যে কোনো মেয়াদের কারাদণ্ডের ক্ষেত্রে হাজতবাসের সময় বাদ দিয়ে দোষী ব্যক্তির সাজার মেয়াদ হিসাব করার যে বিধান ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫ক ধারায় আছে, তা যথাযথ বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত।
ওই ধারা অনুযায়ী, অভিযুক্ত কোনো ব্যক্তি দণ্ডিত হওয়ার আগে থেকে যদি হাজতে থাকেন, তবে বিচারিক আদালত তাকে দণ্ড দেয়ার সময় হাজতবাসের সময়টুকু বাদ দিয়ে কারাভোগের মেয়াদ গণনা করবেন।
আর হাজতবাসের মেয়াদ যদি দণ্ডের মেয়াদকে এর মধ্যেই ছাড়িয়ে যায়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে কারাগার থেকে মুক্তি দিতে হবে।
এ ধারাটির যথাযথ বাস্তবায়নে কারা মহাপরিদর্শককে দেশের প্রত্যেক কারাগারে নির্দেশনা জারি করতে বলা হয়েছে।
৩৪ বছর ৬ মাস ধরে কারাগারে থাকা যাবজ্জীবনে দণ্ডিত ব্যক্তির হাই কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ-টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) খারিজ করে সোমবার এ রায় দিয়েছে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির আপিল বেঞ্চ।
আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল। তার সঙ্গে ছিলেন মোহাম্মদ রায়হান চৌধুরী। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিৎ দেবনাথ।
আইনজীবী গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল সাংবাদিকদের বলেন, জোড়া খুনের মামলায় নাটোরের ইউনুছ আলী হাই কোর্টের রায়ে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত। জেলকোড অনুযায়ী ৯ মাসে বছর; যাবজ্জীবন মানে ৩০ বছর। এ মামলায় আত্মসমর্পণ করতে গিয়ে ১৯৯৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর ইউনুছ আলী গ্রেফতার হন। এরপর থেকে তিনি কারাগারে। অর্থাৎ প্রায় ২৫ বছর ধরে তিনি কারাগারে আছেন। আর জেলকোড অনুযায়ী ৩৪ বছরের উপরে।
“মানে হল, ইউনুছ আলী যাবজ্জীবন সাজা খেটে চার বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে আছেন। যে কারণে আপিল বিভাগ ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫-ক ধারার যথাযথ বাস্তবায়ন বা অনুসরণের জন্য এ নির্দেশনা দিয়েছে।”
তবে ইউনুছ আলীর মুক্তির বিষয়ে আদেশে কিছু বলা হয়নি। এ বিষয়ে আইনজীবীদের কাছ থেকেও সরাসরি কোনো ভাষ্য পাওয়া যায়নি।
মেশিনে ধান ভাঙানোর সময় মামুলি বিষয়কে কেন্দ্র করে ঝগড়া ও হাতাহাতির পর ১৯৯৫ সালের ১১ নভেম্বর খুন হন নাটোরের আব্দুল আজিজ ও আব্দুল গফুর খুন হন। এ ঘটনায় আজিজের বাবা আব্দুর রহমান বাদি হয়ে নাটোর সদর থানায় ৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও ১০-১২ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
এ মামলায় ২০০২ সালে ১৭ নভেম্বর নাটোরের বিচারিক আদলত ১০ আসামির মধ্যে দুজনকে মৃত্যুদণ্ড ও ৮ আসামিকে যাবজ্জীবন দেয়। বিচারিক আদালতের মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া দুই জনের মধ্যে ইউনুছ আলী একজন।
এ রায়ের বিরুদ্ধে ইউনুছ আলী হাই কোর্টে আপিল করেন। ২০০৫ সালে হাই কোর্টের রায়ে ইউনুছ আলীর যাবজ্জীবন হয়। হাই কোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে আর আপিল করেননি ইউনুছ আলী।
দেরির জন্য মার্জনার ও জামিনের আবেদনসহ হাই কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ-টু আপিল করেন যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করে ফেলা এ ব্যক্তি। সোমবার ইউনুছ আলীর এ লিভ-টু আপিলে পর্যবেক্ষণে দিয়ে খারিজ করে দিল সর্বোচ্চ আদালত। বিডি নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
সাজার মেয়াদ থেকে হাজতবাস বাদ দেয়ার বিধান কার্যকরের নির্দেশ সুপ্রিমকোর্টের
ই-কমার্স: ৩ গোয়েন্দা সংস্থা ২৮ কোম্পানির নাম দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে
ই-কমার্স ব্যবসায় নেমে বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে পড়া অন্তত ২৮টি কোম্পানির নাম সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কমিটিতে হস্তান্তর করেছে তিনটি গোয়েন্দা সংস্থা।
আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এসব কোম্পানির লেনদেনের হিসাবও হাতে পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও কমিটির সমন্বয়ক এএইচএম সফিকুজ্জামান।
সোমবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ১৫ সদস্যের ওই কমিটি দ্বিতীয় সভা হয়। সভা শেষে সফিকুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, “তিনটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে পৃথক তালিকা পেয়েছে কমিটি। একটি তালিকায় ১৯টি, আরেকটিতে ১৭টি এবং অন্যটিতে ১৩টি কোম্পানির নাম রয়েছে।
“তবে সর্বোচ্চ সংখ্যাটি ১৯ এর চেয়েও বেশি। কারণ ১৭ ও ১৯টি প্রতিষ্ঠানের তালিকার মধ্যে কমন রয়েছে আটটি। এগুলো সমন্বয় করে ফিন্যান্সিয়ল ইন্টিলিজিন্স ইউনিটের কাছে দেয়া হবে। তারা এই তালিকা ধরে এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের খোঁজ নেবে।”
আগামী ৯ নভেম্বর কমিটির আরেকটি বৈঠক হবে জানিয়ে সফিকুজ্জামান বলেন, “সেই মিটিংয়ে এই তালিকার কোম্পানিগুলোর আর্থিক লেনদেনের হিসাব উত্থাপন করা হবে। মিটিংয়ে তথ্যগুলো যাচাই বাছাই করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে উত্থাপন করব।”
বৈঠকে ইউবিআইডি (ইউনিক বিজনেস আইডিন্টিফিকেশন ) ও এসক্রো সার্ভিস অটোমেশন নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান কমিটির সমন্বয়ক। তিনি বলেন, “এটুআইকে কিছু বিষয়ে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সেটা হচ্ছে ইউনিক বিজনেস আইডি। একটা কমিটি এটা ফাইনাল করেছে। প্রাথমিক অনুমোদনও পেয়েছে এই মডেলটি। অ্যানালগ ফরমেট থেকে এটুআই এটাকে ডিজিটাল ফরমেটে করে দেবে।
“খুব দ্রুতই ইউনিক বিজনেস আইডি চালু করা হবে। যারা ই-কমার্সে বিজনেস করবে, তাদেরকে বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। কাজটি হবে অনলাইনে। আমরা এই প্রক্রিয়াটিকে খুব সহজ করেছি। যাতে করে ইউনিক বিজনেস আইডি চালু করতে গিয়ে কোনো ব্যবসা মুখ থুবড়ে না পড়ে।”
এসক্রো সার্ভিস অটোমেশন করার জন্যও এটুআই থেকে সহযোগিতা নেয়ার কথা জানিয়ে সফিকুজ্জামান বলেন, এ কাজের জন্য একটি অ্যাপ তৈরি করা হচ্ছে।
গোয়েন্দাদের ফাইলে কোন কোন ই কমার্স কোম্পানির নাম আছে তা প্রকাশ করেনি মন্ত্রণালয়। তবে গোয়েন্দা সংস্থার অনুমেদান পেলে এসক্রো সার্ভিসে আটকে থাকা গ্রাহকদের ২১৪ কোটি টাকা ফেরত দেওয়া শুরু হবে বলে বৈঠক থেকে জানান হয়।
সফিকুজ্জামান বলেন, “এটা সিআইডি ফ্রিজ করে রেখেছে। তাদের ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পরই টাকা বিতরণ শুরু করা যাবে। এখানে হয়ত সার্ভিস চার্জ বাবদ ১ শতাংশ টাকা কাটা হতে পারে। টাকাটা যেহেতু অনলাইনে দেয়া হয়েছে, সেহেতু এটা অনলাইনেই ফেরত যাবে।”
দেশে ই কমার্সের ব্যবসা বেশ কয়েক বছর ধরেই বাড়ছিল, এর মধ্যে মহামারী শুরু হলে নতুন নতুন বেশ কিছু কোম্পানি রাতারাতি ফুলে ফেঁপে উঠতে শুরু করে।
