারিংয়ের মাধ্যমে জমা করে ১৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়। ওই ১৮টি ব্যাংকের মধ্যে একটি হল ব্র্যাক ব্যাংক।
কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তাদের ভুলে সালেকের বদলে গ্রেপ্তার করা হয় টাঙ্গাইলের জাহালমকে। তাকে ‘আবু সালেক’ হিসেবে শনাক্ত করেছিলেন ব্র্যাক ব্যাংকের দুই কর্মকর্তা। সে কারণে ব্র্যাক ব্যাংককে এই জরিমানা দিতে বলা হয়েছে।
আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছে, “এ ঘটনায় জাহালমের কোনো দোষ ছিল না। তবু তার জীবনের তিনটি বছর জেলে কাটাতে হয়েছে। এর ফলে তাকে তার পেশা হারাতে হয়েছে। এতে জাহালমের ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি ক্ষতিপূরণ পাওয়ার দাবি রাখেন। তিনি ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারী।”

এ ঘটনায় সোনালী ব্যাংক কোনো নথিতে জাহালমের নাম উল্লেখ করেনি বা জাহালমকে শনাক্তও করেনি। ফলে এ ঘটনায় সোনালী ব্যাংকের কোনো দায় খুঁজে পায়নি হাই কোর্ট।

তবে দুদককে হাই কোর্ট সতর্ক করে দিয়ে রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছে, “দুর্নীতি দমন কমিশন দেশের একটি সাংবিধানিক, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংস্থা। দুর্নীতি রোধ করাই যাদের প্রধান কাজ। আদালত প্রত্যাশা করে, দুদকের করা মামলায় এভাবে যেন আর কাউকে জেল খাটতে না হয়। জাহালমের এই ঘটনাই যেন হয় শেষ ঘটনা।”

আদালত বলেছে, দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তার ‘অযোগ্যতা, অদক্ষতা, অনভিজ্ঞতা, অবহেলা’ ছিল। এই ধরনের ‘দুর্বল’ কর্মকর্তাদের দিয়ে যেন কোনো তদন্ত করানো না হয়।

“দুদক আইনের আলোকে জাহালমের ঘটনায় দুদককে দায়ী করা না গেলেও, এ ঘটনায় দুদেকের নবীন কর্মকর্তাদের অনভিজ্ঞতা, অদক্ষতা প্রতিয়মান হয়েছে। তবে তাদের অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না।

“গুরুত্বপূর্ণ এমন একটি মামলায় অনভিজ্ঞ, অদক্ষ তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ ছিল দুদকের একটি বড় ভুল। তবে দুদককে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে। আর এক্ষেত্রে তত্ত্বাবধানকারী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যেন দায় না এড়িয়ে যান।”

একটি ‘সাংবিধানিক নিরপেক্ষ স্বাধীন শক্তিশালী সংস্থা’ হিসেবে দুদক জাতির সবার অধিকারকে সংরক্ষণ করে। দুদকের কোনো বিষয় নিয়ে যাতে জনগণের মাঝে কোনো ‘বিভ্রান্তি’ তৈরি না হয়, সবার কাছে যেন দুদকের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন থাকে, সেই তাগিদ এসেছে রায়ে।

জাহালমের ঘটনায় দুদকের যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে, সেসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়ে আদালত বলেছে, “আমরা এ নিয়ে একটি স্বচ্ছ চিত্র দেখতে চাই।”        

আর ব্যাংক ঋণ সংক্রান্ত ৩৩ মামলায় নতুন করে তদন্তের কাজ দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট।

রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জাহালম সাংবাদিকদের বলেন, “আমার জীবনের যে তিনটা বছর চলে গেছে, সেটা তো আর ফিরে পাব না। আমি চাই মহামান্য আদালত যে টাকাটা আমাকে দিতে বলেছেন, সেটা যাতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই পাই। তাহলে ঋণটিন পরিশোধ করে কিছু একটা করে খেতে পারব।”

আসামি না হয়েও তিন বছর জেল খাটতে হয়েছে জাহালমকে ঃ

আইনজীবী অমিত দাস গুপ্ত প্রথম আলোতে প্রকাশিত ‘স্যার, আমি জাহালম, সালেক না’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কামরুল কাদেরের হাই কোর্ট বেঞ্চের নজরে আনলে গত বছর ২৮ জানুয়ারি দুদকের ব্যাখ্যা জানতে কমিশনের চেয়ারম্যানের মনোনীত প্রতিনিধিসহ চারজনকে তলব করে আদালত।

