আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, দেশে প্রায় ৩৭ লাখ মামলার জট তৈরি হয়েছে। এটা নতুন করে তৈরি হয়েছে তা নয়, অতীতের পুঞ্জীভূত সমস্যা। এ জট নিরসন করতে হবে। ২০২২ সালে ৬ লাখ মামলা কমানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বিচারকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।
রোববার (২৪ অক্টোবর) ঢাকায় বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে সহকারী জজ ও সমপর্যায়ের বিচারকদের জন্য আয়োজিত ৪২তম বিশেষ বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় এসব কথা বলেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, বিচারকরা হলেন বিচার বিভাগের প্রাণ। বিচার বিভাগের প্রধান চালিকা শক্তি। তাই তাদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য বিচারকদের দেশে-বিদেশে বিভিন্ন ধরণের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনষ্টিটিউটের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। ফলে আজ প্রথমবারের মতো এ ইনষ্টিটিউটে একইসাথে দুটি ব্যাচের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করা সম্ভব হলো। এটা সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে।
তিনি যোগ করেন, মামলাজট কমানোর জন্য অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি বিগত কয়েক বছরে ১১৫২ জন বিচারক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আরও বিচারক নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এখন কোন পদ শূন্য হওয়ার সাথে সাথে তা পূরণ করা হচ্ছে।
কোভিড-১৯ এর প্রেক্ষাপট তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে সারা বিশ্ব বদলে গেছে এবং এখন প্রতি নিয়ত বিশ্ব বদলে যাবে। তার সাথে তাল মিলাতে বাংলাদেশকেও বদলাতে হবে। বাংলাদেশ বদলে গেলে বিচারকদেরকেও বিচারিক কার্যক্রম চালানোর জন্য বদলাতে হবে।
আনিসুল হক বলেন, আজকে বাংলাদেশ নতুনভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। পুরনো বাংলাদেশ কিন্তু আর নেই। যেখানে ২১ বছর বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিরাজমান ছিল। অপরাধীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যাবে কি-না সে বিষয়ে মানুষের যথেষ্ঠ সন্দেহ ছিল। সেই সংস্কৃতি বদলে গেছে। এখন বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেড়িয়ে বিচারপ্রাপ্তির সংস্কৃতিতে এসেছি। সেজন্য বিচারকদের প্রয়োজনীয়তা এবং মর্যাদা দুটোই বেড়েছে। এই প্রয়োজনীয়তা এবং মর্যাদা ধরে রাখার অবিচ্ছেদ্য অংশীদার হলেন বিচারকরা। বিচারকরা সঠিকভাবে প্রশিক্ষিত হয়ে তাদের দায়িত্ব পালন করলে আদালতের প্রতি জনগণের আশা ও আস্থা বাড়বে।
বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব মো. গোলাম সাওয়ার, ইনস্টিটিউটের পরিচালক (প্রশিক্ষণ) মো. গোলাম কিবরিয়া বক্তৃতা করেন।
৩৭ লাখ মামলার জটঃ ২০২২ সালে ৬ লাখ মামলা নিষ্পত্তির পরিকল্পনা আইনমন্ত্রীর
শুধু ছাত্রলীগ নয়, অপরাধী যেই হোক ব্যবস্থা নেয়া হবে – আইনমন্ত্রী
শুধু ছাত্রলীগ নয়, অপরাধী যে দলেরই হোক তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি জানান এসব অপরাধীদের বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে হবে। রংপুরে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় এক ছাত্রলীগ নেতার জড়িত থাকার ঘটনায় আইনমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি এ মন্তব্য করেন।
রোববার রাজধানীর বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে জেলা জজদের এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী এ কথা বলেন।
কুমিল্লার পূজামণ্ডপে কোরআন শরীফ রাখার ঘটনার জেরে দেশের বিভিন্ন জেলায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হয়। এর মধ্যে রংপুরের পীরগঞ্জে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় র্যাবের হাতে গ্রেফতার সৈকত মণ্ডল ছাত্রলীগ নেতা বলে পরিচয় মিলেছে।
বিষয়টি নিয়ে আইনমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে,তিনি বলেন, কুমিল্লার ঘটনার পর দেশে অস্থিতিশীলতার জন্য পীরগঞ্জসহ ২৪ জেলায় সহিংসতা করা হয়েছিল। এই ঘটনায় যারা জড়িত তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে। একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে যাদের নাম উঠে আসবে সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।
আনিসুল হক বলেন, যারা অপরাধ করবে তাদের বিচার হবে। সে যে দলেরই হোক, যে গোষ্ঠীরই হোক, যে জাতিরই হোক। অপরাধী অপরাধীই, তার বিচার হবে।