বাজারমূল্যের চেয়ে অর্ধেক দামে পণ্য বিক্রির প্রলোভন দেখিয়ে এসব কোম্পানি লাখ লাখ গ্রাহকের হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে এখন।
অনেকে অর্ধেক দামে পণ্য কিনে পরে বেশি দামে বিক্রির আশায় এসব কোম্পানিতে লাখ লাখ টাকার অর্ডার করেছেন। কিন্তু তাদের অনেকে মাসের পর মাস অপেক্ষা করেও পণ্য বুঝে পাননি, কোম্পানি তাদের টাকাও ফেরত দিচ্ছে না।
এসব ঘটনায় ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জসহ বিভিন্ন কোম্পানির বিরুদ্ধে বেশ কিছু মামলা হয়েছে সম্প্রতি। কিন্তু অগ্রিম টাকা দিয়ে পণ্য না পাওয়া গ্রাহকরা রয়েছেন অনিশ্চয়তায়।
এ পরিস্থিতিতে ই-কমার্স খাতের সংস্কার ও সমন্বয়ের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তদারকির মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ভোক্তাদের সুরক্ষায় গত ১২ অক্টোবর উচ্চ পর্যায়ের এই কমিটি করে সরকার।
সফিকুজ্জামানকে সভাপতি করে গঠিত এই কমিটিকে এক মাসের মধ্যে সাতটি বিষয়ে সুপারিশ করতে বলা হয়।
সফিকুজ্জামান বলেন, কোন কোম্পানির অনিয়ম কতটা, বিএফআইইউর প্রতিবেদন পাওয়ার পর তারা সে বিষয়ে বলতে পারবেন।
বিএফআইইউর জেনারেল ম্যানেজার শওকতুল আলম বলেন, “সন্দেহজনক লেনদেনের বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে কিছু ক্রাইটেরিয়া দেয়া আছে। সেগুলোর ভিত্তিতে তারা মনিটরিং করে। তারা কোনো আনইউজুয়াল ট্রানজেকশন দেখলে বিএফআইইউকে রিপোর্ট করে। পরে আমরা আরও তথ্য যাচাই করে সেই প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিই।
“এছাড়া পত্রপত্রিকার প্রতিবেদনও গুরুত্ব সহকারে মূল্যায়ন করে বিএফআইইউ। কেউ ব্যক্তিগতভাবে অভিযোগ করলে সেটাও আমরা বিবেচনায় নিয়ে থাকি।”
ই-কমার্স গ্রাহকদের টাকা ফেরতে নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ নয় জানতে হাইকোর্টের রুল
ই-কমার্স গ্রাহকদের টাকা ফেরতে নিষ্ক্রিয়তা কেন অ
মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা দুই প্রতিষ্ঠান ও তিন পেমেন্ট গেটওয়েতে আটকে থাকা ই-কমার্স গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের নিষ্ক্রিয়তা বা ব্যর্থতা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে হাই কোর্ট।
এবিষয়ে এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানির পর বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. কামরুল হোসেন মোল্লার বেঞ্চ সোমবার রুল দেয়।
বাণিজ্য সচিব, বাংলাদেশ ব্যংক, বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্টের ব্যবস্থাপক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা শাখার (ডব্লিটিও) মহাপরিচালক, বিকাশ, নগদ, এসএসএল কমার্স, ফস্টার পেমেন্টস ও সূর্য পের প্রধান নির্বাহীকে চার সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী সাবরিনা জেরিন ও এম. আব্দুল কাইয়ূম লিটন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন নওরোজ মো. রাসেল চৌধুরী।
সাবরিনা পরে সাংবাদিকদের বলেন, “ই-কমার্স ব্যবসায় অনেক গ্রাহক বা ক্রেতা অনলাইনে অর্ডার বা বিনিয়োগ করেছেন। পণ্য না পেলে সেসব গ্রাহকের টাকা ফেরত পাওয়ার কথা। কিন্তু এ টাকাটা ফেরত আসেনি। ফলে গ্রাহকরা টাকা ফেরত পাবেন কিনা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
“এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও যেন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। যে কারণে নির্দেশনা চেয়ে রিট করেছিলাম। শুনানি শেষে আদালত রুল জারি করেছেন।”
গত কয়েক মাস ধরে ই কমার্স প্রতিষ্ঠনে টাকা দিয়ে পণ্য না পাওয়া বা পণ্য দিয়ে দাম না পাওয়ার মাধ্যমে গ্রাহকদের প্রতারিত হওয়ার নতুন নতুন ঘটনা প্রকাশ পাচ্ছে। ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, ধামাকা, কিউকম, আলেশামার্টসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কোটি কোটি টাকার প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে।
এসব ঘটনার মধ্যে ই-কমার্সে কেনাকাটায় গ্রাহক সুরক্ষায় গত জুলাই থেকে এসক্রো সার্ভিস চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এ নিয়মের আওতায় পণ্যের অর্ডার করে গ্রাহকের দেওয়া অগ্রিম টাকা জমা থাকছে পেমেন্ট গেটওয়েতে। গ্রাহক পণ্য বুঝে পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করলেই শুধু সেই টাকা ছাড় করা হচ্ছে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে।
সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, গত জুলাইয়ের পর এসক্রো সার্ভিসে বা পেমেন্ট গেটওয়েতে ২১৪ কোটি টাকা আটকা আছে। কিছু আইনি জটিলতা রয়েছে। সমাধান করে এ টাকা ফেরতে কিছুটা সময় লাগবে।
মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা বিকাশ, নগদ ও পেমেন্ট গেটওয়ে এসএসএল কমার্স, ফস্টার পেমেন্টস ও সূর্য পে- এই পাঁচ প্রতিষ্ঠানে আটকে থাকা টাকা ফেরত দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি নির্দেশনা চেয়ে গত ২১ অক্টোবর কনশাস কনজ্যুমার্স সোসাইটির (সিসিএস) পক্ষে হাই কোর্টে আবেদন করা হয়।
এর আগে গ্রাহকদের আটকে থাকা টাকা ফেরাতে গত ১৭ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সাত প্রতিষ্ঠানকে আইনি নোটিস পাঠানো হয়েছিল।
খালেদা জিয়ার বায়োপসি রিপোর্টে কি আছে জানা যাচ্ছে না
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বায়োপসি রিপোর্ট এসেছে। সেই অনুযায়ী তার চিকিৎসা চলছে বলে জানা গেছে।
সোমবার দুপুরে বিএনপির একটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। তবে বায়োপসি রিপোর্টের বিস্তারিত জানা যায়নি।
বেশি কিছুদিন ধরেই নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন খালেদা জিয়া। বর্তমানে তিনি রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি রয়েছেন।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, গত ২৫ অক্টোবর খালেদা জিয়ার শরীরে অস্ত্রোপচার করা হয়। ওই দিন বিএনপি চেয়ারপারসনের ব্যক্তিগত চিকিৎসক এ জেড এম জাহিদ হোসেন গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, ওনার (খালেদা জিয়া) শরীরের এক জায়গায় ছোট একটা লাম্প আছে। এই লাম্পের ন্যাচার অব অরিজিন জানতে হলে বায়োপসি করা প্রয়োজন। সে জন্য ওনার বায়োপসির জন্য অপারেশন করা হয়েছে।
খালেদা জিয়া হাসপাতালে ভর্তির পর তার দেখাশোনার জন্য যুক্তরাজ্য থেকে দেশে এসেছেন প্রয়াত ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সিঁথি রহমান।
বিএনপির একটি সূত্র জানিয়েছে, খালেদা জিয়ার অবস্থা স্থিতিশীল। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী তাকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
এর আগে চলতি বছরের এপ্রিলে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন খালেদা জিয়া। করোনা–পরবর্তী জটিলতা নিয়ে তিনি ৬ মে থেকে প্রায় এক মাস এভারকেয়ার হাসপাতালের সিসিইউতে ভর্তি ছিলেন।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড: তদন্ত কমিশন গঠনে বাধা কোথায়?