কারাগারে থাকা ‘ভুল’ আসামি জাহালমকে কেন অব্যাহতি দেওয়া হবে না, তাকে মুক্তি দিতে কেন ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে না এবং তাকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না- তা জানতে চেয়ে স্বতঃপ্রণোদিত একটি রুলও জারি করা হয়।

এরপর দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ দুঃখ প্রকাশ করে ভুলের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

আদালতের আদেশে গত বছর ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পান জাহালম।

পাটকল শ্রমিক জাহালমের তিন বছর কারাগারে থাকার ঘটনায় তদন্ত কর্মকর্তাদের গাফিলতি ছিল কি না- তা খতিয়ে দেখতে একটি কমিটি করে দুদক।

তবে হাই কোর্টে দুদকের পক্ষ থেকে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংকের ওপর দায় চাপিয়ে বলা হয়, ব্যাংকগুলোর অনুসন্ধান প্রতিবেদনের তথ্য-উপাত্তের উপর ভিত্তি করেই দুদকের তদন্ত কর্মকর্তারা অভিযোগপত্র দিয়েছিলেন।

দুদকের ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট না হয়ে ৩৩টি মামলার প্রাথমিক তথ্য বিবরণী (এফআইআর), অভিযোগপত্র (সিএস)সহ যাবতীয় নথি তলব করে হাই কোর্ট। দুদকের কার্যক্রমে উষ্মা প্রকাশ করে বিচারক বলে, “ইঁদুর ধরতে না পারলে সেই বিড়ালের প্রয়োজন নেই।”

জাহালম কেমন আছেন, কীভাবে জীবনযাপন করছেন- তার মুখ থেকে তা শুনতে তাকে আদালতে নিয়ে আসতে আইনজীবী অমিত দাস গুপ্তকে নির্দেশ দিয়েছিল হাই কোর্টের এই বেঞ্চ। সে অনুযায়ী জাহালম গত বছর ১৭ এপ্রিল আদালতে হাজিরও হয়েছিলেন।

কিন্তু দুদক এক মাসেও নথি দাখিল করতে না পারায় ২ মে শুনানির পরবর্তী তারিখ রেখে ওই সময়ের মধ্যে ৩৩ মামলার নথি ও দুদকের প্রতিবেদন জমা দিতে বলে আদালত। পাশাপাশি আসামি না হয়েও জাহালমের কারাভোগের জন্য কে বা কারা দায়ী তা দেখতে দুদকের কাছে প্রতিবেদন চায় হাই কোর্ট।

ওইদিনই আদালত জানায়, ২ মে দুদক তাদের প্রতিবেদন দিলে তখনই হাই কোর্ট জাহালমের মুখ থেকে তার কথা শুনবে। এরপর দুদক গত ২১ এপ্রিল হাই কোর্টের ওই বেঞ্চের এখতিয়ার চ্যালেঞ্জ করে চেম্বার আদালতে যায়।

দুদকের যুক্তি ছিল, হাই কোর্টে দুদকের মামলা শুনানির জন্য বিশেষ বেঞ্চ রয়েছে। যে বেঞ্চ রুল দিয়েছে, দুদকের মামলা শোনার এখতিয়ার সেই বেঞ্চের নেই। কিন্তু আপিল বিভাগ দুদকের ওই আবেদন খারিজ করে দেয়।

পরে জাহালমের ক্ষতিপূরণ প্রশ্নে জারি করা রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত ১২ ফেব্রুয়ারি আদালত বিষয়টি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে।

আদালতে সোনালী ব্যাংকের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী জাকির হোসেন। ব্র্যাক ব্যাংকের পক্ষে আইনজীবী আনিসুল হাসান। দুদকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী খুরশীদ আলম খান।

আর রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এবিএম আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাসার ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল এম সাইফুল আলম।

রায়ের পর আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার সাংবাদিকদের বলেন, “দুদকের যে ১২ জন তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন শিক্ষানবিশ তদন্তকারী কর্মকর্তা। তাদের অভিজ্ঞতা, দক্ষতার অভাব ছিল। কিন্তু তাদের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে যেসব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন তারা সে দায়িত্ব পালন করেননি। ফলে রায়ে আদালত অসন্তুষ্টি প্রকাশের পাশাপাশি দুদককে সতর্ক করেছেন।”

এই ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, জেনারেল ক্লজ অ্যাক্টের ৩ ধারা, দণ্ডবিধির ৫০ এবং দুদক আইনের ৩১ ধারায় সরকারি কর্মকর্তা বা দায়িত্বশীল কর্মকর্তারারা যদি ‘সরল বিশ্বাসে’ কোনো কাজ করেন, সেটা ‘ভুল হবে না’।