আওয়ামী লীগ অসম্প্রাদায়িক রাজনীতিতে বিশ্বাস করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের মানুষকেও সে দীক্ষায়ই দীক্ষিত করেছেন বলে জনগণ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির দিকে ঝুঁকে না। সে ক্ষেত্রে কেউ যদি ব্যক্তিস্বার্থে অন্যায় করে সেটিও অন্যায় এবং তাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
এছাড়া সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন করার বিষয়ে অগ্রগতি জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, আমরা আগেও বলেছি, সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইনের বিষয়টি সামনে আসলে তড়িৎগতিতে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগছে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে, চালু হচ্ছে ই-রেজিস্ট্রেশন, জানালেন আইনমন্ত্রী
প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগছে দেশের ভূমি রেজিস্ট্রেশন সেক্টরেও। শত বছরের সনাতনি পদ্ধতি কাটিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশের অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো এবার ডিজিটালাইজড হতে যাচ্ছে রেজিষ্ট্রেশন অধিদপ্তর। চলতি বছরই দেশের ১৭টি জেলার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ই-রেজিস্ট্রেশনের পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন চলছে। আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যেই এই প্রকল্পের মূল্যায়ন প্রতিবেদন পাওয়া যাবে। আর এই মূল্যায়ন প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে আগামী বছর সারা দেশের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে ই-রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া চালু করা হবে।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক এমন নিশ্চয়তাই দিয়েছেন। রেজিষ্ট্রেশন সার্ভিসের কর্মকর্তাদের এক অনুষ্টানে তিনি এ তথ্য জানান।

শনিবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস এসোসিয়েশন (বিআরএসএ) আয়োজিত সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে নবযোগদানকৃত কর্মকর্তাদের সংবর্ধনা ও মত বিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় আইনমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশ প্রযুক্তিতে অনেকদূর এগিয়ে গেছে। এই অবস্থায় রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে ডিজিটাইজেশন বা ই-রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া চালুর বিকল্প নেই। এই প্রক্রিয়া চালু হলে জনগণকে দ্রুত রেজিস্ট্রেশন সেবা দেয়া সম্ভব হবে। তিনি যোগ করেন, ই-রেজিস্ট্রেশনের পাশাপাশি প্রচলিত ব্যবস্থাও বহাল থাকবে। তাই ই-রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া চালু হলেও কোন নকলনবীশ বা দলিল লেখক কাজ হারাবেন না। মন্ত্রী বলেন, ই-রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ায় ফাইল হ্যাক বা ড্রপ কিংবা ক্রাশ হতে পারে। তাই প্রচলিত ব্যবস্থা বাতিল করা সঠিক হবে না। সাব-রেজিস্ট্রারদের উদ্দেশ্যে মন্ত্রী বলেন, জনগণকে সঠিকভাবে সেবা না দিলে ধরে নেওয়া হবে যে, আপনারা সঠিকভাবে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করছেন না। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, বাংলাদেশের সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। সেজন্য জনগণকে সেবা দেয়া নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, যারা দুর্নীতি করবে তাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়া হবে। এ বিষয়ে কেউ তাদের পক্ষে অবস্থান নিবেন না। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। আইনমন্ত্রী বলেন, আপনাদের দীর্ঘদিনের দাবী অনুযায়ী নিবন্ধন পরিদপ্তরকে অধিদপ্তরে উন্নীত করা হয়েছে। ৪৯১টি নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। বদলির ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হয়েছে। কর্মকর্তাদের দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন জেলায় জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রার এর অফিস ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। মন্ত্রী যোগ করেন, এক সময় বালাম বইর অভাবে জনগণকে মূল দলিল ফেরত পাওয়ার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হতো। বালাম বইর সংকট সম্পূর্ণ দূর করা হয়েছে। নকল নবীশদের পারিশ্রমিক বৃদ্ধি করা হয়েছে। আগে