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার ৪৬ বছর পর কন্যা শেখ হাসিনার এ বক্তব্যই প্রমাণ করে- বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনের সামরিক শক্তিকে কিঞ্চিৎ চিহ্নিত করা সম্ভব হলেও, রাজনৈতিক শক্তি এবং কুশীলবদের চিহ্নিত করা আজও উদ্ঘাটন করা যায়নি। শুধু তাই নয়, হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত সাবেক সেনা সদস্যদের বিচার হলেও পেছনের ষড়যন্ত্র উদঘাটনে সার্বিক ও সঠিক তদন্ত পর্যন্ত হয়নি।
মামলা কিংবা জিডি- কোনওটাই দায়ের করতে দেয়নি তৎকালীন ক্ষমতাসীনরা। পরে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ওই বছরের অক্টোবরে বঙ্গবন্ধুর পিএ আ ফ ম মহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলাটি করেন। এ কথা সর্বজনবিদিত যে, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড বহুমাত্রিকতায় ভরপুর। এখানে যেমন দেশীয় সামরিক ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ছিল, তেমনি ছিল আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর গভীর ও পরিকল্পিত চক্রান্ত। তৃতীয় বিশ্বের সরকারপ্রধান হলেও বঙ্গবন্ধু শুধু জাতীয় রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি ‘ক্যারিশমাটিক লিডার’। তার মাঝে ছিল বৈশ্বিক নেতৃত্বের আদ্যোপান্ত গুণাবলী। স্বভাবতই তার হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্র সোনার বাংলার বাইরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বিস্তৃত হবে- তা সহজেই অনুমেয়।
মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান এই অভ্যুত্থান পরিকল্পনার সবটাই জানতেন। তিনি উৎসাহ দিয়েছেন; অভিযুক্ত সেনা সদস্যদের আশ্রয়-প্রশ্রয় তো দিয়েছেনই। আবার কোনদিন যেন হত্যাকারীদের আইনের সম্মুখীন হতে না হয়, সে ব্যবস্থাও তিনি করেছিলেন। তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে কিছু সেনা সদস্যের ব্যক্তিগত ক্ষোভ, বঙ্গবন্ধু ও তার দলের ওপর অনাস্থা এবং সমকালীন রাজনীতিকে দায়ী করলেও প্রকৃত কারণ আসলেই কী, কুশীলবরাই বা কারা তা নিয়ে এখন তদন্ত কমিশন গঠনের সময় এসেছে।
বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার হত্যার ঘটনায় প্রথম অনুসন্ধান কমিশন গঠিত হয় ১৯৮০ সালে, যুক্তরাজ্যে। আইন করে বিচারের পথরুদ্ধ করে দেয়ায় শান্তিতে নোবেল পুরস্কারজয়ী ও আয়ারল্যান্ড সরকারের সাবেক মন্ত্রী শন ম্যাকব্রাইড, ব্রিটিশ এমপি ও আইনবিদ জেফরি টমাস এবং ব্রিটিশ আইনবিদ, মানবাধিকারকর্মী ও পরিবেশবাদী আইনবিদ অবরি রোজসহ চার জন মিলে এ কমিশন গঠন করেছিলেন। যদিও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকার অনুসন্ধানের কাজে ওই কমিশনকে বাংলাদেশে ঢুকতে দেয়া তো দূরের কথা, ভিসা পর্যন্ত দেয়নি। পরবর্তীতে (১৯৮২ সালের নভেম্বর) ওই অনুসন্ধান কমিশনের অধীনেই ‘শেখ মুজিব মার্ডার ইনকোয়ারি: প্রিলিমিনারি রিপোর্ট অব দ্য কমিশন অব ইনকোয়ারি’ শিরোনামে একটি বই লন্ডনের র্যাডিক্যাল এশিয়া পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয়; যার মুখবন্ধ লিখেছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘বারবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের সরকার একজন হত্যাকারীকেও বিচারের মুখোমুখি করেনি। বস্তুত এসব হত্যাকারী এবং তাদের সহযোগী ষড়যন্ত্রকারীরা সরকারের কাছ থেকে সুরক্ষা এবং সহযোগিতা পেয়ে এসেছে। এদের কাউকে কাউকে বিদেশে কূটনৈতিক মিশনে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। অন্যরা দেশেই নানা সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। এভাবে অপরাধীকে পুরস্কৃত করা হয়েছে।’
সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তি হিসেবে জেনারেল জিয়া এ অভুত্থানের খলনায়ক ছিলেন; যা নির্দ্বিধায় বলা যায়। কারণ, প্রখ্যাত সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে কর্নেল ফারুক ও রশীদ স্পষ্টতই বলেছিল, পঁচাত্তরের ঘটনায় জিয়াউর রহমান জড়িত। কর্নেল ফারুকের ভাষ্য ছিল, তারা জিয়াউর রহমানকে পঁচাত্তরের মার্চ মাসে তাদের এ পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল। প্রখ্যাত সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজকেও কর্নেল ফারুক ও রশীদ স্পষ্টতই বলেছিল, বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিষয়টি নিয়ে তারা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বহুবার গোপনে মিলিত হয়েছে এবং পরিকল্পনার বিষয়টি অবহিত করেছিল। ১৯৭৬ সালে লন্ডনের প্রখ্যাত সাংবাদিকরা জিয়াউর রহমানকে অভিযুক্ত করার প্রশ্নে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি নীরবে বিষয়টি এড়িয়ে যান এবং চুপ থাকেন। যা আইনের চোখে প্রকারান্তরে স্বীকৃতিরই নামান্তর। জিয়াউর রহমান যে খুনীদের উৎসাহিত করেছিলেন, সেটা তো ১৯৭৬ সালের ২ অগাস্ট লন্ডনের এক টেলিভিশন টক শো-তে ফারুক-রশীদ অকপটেই প্রকাশ করেছিল। জিয়াউর রহমানের অতি আপনজন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদও তার লিখিত পুস্তক ‘ডেমোক্রেসি অ্যান্ড চালেঞ্জ অব ডেভেলপমেন্ট’- এ পরিষ্কার করেই লিখেছেন, জাতির জনকের হত্যায় জিয়ার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল।

১৯৭৬ সালের ৩০ মে লন্ডনের বহুল প্রচলিত দৈনিক সানডে টাইমসে এক পূর্ণ পৃষ্ঠা লিখনীর মাধ্যমে খুনি কর্নেল ফারুক জাতির পিতা হত্যায় জিয়ার ভূমিকার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। আর খুনিদের বিচারের হাত থেকে রক্ষায় প্রথমে মোশতাক ও পরে জিয়াউর রহমানের ইনডেমনিটি অর্ডিনেন্স জারি করেন এবং পরে (১৯৭৯ সাল) তা আইনে প্রণীত করেন। এভাবেই তারা খুনিদের রক্ষা করেছে। দণ্ডবিধি ১১৮, ১১৯, ১২০, ১২০-এর ক ও খ এবং ১২৪ ধারায় জিয়াউর রহমান অপরাধ সংগঠিত করেছিলেন। খুনিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া দণ্ডবিধি ২১২ ধারার অপরাধ। আর অন্যান্য ধারাসমূহে অভিযুক্ত হওয়ার অর্থ হলো- একই অপরাধ সংগঠনের উদ্দেশ্যে সম্মত, সহযোগিতা করা ও সকল বিষয় গোপনে রাখা। এ ধরনের ধারবাহিক অকাট্য প্রমাণ থাকা সত্বেও জিয়াকে অযথাই তার দল রক্ষার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট মোহাম্মদ নাসিম আমাকে ঢাকা থেকে ফোন করে খবরটি দেন; বিষয়টি শুনে মুহূর্তের মধ্যে আমি হতবিহ্বল হয়ে পড়ি এবং বকুল, বেবি ইসলাম, ফজলুল হক মন্টুসহ অনেকের সঙ্গে প্রতিরোধের বিষয়ে আলোচনা শুরু করি। এ সময় তৎকালীন পাবনার রক্ষীবাহিনীর নেতা আলমগীরকে ফোন করলে তিনি জানান, তার সৈনিকরা ব্যাটেল ড্রেসে প্রস্তুত আছেন এবং তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য ৪৫টি এলএমজিসহ যথেষ্ট সমরাস্ত্র তাদের কাছে রয়েছে। তিনি এ-ও বলেন, “এখনি হাইকমান্ড থেকে জানলাম, গুটিকয়েক বিভ্রান্ত সৈনিক এই খুনীর মহোৎসবে জড়িত। আমরা জেলার রক্ষীবাহিনী ও আপনারা রুখে দাঁড়ালে মুহূর্তেই এদেরকে নিবৃত করা সম্ভব। কেননা সমগ্র সেনাবাহিনী এ বিষয়ে জড়িত বা অবগত নয়।” আমরা প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সকাল ৮টায় জেলা স্কুলের মাঠের সামনে জড়ো হই; ঠিক এ সময় পাবনার তৎকালীন এসপি পিবি মিত্র ক্রন্দনরত অবস্থায় হাজির হয়ে জানান, পুলিশ ওয়্যারলেসে এই মাত্র তিনি খবর পেয়েছেন, সকল বাহিনীর প্রধানরা খুনি মোশতাকের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে রেডিও সেন্টারে উপস্থিত হয়েছেন। কাজেই এ মুহূর্তে উচিত নিজেদের রক্ষার চেষ্টা করা। তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে আমরা আত্মগোপনে চলে যাই এবং পরবর্তীতে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় ১৯৭৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর খুনি মোশতাকের সামরিক বাহিনী দ্বারা গ্রেপ্তার হই। অতঃপর প্রথমে পাবনা জেলে ও পরে রংপুর জেলে নিয়ে আমার ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়। সাল তখন ১৯৭৬। রংপুর কারাগারে থাকাকালীন হঠাৎ একদিন ৭-৮ জন এয়ারফোর্স অফিসার গ্রেপ্তার হয়ে আসেন। ঢাকায় জাপানি বিমান হাইজ্যাক হওয়ার ঘটনাকে ক্যু আখ্যা দিয়ে এয়ারফোর্সেরই প্রায় ৮০০-৯০০ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে তাদের মুখে শুনেছি; যারা বাংলাদেশের বিভিন্ন কারাগারে আটক ছিলেন। সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য বাহিনীর অনেক মুক্তিযোদ্ধা অফিসারও তখন গ্রেপ্তার হয়েছিল। এ এয়ারফোর্সের কর্মকর্তারা আলাপ-আলোচনাকালে বললেন, তারা কখনও কোনরকমভাবে ওই ঘটনার (বিমান হাইজ্যাক) সঙ্গে জড়িত নয়। এমনকি তারা তখনও জানেন না, তাদের আটকের কারণ কী! আমরা সকল রাজবন্দিসহ ওই কর্মকর্তারা জেলের ভেতরে একই চত্বরে থাকতাম।

একদিন সকালে নাস্তার পূর্ব মুহূর্তে খেয়াল করলাম, আটক বিমানবাহিনীর ৩ জন কর্মকর্তা অনুপস্থিত। মনে প্রশ্ন জাগলেও তৎসময়ের আতঙ্কজনক অবস্থার প্রেক্ষিতে কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারলাম না। প্রিজন কর্মকর্তাকেও বেশ বিষণ্ণ দেখা গেল। পরদিন সকালে বাকি তিনজনকেও দেখলাম না। প্রাথকিভাবে ধারণা হয়েছিল, হয়তো বা তারা নির্দোষ ছিল, তাই রাতে ছাড়া পেয়ে গেছে।
আমার জেলা পাবনার একজন সিপাহী, যাকে সিআইডি করিম বলে ডাকা হত; তার কাজ ছিল জেলের ভেতরের গোপন খবর সংগ্রহ করা। আমার সাথে তার সখ্যতার কারণেই কৌতুহল নিয়ে সাহস করে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “এয়ারফোর্সের ওই কর্মকর্তারা কি মুক্তি পেয়েছে? তাদের দেখছি না।” এ কথা বলার পর হঠাৎই সে অশ্রুসজল চোখে আমাকে বলল, “বিষয়টি গোপন রাখবেন, তাদের ছয়জনকেই দুই রাতে ফাঁসিয়ে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ফাঁসিতে ঝোলার পূর্বে তারা চিৎকার করে বলেছে, ‘আমরা নির্দোষ, আমাদের অপরাধ কী, জানিনা। কেননা আমাদের কোনো কোর্ট মার্শালও হয়নি’।”
পরে শুনেছিলাম, বাংলাদেশের সকল কারাগারে আটক সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনী সাত-আটশ’ কর্মকর্তাকে এভাবেই ফাঁসিতে ঝুলিয়ে জিয়াউর রহমান হত্যা করেছে। এ অবস্থায় জিয়াকে কি ঠাণ্ডা মাথার একজন নৃশংস খুনি বলা যায় না? পরবর্তীতে বিষয়টি দেশে-বিদেশের সকলেই জানতে পেরেছিল। অন্যায়ভাবে এমন শত শত সেনা কর্মকর্তাকে খুন করার একটাই কারণ ছিল, আর তা হলো- গদি রক্ষা। মুক্তিযোদ্ধা ও সেনা কর্মকর্তা হত্যা, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিকে ক্ষমতায় বসানো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ সংবিধানকে তছনছ করে সাম্প্রদায়িক দেশ বানানো এবং স্বাধীনতার মাধ্যমে অর্জিত সকল মূলবোধকে ধূলিস্যাতের খলনায়ক কি তাকে বলা না?
শেখ হাসিনা সঠিকই বলেছেন, শেরে বাংলা নগরে থাকা কবরটি জিয়ার নয়। আমরাও লক্ষ্য করেছি, যারা সেই কবরে মাঝে মাঝে বিলাপের উদ্দেশে গিয়ে হাসাহাসি করেন, তাদের মাঝে শোকের কোনো মুখচ্ছবি দেখা যায় না। মাঝে মাঝে নিজেরাও কলহে লিপ্ত হন। বঙ্গবন্ধু খুনসহ উপরোক্ত সকল প্রেক্ষাপট যদি বিবেচনা করা হয়, তবে এক বাক্যে এটাই বলা যায় যে, বিশ্বাসঘাতক এ খুনি জিয়ার জন্য কোন সমাধি তো নয়-ই, বরং অপরাধের শাস্তি হিসেবে ঘৃণাস্তম্ভ করার বিষয়টি এখন জাতি প্রত্যাশা করে। খেতাব প্রত্যাহারের দ্বিধাদ্বন্দ্বে আমার যেন কেন মনে হয়, কৌশলী অবস্থান কখনই এদের হাত থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ষা করা যাবে না। কারণ, তারা এখন প্রতিবিপ্লবের ভূমিকায় রয়েছে।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ দাবি করে যে, যে কর্নেল তাহের জিয়াকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছিল; তাকেই ঠাণ্ডা মাথায় খুন করেছে জিয়াউর রহমান। কর্নেল তাহের ও জিয়ার মধ্যে ১৫ অগাস্ট ও ২ নভেম্বর নিয়ে কী সমঝোতা হয়েছিল, কর্নেল তাহের জীবিত থাকলে তা কি ফাঁস হয়ে যেত? এ কারণেই কি তাহের হত্যাকাণ্ড? এসব প্রশ্ন মানুষের মনে ঘুরপাক খায়। অনেকে এই পরিষ্কার ধারণাও করেন যে, বঙ্গবন্ধু হতাকাণ্ডের ব্যাপারে এদের মধ্যে অশুভ আঁতাত ছিল।
বঙ্গবন্ধুর খুনিদের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পুরস্কৃত করার বিষয়টি উল্লেখ না করলেই নয়। এ পুরস্কারের মধ্যে ছিল কে.এম মহিউদ্দিন আহমেদকে আলজেরিয়ায় দ্বিতীয় সচিব, লে. কর্নেল শরীফুল হক ডালিমকে চীনে প্রথম সচিব, আজিজ পাশাকে আর্জেন্টিনার প্রথম সচিব, মেজর বজলুল হুদাকে পাকিস্তানে দ্বিতীয় সচিব, মেজর শাহরিয়ার রশীদকে ইন্দোনেশিয়ায়, মেজর রাশেদ চৌধুরীকে সৌদি আরবে, মেজর নূর চৌধুরীকে ইরানে, মেজর শরিফুল হোসেনকে কুয়েতে, কিসমত হাসেমকে আবুধাবি, লে. খায়রুজ্জামানকে মিশর, লে. নাজমুল হোসেনকে কানাডা এবং লে. আব্দুল মাজেদকে সেনেগালে নিয়োগ করা। শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড পরবর্তী সময়ে সরাসরি জড়িত সামরিক অফিসারদের বৈদেশিক দূতাবাসে সচিব পর্যায়ে চাকরি দেওয়ার এ বিষয়টি হত্যাকাণ্ডে জিয়াউর রহমানের জড়িত হওয়ার বিষয়টি আরও সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ করে দেয়।
মেজর রফিকুল ইসলাম, অধ্যাপক আবু সাইয়িদ ও একজন প্রত্যক্ষদর্শী সামরিক কর্মকর্তার দাবি, মুজিব হত্যার পর উল্লাসিত হয়ে জিয়াউর রহমান মেজর ডালিমকে বলেন, “তুমি একটা দারুণ অসাধারণ কাজ করেছো। আমাকে চুমু খাও। আমাকে চুমু খাও।” তারপর জিয়া গভীর আবেগে ডালিমকে জড়িয়ে ধরেন। প্রখ্যাত সাংবাদিক লরেন্স লিফশুজের বলেছিলেন, জিয়া মুজিব হত্যার নেপথ্যচারী ‘প্রধান ছায়ামানব’ (The key shadow man)। তার মতে, “(প্রাপ্ত) তথ্যপ্রমাণ উল্লেখযোগ্য হারে এ ব্যাপারে ইঙ্গিত করে যে, জিয়া ছিলেন এই অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান নকশাকার এবং তিনি খন্দকার মোশতাক আহমেদের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা পালন করেছিলেন।’’
বাহাত্তর-পরবর্তী বামপন্থি শক্তির উত্থানও শেখ মুজিব হত্যার অন্যতম পটভূমি সৃষ্টি করেছিল। এক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের বুলি আওড়িয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর আওয়ামী লীগ বিরোধী কার্যকলাপ এক্ষেত্রে ন্যাক্কারজনক ভূমিকা পালন করে। স্বাধীনতার কয়েক মাসের মধ্যে জাসদ গঠন এবং বিপ্লবের নামে সিরাজ সিকদারের উত্থানও পটভূমি সৃষ্টির সহায়ক। বলা হয়ে থাকে, ১৯৭২ সালে সংবিধানে সংযোজিত অবাধ গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকারকে অবাধ অপকর্মের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেছিল অপশক্তি। গোপনে গঠন করেছিল সশস্ত্র দল ও স্কোয়াড বাহিনী। খুন-হত্যা, রাহাজানি, ডাকাতি জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল তারা। জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সহ-সভাপতি মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন এক সাংবাদিক সম্মেলনে ৪৭ টি থানা লুটের ঘটনা ও মুজিব হত্যায় নিজেদের দায় স্বীকার করেন। (ফ্যাক্টস অ্যান্ড ডকুমেন্টস: বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড; অধ্যাপক আবু সাইয়িদ)