জাহালমকে আবু সালেক হিসেবে শনাক্ত করায় ব্র্যাক ব্যাংকের কর্মকর্তা ফয়সাল কায়েস ও সাবিনা শারমিনের নাম রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার বলেন, “এ দুই কর্মকর্তার মধ্যে তৎপরতা ছিল, উদ্দেশ্য ছিল যে কোনোভাবে হোক আবু সালেকের জায়গায় জাহালমকে শনাক্ত করে তার উপর দায় চাপানো। ফলে ব্র্যাক ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে আদালত দায়ী করেছে।”
দুদক আইনজীবী খুরশীদ আলম খান সাংবাদিকদের বলেন, “দুদকের কাছে দেশ ও জাতি অনেক কিছু প্রত্যাশা করে। আমি আশা করি দুদক ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে আরও সতর্ক হবে এবং আরও ভাল তদন্ত করবে।”

বরগুনার রিফাত হত্যা: স্ত্রী মিন্নিসহ ৬ জনের ফাঁসি ,খালাস চার; ১৪ জনের বিচার হচ্ছে শিশু আদালতে

0

বরগুনার চাঞ্চল্যকর রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় তার স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিসহ ছয় আসামির ফাঁসি এবং বাকি চার আসামি পেয়েছেন বেকসুর খালাস দিয়েছে আদালত।
বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ মো. আছাদুজ্জামান বুধবার দুপুরে চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি ছয় আসামির সবাইকে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।
১৫ মাস আগে পুরো বাংলাদেশকে স্তম্ভিত করে দেওয়া ওই হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ যে ২৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছিল, তাদের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক ১০ জনের বিচার চলে এ আদালতে।

মামলার ১ নম্বর আসামি রাকিবুল হাসান ওরফে রিফাত ফরাজী (২৩) বরগুনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের ভায়রার ছেলে। সিসি ক্যামেরার ভিডিওতে যে তিনজনকে রাম দা হাতে রিফাতকে কোপাতে দেখা গিয়েছিল, তাদের মধ্যে রিফাত ফরাজী একজন। আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। 

আসামি আল কাইয়ুম ওরফে রাব্বি আঁকন (২১), মোহাইমিনুল ইসলাম সিফাত (১৯), রেজোয়ান আলী খান হৃদয় ওরফে টিকটক হৃদয় (২২) এবং মো. হাসানকেও (১৯) একই সাজা দিয়ে আদালত বলেছে, হত্যাকাণ্ডের সময় তারা চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছিল। হত্যাকাণ্ডে তাদের সহযোগিতার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে।

রিফাতের স্ত্রী বরগুনার সরকারি কলেজের ডিগ্রি প্রথম বর্ষের ছাত্রী মিন্নিকে হামলার মুখে স্বামীকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে দেখা গিয়েছিল ভিডিওতে। তিনি ছিলেন মামলার এজাহারের এক নম্বর সাক্ষী। কিন্তু তদন্তের পর পুলিশ মামলার অভিযোগপত্রে মিন্নির নাম যুক্ত করে আসামির তালিকায়।
রায়ে আদালত বলেছে, মিন্নিও যে তার স্বামীকে হত্যার ‘ষড়যন্ত্রে’ যুক্ত ছিলেন, প্রসিকিউশন তা ‘প্রমাণ করতে পেরেছে’।
হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত অভিযোগপত্রের চার আসামি মুসা (২২), রাফিউল ইসলাম রাব্বি (২০), সাগর (১৯) ও কামরুল হাসান সায়মুনকে (২১) খালাস দিয়েছে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
এই দশজনের মধ্যে মুসা পলাতক রয়েছেন। জামিনে থাকা মিন্নি রায়ের সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন। কারাগারে থাকা বাকি আসামিদেরও রায়ের সময় আদালতে হাজির করা হয়।
রায়ের জন্য সকাল ৯টার আগেই বাবা মোজাম্মেল হক কিশোরের মোটরসাইকেলে করে আদালতে উপস্থিত হয়েছিলেন জামিনে থাকা মিন্নি। রায়ের আগে বাবাকে বলছিলেন, খালাস পাবেন বলেই তার বিশ্বাস।
কিন্তু রায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর মিন্নিকে কালো রঙের একটি মাইক্রোবাসে করে আদালত থেকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হবে। দণ্ডিত বাকি আসামিদের প্রিজন ভ্যানে করে কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হক কিশোর আদালতে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা ন্যায়বিচার পাইনি। আমার মেয়ে ষড়যন্ত্রের শিকার। আমরা আপিল করব।”
মিন্নির আইনজীবী মাহবুবুল বারী আসলামও আপিল করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে বলেন, “আমরা বলেছিলাম, রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা এই রায়ে সংক্ষুব্ধ।”