সুশৃঙ্খল ও নিয়মিত সেনাবাহিনীতে কর্নেল তাহেরের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা সংগঠন গড়ে তোলার উদ্দেশ্য বা কী ছিল? সে বিষয়টিও উদ্ঘাটন হওয়া উচিত। সবমিলিয়ে কর্নেল আবু তাহের নেতৃত্বে জাসদের সশস্ত্র শাখা আওয়ামী লীগবিরোধী অভ্যুত্থানে লিপ্ত হয় বলে ধারণা পাওয়া যায়। এখনও প্রশ্ন জাগে, জাসদ কেন এবং কী উদ্দেশ্যে তৎকালীন ভারতীয় হাইকমিশনার শ্রী সমর সেনকে অপহরণ করেছিল? পরবর্তীতে এভাবেই দেশের আইন শৃঙ্খলায় ভাঙন ধরানো এবং বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পথ সুগম করা হয়। এর বাইরেও পাকিস্তানপন্থি হিসেবে মুসলিম লীগ, ভারতবিরোধী হিসেবে চীনাপন্থি বাম দলগুলো এবং স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থানও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারে ভাঙন ধরিয়ে খুনি মোশতাক যে পাকিস্তানের সঙ্গে আপসের প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছিলেন- সেটা তো সকলের জানা। ষড়যন্ত্রের বীজ তো সেখানেই বপিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সময় মোশতাকের বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে কে এম ওবায়দুর রহমান, শাহ মোয়াজ্জেম, নুরুল ইসলাম মঞ্জুর, তাহের উদ্দিন ঠাকুর, আমলা মাহবুবুল আলম চাষীসহ অনেকের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। ১৯৭৫-এর ৩ নভেম্বর অভ্যুত্থানের পর জিয়াউর রহমান ও খুনি মোশতাককে রক্ষার যে প্রত্যক্ষ চেষ্টা জেনারেল ওসমানী ও বিডিআর প্রধান খলিলুর রহমান করেছিলেন; তা আজ দেশবাসীর অজানা নয়।
২
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের কুশীলবদের চিহ্নিত করার প্রশ্নে তদন্ত কমিশন গঠনের বিষয়টি সরকারি নীতি-নির্ধারণী মহল থেকে বছরের পর বছর ঘোষণা করা হলেও তা এখনও বাস্তব রূপ পায়নি। দীর্ঘ ছেচল্লিশ বছর পরও হয়নি এই কমিশন। অথচ ইতিহাসের কলঙ্কিত ওই হত্যাযজ্ঞের নেপথ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষাভাবে কারা, কীভাবে জড়িত ছিলেন- এই মর্মে শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি বারবার উঠেছে। অনেকে নীতিনির্ধারণী নেতারাও ইতোপূর্বে কমিশন গঠনে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তবে তা এখন রূপ পায়নি। ২০২০ সালের অগাস্ট মাসে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সর্বপ্রথম বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্যের খলনায়কদের খুঁজে বের করতে তদন্ত কমিশন গঠনে সরকারের সিদ্ধান্তের কথা জানান। ওই সময় তিনি বলেন, এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত সাবেক সেনা সদস্যদের বিচার হলেও এর পেছনের রাজনীতি এবং ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে তদন্ত হয়নি। মূলত সেটা খুঁজতেই তদন্ত কমিশন হবে। বিবিসি-কে দেওয়া আইনমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরেও তদন্ত কমিশনটির উদ্যোগে মাত্র একবার প্রাথমিক আলোচনার সুযোগ পেয়েছে। সবশেষ অগাস্টে দেওয়া আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হকের বক্তব্য অনুযায়ী, এই কমিশনের রূপরেখা ও কার্যাবলি কী হবে এবং কাদের দ্বারা এই কমিশন গঠিত হবে- এখনও পর্যন্ত সেসব বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা চলছে।
কমিশন গঠনে আইনগত ভিত্তি হলো The Commission of inquiry Act, 1956 (Act No VI of 1956). একদল সেনা কর্মকর্তা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দিলেও এর পেছনে যে দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ছিল- তা তো বারবারই স্পষ্ট হয়েছে। তাহলে এটি গঠনে বাধা কোথায়? জাতির পিতার হত্যার বিচার পেতে কেন আমাদের বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল? যারা এটা রুখতে চেয়েছিলেন, তাদেরই বা উদ্দেশ্য কী ছিল? তারা কাদেরকে রক্ষা করতে চান?

বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে ঘটনার আদ্যোপান্ত জানেন- এখনও এমন অনেকে জীবিত আছেন। তথ্য প্রাপ্তির জন্য ‘Secret Documents of Intelligence Branch on Father of The Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman’, মিজানুর রহমান খানের ‘মার্কিন দলিলে মুজিব হত্যাকাণ্ড’, আবদুল গাফফার চৌধুরীর ‘ইতিহাসের রক্তপলাশ পনেরোই আগস্ট পঁচাত্তর’, এ এল খতিবের ‘হু কিল্ড মুজিব’, অধ্যাপক আবু সাইয়িদ-এর ‘ফ্যাক্টস অ্যান্ড ডকুমেন্টস বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড’, জাহিদ নেওয়াজ খান-এর ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড: সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যর্থতার প্রামাণ্য দলিল’, জগলুল আলম-এর ‘মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের গোপন দলিল: বাংলাদেশ-ভারত–পাকিস্তান’, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এম. সাখাওয়াত হোসেন-এর ‘বাংলাদেশ: রক্তাক্ত অধ্যায় ১৯৭৫-৮১’, মে. জে মুহাম্মদ খলিলুর রহমান-এর কাছে থেকে দেখা (১৯৭৩-১৯৭৫)’, লে কর্ণেল (অব:) এম এ হামিদ পিএসসি-এর ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’, মহিউদ্দিন আহমদ-এর ‘৩২ নম্বর পাশের বাড়ি: ২৫ মার্চ ১৫ আগস্ট’, অ্যাডভোকেট সাহিদা বেগমের ‘বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা’, মেজর রফিকুল ইসলাম পিএসসি-এর ‘পঁচাত্তরের রক্তক্ষরণ’ ছাড়াও অগণিত বইয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রেক্ষাপট রচনাসহ আগে-পরের ঘটনাগুলো সন্নিবেশিত আছে। সরকারের গোয়েন্দা বাহিনীকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি এসব গ্রন্থ ঘাঁটলেই হত্যায় রাজনৈতিক দিকসহ নানা প্রেক্ষাপট সবার সামনে ফুটে উঠবে। মুক্তিযুদ্ধের একজন গবেষক জনাব মাহমুদুল হাসানের গবেষণালব্ধ প্রতিবেদনও এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।
মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ ১৯৭৯ সালে লিখিত ‘Bangladesh, the Unfinished Revolution’ গ্রন্থে বলেছেন, “অতি তুচ্ছ আওয়ামী লীগ নেতা কর্তৃক একজন সামরিক কর্মকর্তার স্ত্রী লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনায় শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়নি। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ দীর্ঘদিন আগেই নানা মাধ্যমে হত্যাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছিল।”
প্রায় একই বক্তব্য দিয়েছেন অপর মার্কিন নাগরিক ও ঐতিহাসিক অধ্যাপক স্ট্যানলি ওলপার্ট ১৯৯৩ সালে তার লিখিত ‘Zulfi Bhutto of Pakistan: His Life and Times’ বইয়ে বলেন, “মুজিব হত্যাকাণ্ড বামপন্থি কমরেড আব্দুল হকের পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো নিবিড়ভাবে জড়িত ছিলেন।”
এদিন ঘাতকরা শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেনি; তার সঙ্গে তারা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকেও হত্যা করতে চেয়েছিল। স্বভাবতই মাত্র ৬ জন সামরিক কর্মকর্তার ফাঁসি কার্যকর বিচারের ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। এ ষড়যন্ত্রে কারা মদদ দিয়েছে, কারাই-বা হত্যার প্রেক্ষাপট রচনা করেছে; কারা দেশকে পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কেনই-বা মাত্র কয়েকজন বাদে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার প্রায় সকল সদস্য মোশতাকের মন্ত্রীসভায় যোগ দিয়েছিলেন, দায়িত্ববান হওয়া সত্বেও দায়িত্ব পালন না করে প্রকারান্তরে খুনিদের সহযোগিতা করেছে- এই সবকিছুরই বিচার বিভাগীয় তদন্ত করে শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে হবে। অতি বিলম্বিত হলেও এই মুহূর্তে কমিশন এখন ‘অতি জরুরী’ বলে দেশবাসী মনে করে। তা না হলে জাতি হিসেবে আমরা সম্পূর্ণভাবে দায়মুক্ত হতে পারব না। আমরা চাই, এ বছরই তদন্ত কমিশন গঠন হোক ও টার্মস অব রেফারেন্স অনুযায়ী কাজ শুরু করুক- এটাই জাতির প্রত্যাশা।
লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সদস্য, উপদেষ্টা পরিষদ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারে ৭ দিনের আলটিমেটাম
ল’রিপোর্টার্স ফোরাম সদস্য, চ্যানেল ২৪-এর সিনিয়র রিপোর্টার মাসউদুর রহমানের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন। রাজধানীতে সুপ্রিম কোর্টের মূল ফটকের সামনে এক মানববন্ধন থেকে রোববার সাত দিনের আলটিমেটাম দিয়েছেন সাংবাদিক নেতারা। ল’রিপোর্টার্স ফোরাম (এলআরএফ) আয়োজিত মানববন্ধনে সংগঠনটির সভাপতি মাশহুদুল হক বলেন, ‘এক যুগ ধরে দেশের অনেক উন্নয়ন পরিকল্পনায় অংশ নিয়ে সুনাম অর্জন করেছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম। কিন্তু সাংবাদিকের বিরুদ্ধে তার ছেলে মানহানির মামলা করে পিতার সুনাম ক্ষুণ্ন করেছেন। আমরা সাত দিনের মধ্যে মামলা প্রত্যাহারে প্রতিমন্ত্রীকে উদ্যোগ নিতে আহ্বান জানাচ্ছি।’
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সভাপতি মোরসালীন নোমানী বলেন, ‘সাত দিনের মধ্যে মামলা প্রত্যাহার না হলে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।’ মানববন্ধনে ডিআরইউর সাধারণ সম্পাদক মসিউর রহমান খান, সহসভাপতি ওসমান গণি বাবুল, আজমল হক হেলাল, নজরুল ইসলাম মিঠু, এম বদি-উজ-জামান, সাঈদ আহমেদ,শংকর মৈত্র, আক্তার হোসেন, তোফাজ্জেল হোসেন, মঈন উদ্দিন খান, দিদারুল আলম দিদার, আজিজুল ইসলাম পান্নু, হাসান জাবেদ, সাইদুল ইসলামসহ সাংবাদিক নেতারা বক্তব্য রাখেন।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলমের ছেলে মুশফেক আলম সৈকত ১০০ কোটি টাকার মানহানির মামলা করেছেন চ্যানেল ২৪-এর সাংবাদিক মাসউদুর রহমানসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে। মুশফেক আলমের সাবেক স্ত্রী তাসনোভা ইকবাল এর আগে হাইকোর্টে একটি রিভিশন মামলা করেন। মাকে দেখতে না দিয়ে ৫ বছরের শিশুকে ১৭ মাস ধরে আটকে রাখার অভিযোগ আনেন তিনি মুশফেক ছাড়াও তার বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে। এ মামলা নিয়ে করা চ্যানেল ২৪-এর প্রতিবেদন দেখে ক্ষুব্ধ মুশফেক আলম সৈকত মানহানির মামলা করেন। মামলাটি নিয়ে পিবিআইকে তদন্ত প্রতিবেদন জমার নির্দেশ দিয়েছে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) আদালত।
পরীমনির তিন দফা রিমান্ড; হাইকোর্টে ক্ষমা চেয়েছেন দুই হাকিম,বলেছেন ভবিষ্যতে এমন ভুল আর হবে না
চিত্রনায়িকা পরীমনিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় তিন দফায় রিমান্ডে পাঠানোর বিষয়ে নানা যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা দিলেও শেষ পর্যন্ত নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন ঢাকার দুই মহানগর হাকিম দেবব্রত বিশ্বাস ও আতিকুল ইসলাম। তবে তাদের ব্যাখ্যা আর নি:শর্ত ক্ষমা করা হবে কী না তা জানা যাবে আগামি ২৫ নভেম্বর। ওই দিন এই মামলার রায় ঘোষণা করবেন বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি এ এস এম আব্দুল মোবিনের ভার্চুয়াল হাই কোর্ট বেঞ্চ।
রোববার দুই হাকিমের নি:শর্ত ক্ষমা চেয়ে আবেদন দাখিল করেন তাদের পক্ষে নিযুক্ত আইনজীবী আবদুল আলীম মিয়া জুয়েল। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মিজানুর রহমান।
এছাড়া রিট আবেদনকারী পক্ষের আইনজীবী জেড আই খান পান্না ও পরীমনির আইনজীবী মো. মজিবুর রহমানও শুনানি করেন।
ঢাকা মহানগর আদালতের দুই বিচারিক হাকিম তাদের আবেদনে বলেছেন, ভবিষ্যতে রিমান্ড মঞ্জুর বা বিচারিক দায়িত্ব পালন করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকবেন, রিমান্ড মঞ্জুর করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুসরণ করবেন। ভবিষ্যতে এ ধরনের ভুল আর করবেন না।
গত ৪ অগাস্ট ঢাকার বনানীর বাসা থেকে র্যাব পরীমনিকে গ্রেফতারের পর মাদকের মামলায় তিন দফায় টানা সাত দিনের রিমান্ডে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। প্রায় এক মাস পর জামিনে তিনি মুক্তি পান।

পরীমনিকে বার বার রিমান্ডে পাঠানোর বৈধতা প্রশ্নে স্বতঃস্ফূর্ত রুল চেয়ে গত ২৯ আগস্ট হাই কোর্টে আবেদন করে মানবাধিকার ও আইনি সহায়তাকারী সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।
এদিকে দুই হাকিমের আইনজীবী আবদুল আলীম মিয়া জুয়েল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পরীমনিকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফা রিমান্ড মঞ্জুর করার ব্যাখ্যা তলব করেছিলেন আদালত। আজ উনাদের পক্ষে আমি নিঃশর্ত মার্জনা চেয়ে একটি আবেদন করেছি। সে আবেদনের শুনানির পর আদালত আগামী ২৫ নভেম্বর রায়ের জন্য রেখেছেন।”
জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফা পুলিশি হেফাজতে পাঠানোর ক্ষেত্রে দুই হাকিম কী ব্যাখ্যা দিয়েছেন- জানতে চাইলে এ আইনজীবী বলেন, “যখন নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া হয়, তখন আর কিছুর ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না।”
ঢাকার দুই মহানগর হাকিমের আগের ব্যাখ্যায় অসন্তুষ্ট হাইকোর্ট গত ২৯ সেপ্টেম্বর ফের ব্যাখ্যা দিতে বলে গত ২৪ অক্টোবর শুনানি ও পরবর্তী আদেশের জন্য রেখেছিল।
সেদিন দুই মহানগর হাকিম ব্যাখ্যা দিতে আরও এক সপ্তাহ চেয়েছিলেন। সেই সময়ের মধ্যে রোববার তারা নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে আবেদন করেন।
শুনানিতে জেড আই খান পান্না বলেন, এটা পরিষ্কার যে দুই হাকিম সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনার ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন। এখন হলফনামা দিয়ে তারা বলছেন, তারা ‘যথাযথ প্রশিক্ষণ পাননি’। অ্যাটর্নি জেনারেলও একই কথা বলেছেন।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে আইনের অপব্যবহার চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
পরীমনির আইনজীবী মজিবুর রহমান বলেন, “দুই মহানগর হাকিম রিমান্ড মঞ্জুর করার ক্ষেত্রে যে প্র্যাকটিস করেছেন, সে প্র্যাকটিস থেকে আমাদের সরে আসতে হবে।”

সব পক্ষের বক্তব্য শুনে বিচারক মোস্তফা জামান ইসলাম বলেন, “আগামী ২৫ নভেম্বর সব কিছু মিলিয়ে আমরা রায় দেব। যতগুলো প্রশ্ন উঠেছে, সবগুলো প্রশ্নের জবাব রায়ে আমরা উল্লেখ করে দেব। সব মিলিয়ে আমরা একটি নীতিমালা দেব।”
বনানী থানার মাদকের মামলায় পরীমনিকে দ্বিতীয় দফায় দুই দিনের রিমান্ডে নেয়ার আবেদন গ্রহণ করেছিলেন ঢাকার মহানগর হাকিম দেবব্রত বিশ্বাস। পরে একই মামলায় মহানগর হাকিম আতিকুল ইসলাম তৃতীয় দফায় আরও এক দিনের রিমান্ড দেন।
কী কী তথ্য-উপাত্তের উপর ভিত্তি করে পরীমনিকে শেষ দুই দফা রিমান্ডে পাঠানো হয়েছিল, দুই হাকিমের কাছে সে ব্যাখ্যাই জানতে চেয়েছিল হাইকোর্ট।
সেই সঙ্গে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকেও মামলার নথিসহ (কেস ডকেট) আদালতে হাজির হতে বলা হয়েছিল।
নির্দেশ অনুযায়ী তদন্ত কর্মকর্তা গত ১৫ সেপ্টেম্বর মামলার নথি নিয়ে হাজির হন হাই কোর্ট। সেদিন দুই মহানগর হাকিমের জমা দেয়া লিখিত ব্যাখ্যাও আদালতে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু দুই হাকিমের ব্যাখ্যা শুনে উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন আদালত।