দণ্ডিত মোহাইমিনুল ইসলাম সিফাতের বাবা দেলোয়ার হোসেন দাবি করেন, তার ছেলে জটলার মধ্যে ঘটনা দেখতে গিয়েছিল, হত্যাকাণ্ডে ‘ছিল না’। তিনি এই রায়ে বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাবেন।
অন্যদিকে মামলার বাদী রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “মিন্নিসহ ছয় আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি হয়েছে। আমরা এই রায়ে সন্তুষ্ট।”
এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ভূবন চন্দ্র হাওলাদার বলেন, “সাক্ষ্য প্রমাণে আমরা অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি বলেই আদালত ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন।”

কী ঘটেছিলঃ
গত বছর ২৬ জুন ভরদুপুরে বরগুনা জেলা শহরের কলেজ রোডে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় রিফাতকে। ওই ঘটনার একটি রোমহর্ষক ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে শুরু হয় আলোচনা।
সেই ভিডিওতে দেখা যায়, দুই যুবক রামদা হাতে রিফাতকে একের পর এক আঘাত করে চলেছে। আর তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি স্বামীকে বাঁচানোর জন্য হামলাকারীদের ঠেকানোর চেষ্টা করছেন।

বরগুনার সরকারি কলেজের ডিগ্রি প্রথম বর্ষের ছাত্রী মিন্নি হামলাকারী সবাইকে চিনতে না পারার কথা জানালেও নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজীর নাম বলেন।
ওই ঘটনায় রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনকে আসামি করে বরগুনা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় রিফাতের স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে ১ নম্বর সাক্ষী করা হয়।

রিফাত হত্যার ঘটনা বরগুনা শহরে ‘কিশোর গ্যাংয়ের’ দৌরাত্মের বিষয়টি প্রকাশ্যে আনে। এইসব কিশোর তরুণের পেছনে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার খবর গণমাধ্যমে এলে হত্যার কারণ নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলতে থাকে।  

এর মধ্যেই ২ জুলাই মামলার প্রধান সন্দেহভাজন সাব্বির আহম্মেদ ওরফে নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।

এদিকে মিন্নির শ্বশুরই পরে হত্যাকাণ্ডে পুত্রবধূর জড়িত থাকার অভিযোগ তুললে আলোচনা নতুন মোড় নেয়। ১৬ জুলাই মিন্নিকে বরগুনার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে দিনভর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে সেদিন রাতে তাকে রিফাত হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
পরদিন আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাকে পাঁচদিনের রিমান্ডে পাঠান। পাঁচ দিনের রিমান্ডের তৃতীয় দিনেই মিন্নিকে আদালতে হাজির করা হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, ওই তরুণী হাকিমের কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

তবে মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর অভিযোগ করেন, ‘নির্যাতন করে ও ভয়ভীতি দেখিয়ে’ মিন্নিকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেছে পুলিশ। এর পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের হাত আছে বলেও তিনি সে সময় দাবি করেন। পরে ২৯ অগাস্ট হাই কোর্ট মিন্নির জামিন মঞ্জুর করে।

হত্যাকাণ্ডের দুই মাসের মাথায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মো. হুমায়ুন কবির বরগুনার আদালতে মিন্নিসহ ২৪ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

এজাহারের ১ নম্বর আসামি সাব্বির আহম্মেদ ওরফে নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ায় তার নাম অভিযোগপত্রে আসামির তালিকায় রাখা হয়নি।
দুই খণ্ডে বিভক্ত ওই অভিযোগপত্রের এক অংশে মোট ১০ জনকে আসামি করা হয়। অন্য অংশে রাখা হয় অপ্রাপ্তবয়স্ক ১৪ জনের নাম। 
বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ মো. আছাদুজ্জামান চলতি বছরের প্রথম দিন রিফাতের স্ত্রী মিন্নিসহ প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন।
সে অনুযায়ী ৮ জানুয়ারি শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। ৭৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণের পর যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে মামলাটি রায়ের পর্যায়ে আসে।
আর বরগুনার শিশু আদালতের বিচারক মো. হাফিজুর রহমান ৮ জানুয়ারি অপ্রাপ্তবয়স্ক ১৪ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় ১৩ জানুয়ারি।