ইসি গঠনে আইন চেয়ে করা রিট সরাসরি খারিজ করলো হাইকোর্ট
সংবিধানের বিধি অনুযায়ী আইন করার মাধ্যমে পরবর্তী নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের নির্দেশনা যে রিট আবেদনটি হয়েছিল, তা খারিজ করে দিয়েছে হাই কোর্ট।
বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. কামরুল হোসেন মোল্লার ভার্চুয়াল হাই কোর্ট বেঞ্চ রোববার প্রাথমিক শুনানি নিয়ে তা খারিজ করে দেয়।
সংবিধানের ১১৮ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়নের মাধ্যমে পরবর্তী নির্বাচন কমিশন গঠনের নির্দেশনা চেয়ে গত ১৩ অক্টোবর রিটটি করেছিলেন বাংলাদেশ কংগ্রেসের মহাসচিব ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. ইয়ারুল ইসলাম।
পরে ২৪ অক্টোবর অবেদনটি শুনানির জন্য উঠলে আদালত রোববার শুনানির জন্য রাখে। আইনজীবী মো. ইয়ারুল ইসলাম নিজেই রিটের পক্ষে শুনানি করেন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন, সঙ্গে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নওরোজ মো. রাসেল চৌধুরী।
আইনজীবী ইয়ারুল ইসলাম বলেন, “আইন প্রণয়ন করতে হাই কোর্ট সংসদকে নির্দেশ দিতে পারেন না- এ যুক্তিতে রিটটি খারিজ করা হয়েছে। তবে এ খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে আপিলে যাব।”
সংবিধানের ১১৮ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চার জন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোন আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।
কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ আগামী বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। তার আগেই নতুন কমিশন গঠনে আলোচনা শুরু হয়েছে।
জাতীয় পার্টি ও বামদলগুলো চাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে সংবিধানের ভিত্তিতে একটি পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামো হোক।
২০১৭ সালের ১১ জানুয়ারি ইসি গঠনে আইন প্রণয়নের নির্দেশনা চেয়ে একটি রিট করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ। তখন ওই রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে আদালত রুল দিয়েছিল। সে রুলটি বিচিারাধীন বলে জানান আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
জামিন পেলেন ক্রিকেটার নাসির ও তামিমা
ইনসম্মতভাবে বিচ্ছেদের আগেই নতুন করে বিয়ের মামলায় ক্রিকেটার নাসির হোসেন, বিমানবালা তামিমা সুলতানা তাম্মি ও তার মা সুমি আক্তার আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন পেয়েছেন।
রোববার তারা ঢাকার মহানগর হাকিম আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করলে বিচারক মোহাম্মদ জসীম দশ হাজার টাকা মুচলেকায় তা মঞ্জুর করেন।
তামিমার সাবেক স্বামী রাকিব হাসানের দায়ের করা এই মামলায় পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) অভিযোগপত্র দেওয়ার পর ওই তিনজনকে আদালতে হাজির হতে গত ৩০ সেপ্টেম্বর সমন জারি করেছিলেন এ বিচারক।
আদালতে তিন আসামির পক্ষে জামিন শুনানি করেন কাজী নজিবুল্লাহ হিরু। আর বাদীপক্ষের ছিলেন আইনজীবী ইসরাত হাসান।
পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমান তার প্রতিবেদনে বলেন, আগের স্বামী রাকিব হাসানের সঙ্গে ‘যথাযথভাবে বিচ্ছেদ’ হওয়ার আগেই তামিমা ক্রিকেটার নাসিরকে বিয়ে করেন। সুতরাং তাদের এ বিয়ের ‘বৈধতা নেই’। সংবাদ সম্মেলন করে তালাকের বিষয়ে তারা যা বলেছেন, তার ‘সত্যতা মেলেনি’। ডিভোর্সের যে কাগজপত্র দেখানো হয়েছে, সেগুলো তৈরি করা হয়েছে ‘জালিয়াতির মাধ্যমে’।
চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি নাসির ও তামিমার বিরুদ্ধে ঢাকার হাকিম আদালতে এ মামলা দায়ের করেন মো. রাকিব হাসান। তার বক্তব্য শুনে ঢাকার মহানগর হাকিম মোহাম্মদ জসীম পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেন।
মামলার আর্জিতে তামিমার বয়স ২৯ এবং রাকিবের বয়স ৩২ বছর লেখা হয়েছিল। আর ক্রিকেটার নাসিরের বয়স দেখানো হয় ৩০ বছর।
রাকিব সেখানে বলেন, তামিমার সঙ্গে তার বিয়ে হয় ২০১১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি। তাদের ৮ বছরের একটি মেয়েও রয়েছে।
তামিমা পেশায় একজন কেবিন ক্রু, একটি বিদেশি এয়ারলাইন্সে তিনি কাজ করেন। পেশাগত দায়িত্বের অংশ হিসেবে গতবছর মার্চে সৌদি আরবে গিয়ে তিনি লকডাউনে আটকা পড়েন। তবে ফোন ও সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে তার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল বলে রাকিবের ভাষ্য।
তিনি বলছেন, চলতি বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি তামিমা ও নাসিরের বিয়ের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সেখান থেকেই বিষয়টি তিনি জানতে পারেন।
মামলায় রাকিব অভিযোগ করেন, তার সঙ্গে আইনিভাবে বিচ্ছেদ না ঘটিয়েই নাসিরকে বিয়ে করেছেন তামিমা।
মামলা হওয়ার পরদিন ঢাকার বনানীতে সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন নাসির ও তামিমা।
সেদিন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তামিমা বলেছিলেন, “উনি (রাকিব) যতগুলো কথা বলেছেন, এরমধ্যে দুইটা জিনিস ছাড়া (আমাদের বিয়ে হয়েছিল ও আমাদের একটা বাচ্চা রয়েছে) বাকি সব কথা মিথ্যা। এর প্রত্যেকটি প্রমাণ আমাদের রয়েছে।”
রাকিবকে ‘তালাক দিয়েই’ নাসিরের সঙ্গে ঘর বেঁধেছেন দাবি করে তামিমা বলেছিলেন, “উই আর ক্রিস্টাল ক্লিয়ার। উই আর নট গিল্টি। উই আর ইনোসেন্ট। আমি কোনো ভুল করিনি। হেনস্তা করার জন্য রাকিব এসব করেছে।”
আর নাসির সেই সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, “বিয়ে হয়েছিল, বাচ্চা ছিল। ডিভোর্স হয়েছে। পেপার দেখে আমরা বিয়ে করেছি। আমরা যা করেছি, লিগ্যাল ওয়েতে করেছি, ইলিগ্যাল কিছু করিনি। আমরা যাই করেছি, সেটা আইনগতভাবে ও ইসলামী শরীয়ত মেনে করেছি। সবাইকে জানিয়ে বিয়ে করেছি।”
আইনিভাবেই বিষয়টি মোকাবেলা করবেন জানিয়ে এই ক্রিকেটার সেদিন বলেছিলেন, “রাকিব সাহেব যেভাবে কথাবার্তা বলছেন …। সে তো আগে তামিমা ছিল; এখন আমার ওয়াইফ। ওকে বলা মানে আমাকে বলা। রাকিব সাহেব কেন, অন্য যে কোনো মানুষই হোক, আমার ওয়াইফকে নিয়ে কোনো ধরনের বাজে মন্তব্য করলে তার বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেব এবং তা আইনগতভাবেই।”
সাত মাস তদন্ত করে পিবিআই যে অভিযোগপত্র দিয়েছে, সেখানে যথাযথভাবে বিচ্ছেদ না করেই নতুন বিয়ে করার অভিযোগ আনা হয়েছে তামিমার বিরুদ্ধে।
আর নাসিরের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে ‘অন্যের স্ত্রীকে প্রলুব্ধ’ করে নিয়ে যাওয়া, ‘ব্যাভিচার’ এবং তামিমার আগের স্বামীর মানহানি ঘটানোর অভিযোগ।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইনগতভাবে রাকিব তালাকের কোনো নোটিস পাননি। তামিমা উল্টো ‘জালিয়াতি’ করে তালাকের নোটিস তৈরি করে তা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দেখিয়েছেন। যথাযথ প্রক্রিয়ায় তালাক না দেওয়ায় তামিমা এখনও ‘আইনত রাকিবের স্ত্রী’।
আর সব ‘জেনেও’ বিয়েতে সহায়তা করায় তামিমার মাকেও অভিযোগপত্রে আসামি করা হয়েছে। তালাকের শর্ত ‘পূরণ হয়েছে’ দেখাতে সুমি আক্তার বেশ কিছু ‘জালিয়াতিও করেছেন’ বলে পিবিআইয়ের ভাষ্য।
অভিযোগপত্র জমা হওয়ার দিন পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদার বলেছিলেন, তালাক দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনটি শর্ত থাকে। কাজীকে অবহিত করা, তালাক যাকে দেওয়া হবে তার ঠিকানায় নোটিশ পাঠানো এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে ডাক বিভাগের মাধ্যমে চিঠি দেওয়া। এই তিনটি শর্তের পরের দুটি তামিমার ক্ষেত্রে ‘সঠিকভাবে করা হয়নি’।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, ধর্মীয় বিধিবিধান ও আইন অনুযায়ী এক স্বামীকে তালাক না দিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করা ‘অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ’। ক্রিকেটার নাসির হোসেন ও তামিমা তাম্মীর বিয়ে ‘অবৈধ’। তারা দণ্ডবিধির ৪৬৮/৪৭১/৪৯৪/৪৯৭/৫০০/৩৪ ধারায় ‘অপরাধ করেছেন’ বলে তদন্তে ‘প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত’ হয়েছে।
এ মামলায় যেসব ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে, তা প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ সাত বছরের করাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হতে পারে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
উইঘুর মুসলিমদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিক্রির অভিযোগ চীনের বিরুদ্ধে : আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর
চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জিনজিয়াংয়ে সংখ্যালঘু উইঘুর মুসলিমদের প্রতি দেশটির সরকারের দমন-পীড়ন ও জাতিগত নিধন অভিযান গত কয়েক বছর ধরে ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চীনের বিরুদ্ধে অন্তত ১৫ লাখ উইঘুর মুসলিমকে বন্দি শিবিরে আটকে রেখে বর্বর নির্যাতন, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংগ্রহ করে বিক্রি এবং নারী-পুরুষদের সন্তান জন্মদানের সক্ষমতা নষ্ট করে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
দেশটির ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে উইঘুর জনগোষ্ঠীকে তাদের ঐতিহাসিক পৈতৃক জন্মভূমি জিনজিয়াং থেকে নির্মূলের অভিযোগও রয়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গোষ্ঠী ও মানবাধিকার সংস্থা চীনের নিন্দা জানিয়েছে।
উইঘুরদের বিরুদ্ধে চীন যে দমন-পীড়ন চালাচ্ছে সেটিকে বিভিন্ন মানবাধিকার গোষ্ঠী ও দেশ পরিষ্কার গণহত্যা বলে অভিহিত করেছে। আর চীন গণহত্যার এই প্রকল্প থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে। আর্থিক এই লাভের পরিমাণ বিশাল বলে সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। হেরাল্ড সান অস্ট্রেলিয়া ও নিউজ অস্ট্রেলিয়া সম্প্রতি এমন খবর প্রকাশ করেছে।

বন্দিশিবিরে আটক উইঘুর মুসলিমদের পাশাপাশি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী তিব্বতি এবং ফালুন গং গোষ্ঠীর বন্দিদের থেকেও জোর করে অঙ্গ সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে ওই প্রতিবেদনে অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একদলীয় শাসনাধীন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সরকার বেআইনি ভাবে বছরে অন্তত ১০০ কোটি ডলারের ( বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা) অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ব্যবসা চালাচ্ছে।
গত কয়েক বছর ধরে জিনজিয়াংয়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কার্যক্রম বিভিন্ন মানবাধিকার গোষ্ঠী ও বেসরকারি সংস্থার মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। ওই অঞ্চলের উইঘুরদের ওপর নিবিড় নজরদারি চালাচ্ছে বেইজিং। সিসিটিভি ক্যামেরার বিশাল নেটওয়ার্ক উইঘুরদের প্রত্যেকটি গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে।
এমনকি উইঘুররা তাদের নির্ধারিত এলাকা ত্যাগ করতে পারেন না এবং বাড়ি থেকে তারা কতদূর পর্যন্ত যেতে পারবেন, সে বিষয়েও সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের অবগত করা ছাড়াই সেখানকার হাজার হাজার মসজিদ এবং মুসলিম অধ্যুষিত জিনজিয়াংয়ের উইঘুরদের সাংস্কৃতিক ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে।
তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো প্রায়ই উইঘুরদেরকে তাদের বাড়িঘর থেকে টেনে-হেঁচড়ে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় অথবা রাস্তা থেকে ট্রাকে তুলে পুনঃশিক্ষা কেন্দ্রে পাঠানো হয়। যে কেন্দ্রের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া এবং ভারি অস্ত্রে সজ্জিত সেনাদের পাহারা দিতে দেখা যায়।
এই উইঘুরদের সেখানে মাসের পর মাস ধরে আটকে রাখা হয়। যেখানে আটক উইঘুরদের মান্দারিন ভাষা, চীনা সংস্কৃতি এবং শিষ্টাচারের ‘কারিগরি প্রশিক্ষণ’ নিতে বাধ্য করা হয়। তবে তাদের অনেককে আর কখনোই সেখান থেকে ফিরতে দেখা যায় না। পরিবারের আতঙ্কিত স্বজনদের নীরবে শোক পালন করতে হয়।
বিভিন্ন সময়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, গোপনে ধারণকৃত ভিডিও ও ছবি, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিদেশি গোয়েন্দাদের প্রতিবেদনে বন্দি শিবিরে ‘ব্যাপক সন্ত্রাস ও নির্যাতনের’ চিত্র উঠে এসেছে। জিনজিয়াংজুড়ে বিস্তৃত এসব শিবিরের শত শত বন্দিকে প্রায়ই আটকের ন্যায্যতা প্রমাণের জন্য মারধর এবং অন্যান্য সহিংস জিজ্ঞাসাবাদের কৌশল ব্যবহার করে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়।
অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউট (এএসপিআই) বলছে, ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রায় ৮০ হাজার উইঘুরকে জিনজিয়াং থেকে চীনের বিভিন্ন অঞ্চলের কারখানায় পাচার করা হয়েছে। এই উইঘুরদের জোরপূর্বক শ্রমে নিযুক্ত এবং তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি করে কোটি কোটি ডলার অর্থ সংগ্রহ করছে চীন।
দেশটির কালো বাজারে বছরে কমপক্ষে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেনাবেচা হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০১৯ সালে চীনের একটি আদালতে দেশটিতে প্রায় ৬০ হাজার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপন হয়েছে বলে জানানো হয়। তবে এই সংখ্যা দাতাদের তুলনায় অনেক বেশি। চীনের যেসব হাসপাতালে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপন করা হয়, সেসবের বেশিরভাগেরই অবস্থান উইঘুর বন্দিশিবিরের আশপাশের এলাকায়।
এএসপিআই বলছে, কালো বাজারে একেকটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ব্যাপক চড়াদামে বিক্রি হয়। দেশটিতে একটি ভালো লিভার প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার ডলারে বিক্রি হয়। যা চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি সদস্যদের কাছ থেকে বছরে যে অর্থ সংগ্রহ করে তারচেয়েও অনেক বেশি।
তাইওয়ান নিউজের এক অনুসন্ধানে গত কয়েক বছরে চীনের কর্মকর্তারা উইঘুরদের মালিকানাধীন প্রচুর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব সম্পত্তি প্রায় ৮৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে বিক্রি করা হয়।
সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের একজন ভূক্তভোগী হলেন আবদু জেলিল হেলিল। উইঘুর এই ধনকুবের রফতানিকারককে ২০১৭ সালে সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নের অভিযোগে আটক করে চীনা পুলিশ। পরে তাকে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের সম্পত্তি চীনা কর্তৃপক্ষের কাছে সমর্পণ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। তাইওয়ান নিউজ দাবি করেছে, তার ওই সম্পত্তি চীনা সরকারি কর্মকর্তারা বিক্রি করেন।