প্রতারক সাহেদের অস্ত্র মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, তার মত ‘ধুরন্ধরদের’ জন্য বার্তা: বলা হলো রায়ে

0

রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমকে অস্ত্র আইনের মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

ঢাকার মহানগর ১ নম্বর বিশেষ ট্রাইবুনালের বিচারক কে এম ইমরুল কায়েশ সোমবার এ মামলার রায় ঘোষণা করেন।
সাহেদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া কয়েক ডজন মামলার মধ্যে উত্তরা পশ্চিম থানার এই অস্ত্র আইনের মামলারই প্রথম রায় ঘোষণা করা হলো।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, “আমাদের এই সমাজে সাহেদের মতো ভদ্রবেশে অনেক লোক রয়েছে, যাদের জন্য এই মামলার রায় একটি বার্তা হিসেবে কাজ করবে।”

অস্ত্র আইনের ১৯ (এ) ধারায় সাহেদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড , যা এ আইনের সর্বোচ্চ সাজা। পাশাপাশি আরেকটি ধারায় সাহেদকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে রায়ে। তবে দুই ধারার সাজা একসঙ্গে কার্যকর হবে বলে তার ক্ষেত্রে যাবজ্জীবনই প্রযোজ্য হবে।

গত ১৫ জুলাই ভোরে সাতক্ষীরার দেবহাটা সীমান্ত থেকে সাহেদকে গ্রেপ্তার করার পর তাকে রিমান্ডে নেয় গোয়েন্দা পুলিশ। রিমান্ডের মধ্যেই ১৮ জুলাই রাতে তাকে নিয়ে উত্তরায় অভিযান চালিয়ে তার একটি গাড়ি থেকে গুলিসহ একটি পিস্তল এবং কিছু মাদক জব্দ করা হয়।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, “সাহেদ ২০ লাখ টাকা লোন নিয়ে গাড়িটি ক্রয় করেন। কিন্তু তিনি আদালতের কাছে স্বীকার করেননি। সাহেদ আদালতের কাছে মিথ্যা তথ্য দেন। তিনি অত্যন্ত চালাক ও ধুরন্ধর ব্যক্তি। গাড়িতে অস্ত্র রাখার বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় আদালতের কাছে তিনি কোনো অনুকম্পা পেতে পারেন না।”

এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী আবদুল্লাহ আবু রায়ের পর বলেন, “যে গাড়ি থেকে অস্ত্রটি উদ্ধার করা হয়েছে, তার মালিকানা যাচাই করে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে রায়ে । সাহেদ যে অপরাধী তা মামলার রায়ে প্রমাণিত হয়েছে। এ রায় সমাজে দৃষ্টান্ত হিসেবে থাকবে।”

এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মো. সাইরুল ইসলাম গত ৩০ জুলাই ঢাকার মহানগর হাকিম আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়ার পর ২৭ অগাস্ট অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরু করে আদালত। অভিযোগ গঠন থেকে মাত্র আট কার্যদিবসে এ মামলা রায়ের পর্যায়ে আসে।

বাংলাদেশে এত কম সময়ে এর আগে আর কোনো ফৌজদারি মামলার রায় হয়নি বলে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি আবদুল্লাহ আবু জানান।
সে প্রসঙ্গ টেনে সাহেদের আইনজীবী মো. মনিরুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, “মাত্র ৮ কার্যদিবসে মামলা শেষ হয়ে গেল। তাড়াহুড়ো বেশি হয়ে গেল। ন্যায়বিচার পেলাম না । রায়ের বিরুদ্ধে আমরা উচ্চ আদালতে যাব।”
এমএলএম ব্যবসা থেকে শুরু করে নানারকম জালিয়াতি-প্রতারণার মামলার খবর ঢেকে রেখে নিয়মিত গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে ভিভিআইপিদের মাঝে হাজির হতেন রিজেন্ট চেয়ারম্যান সাহেদ।

সরকারের মন্ত্রী, এমপি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা এবং সরকারি আমলাসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে তোলা অসংখ্য সেলফি ফেইসবুকে দিয়ে নিজেকেও তিনি ‘গুরুত্বপূর্ণ’ দেখাতে চাইতেন।
করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে চিকিৎসার নামে প্রতারণা এবং জালিয়াতির মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের কথা বেরিয়ে আসতে থাকে।