নকল নবীশদের পারিশ্রমিক বছরের পর বছর বকেয়া থাকত। এখন তাদের পারিশ্রমিক নিয়মিত পরিশোধ করা হচ্ছে। দ্রুততম সময়ে জনগণকে রেজিস্ট্রেশন সেবা প্রদানের লক্ষ্যে প্রতিটি জেলা ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কর্মকর্তা -কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। চলতি ২০২১ সালেও পাবলিক সার্ভিস কমিশন কর্তৃক নন-ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবে সুপারিশকৃত ৬৯ জনকে সাব-রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বিআরএসএ- এর সভাপতি মো. জিয়াউল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সচিব মো. মইনুল কবির, আইন ও বিচার বিভাগের সচিব মো. গোলাম সারওয়ার, নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরির্শক শহীদুল আলম ঝিনুক, বিআরএসএ-এর মহাসচিব মো. জাহিদ হোসেন প্রমুখ বক্তৃতা করেন।
প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া শাহীরুলের শেষ রক্ষা হলো না…
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি অ্যান্ড গার্ড সার্ভিস লিমিটেডসহ চারটি ভূয়া প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক । পরিচয় দেন মানবাধিকার সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবেও। গুলশানের শুটিং ক্লাবের আজীবন সদস্য বলেও দাবি তাঁর। ব্যবহার করেন দুটি বিলাসবহুল গাড়ি। নিজের নিরাপত্তার জন্য কোমরে সব সময় একটি বিদেশি পিস্তল রাখেন। ঘরে সাজিয়ে রেখেছেন তিনটি বিদেশি পিস্তল, একটি শটগান, একটি এয়ারগান ও একটি রাইফেল। প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতেই শাহীরুল ইসলাম সিকদার (৪৮) নামের এই ব্যক্তির এত আয়োজন। নিজেকে এভাবে জাহির করে তিনি চাকরির প্রলোভন, প্লট ও ফ্ল্যাট বিক্রির নাম করে বিভিন্ন ব্যক্তিকে ফাঁদে ফেলে প্রায় ৫০ কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। অথচ তিনি একসময় বাসচালকের সহকারী ছিলেন। পরে তিনি নিরাপত্তাকর্মী সরবরাহ করে, এমন একটি প্রতিষ্ঠানের দালালি করেন। এই দালালি করতে গিয়েই তিনি প্রতারণার কৌশল শেখেন। তারপর ধীরে ধীরে তিনি বড় প্রতারক হয়ে ওঠেন। শাহীরুল হককে গ্রেপ্তারের পর র্যাব-৪-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মোজাম্মেল হক এসব তথ্য জানিয়েছেন। শুক্রবার রাজধানীর রামপুরার বনশ্রী থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। শনিবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে র্যাব-৪-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মোজাম্মেল হক বলেন, শাহীরুল প্রতারণাকে শিল্পে রূপ দিয়েছেন। তিনি যেসব প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সেগুলোর কোনোটিরই অস্তিত্ব নেই। তবে তাঁর বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া তিনটি বিদেশি পিস্তল, একটি শটগান, একটি এয়ারগান ও একটি রাইফেল উদ্ধার করা হয়েছে। এগুলো সবই আসল। তিনি বলেছেন, এগুলো তাঁর বৈধ অস্ত্র। তবে এ-সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র তিনি দেখাতে পারেননি। এ বিষয়ে অনুসন্ধান করা হচ্ছে। শাহীরুল ইসলামের প্রতারণার কৌশল সম্পর্কে র্যাব কর্মকর্তা মোজাম্মেল বলেন, তিনি কখনো কখনো সরকারি কর্মকর্তা হিসেবেও নিজের পরিচয় দিতেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়ার নাম করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে ৫-১০ লাখ টাকা নিতেন। টাকা ফেরত চাইলে হুমকি দেওয়া হতো। এমনকি অস্ত্র দেখিয়েও ভয় দেখানো হতো। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ দিতে চটকদার বিজ্ঞাপন দিতেন তিনি। এই ফাঁদে পা দিলে আবেদনকারীদের কাছ থেকে ১৫-২৫ হাজার টাকা করে জামানত নিতেন। এরপর তিনি আর চাকরি দিতেন না। নিজেকে প্রভাবশালী হিসেবে উপস্থাপন করতে মানবাধিকার সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচয় দেওয়া শুরু করেন শাহীরুল ইসলাম। ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য তিনি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলে সেগুলো প্রদর্শন করতেন। এমনকি বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করে প্রতারণা করতেন। দেশের বিভিন্ন এলাকার বেকারদের নিরাপত্তাকর্মী, সরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়িচালক, কম্পিউটার অপারেটর, অফিস সহকারীসহ বিভিন্ন পদে চাকরি দেওয়ার নাম করে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছিলেন। শাহীরুল ইসলামের উত্থান সম্পর্কে র্যাব-৪-এর অধিনায়ক মোজাম্মেল হক বলেন, শাহীরুল উচ্চমাধ্যমিক পাস। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি শৌখিন পরিবহনে চালকের সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন। ২০০৩ সালে তিনি একটি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাকর্মী সরবরাহের কাজ শুরু করেন। তারপর ধীরে ধীরে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সার্ভিস নামে একটি প্রতিষ্ঠান খুলে শুরু করেন প্রতারণা। তিনি হাজার হাজার মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। পরে সরকারি চাকরি দেয়ার কথা বলে অর্থ হাতিয়ে নেন। ঢাকায় তাঁর দুটি বাড়ি, দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। দুটি বিলাসবহুল গাড়িও ব্যবহার করেন তিনি। সূত্র- প্রথম আলো/বিডি নিউজ।
দুদক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে স্ত্রীকে নির্যাতন ও যৌতুকের মামলা
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপ-পরিচালক মো.সালাহউদ্দিনের বিরুদ্ধে এবার যৌতুক দাবি এবং নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেছেন তার স্ত্রী। গত ২০ অক্টোবর রাজধানীর খিলগাঁও থানায় এ মামলা (নং-৫২) দায়ের করেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ (সংশোধনী/২০০৩) এর ১১(গ)/৩০সহ দণ্ডবিধির ৩২৩ ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলার বাদী, জান্নাতুল কৌশরী। মামলায় সালাহউদ্দিনের ছোট বোন শামিমা সুলতানাকেও আসামি করা হয়েছে।
এজাহারে কৌশরী উল্লেখ করেন,২০২০ সালের ২৫ জানুয়ারি ইসলামী শরীয়াহ মোতাবেক সালাউদ্দিন ইমনের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। বিয়ের সময় আমার পরিবার বিবাদীর ঘর সাজানোর জন্য ২ লাখ টাকা দেয়। বিয়ের পর আমাদের সাংসারিক জীবন কিছুদিন ভালো চলে। কিছুদিন পর থেকে তার ছোট বোন শামিমা সুলতানার প্ররোচনায় সালাহউদ্দিন ফ্ল্যাট কেনার জন্য ২০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে শারীরীক ও মানসিক নির্যাতন করতে থাকেন। এক পর্যায়ে আমি আমার পরিবার থেকে ২০ লাখ টাকা এনে দেই। কিছুদিন পর যৌতুক হিসেবে আরও ১ কোটি টাকা দাবি করেন। কিন্তু পরিবার থেকে ওই টাকা আনতে অস্বীকৃতি জানালে সালাহউদ্দিন আমার ওপর শারীরীক ও মানসিক নির্যাতন চালাতে থাকে। সর্বশেষ গত ১৩ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টায় খিলগাঁওস্থ বর্তমান ঠিকানায় আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে এলোপাতাড়ি ভাবে কিলঘুষি লাথি মেরে শরীরের বিভিন্ন স্থান জখম করে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত আমার বড় মামা আবু হান্নান মো: মনোয়ার হোসেন এবং হুমায়রা ইসলাম এর সাক্ষী রয়েছেন। খিলগাঁও থানার সাব-ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র) মো.নাজমুল হুদা মামলাটি তদন্ত করছেন। টেলিফোনে তিনি জানান, আসামি গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক উপ-পরিচালক মো. সালাহউদ্দিন বলেন, আমি প্রতারকচক্রের ফাঁদে পড়েছি। সামাজিকভাবে বিয়ে হলেও কিছুদিন পর জানতে পারি কৌশরীর সঙ্গে বহু পুরুষের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক রয়েছে। এসব সম্পর্ক ত্যাগ করার জন্য তাকে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করি। কিন্তু আমি ব্যর্থ হই। তার অবৈধ সম্পর্কের বহু তথ্য-প্রমাণ আমার হাতে রয়েছে। এসব নিয়ে কথা বলতেই সর্বশেষ গত ১৩ অক্টোবর তার মামা আমার ওপর চড়াও হয়। আমাকে আহত করে। এ বিষয়ে আমি আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নিলে ওরাই আমার বিরুদ্ধে যৌতুকের মামলা দায়ের করে।
এদিকে মামলার বাদী জান্নাতুল কৌশরী বলেন, কোনো নারী সংসার ভাঙতে চায় না। তার মানসিক ও শারীরীক নির্যাতনে অতিষ্ট হয়ে মামলা করতে বাধ্য হয়েছি। আমার দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। তিনি বলেন, আমার আগেও ইমন একাধিক বিয়ে করেছে। আমি তার চতুর্থ স্ত্রী-এ কথা কারও কাছে বলতেও পারি না। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া দিনাজপুরের সহজ-সরল একজন মেয়ে।
প্রসঙ্গত: উপ-পরিচালক মো.সালাহউদ্দিন দুদকের বিশেষ অনুসন্ধান-তদন্ত শাখায় কর্মরত। পিকে হালদার, জিকে শামীম,শহিদ ইসলাম পাপুল এবং ক্যাসিনোকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ মামলার বাদী এবং তদন্ত কর্মকর্তা। সূত্র – দৈনিক ইনকিলাব।
সাম্প্রদায়িক হামলার মামলার বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে হবে – আইনমন্ত্রী
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, কুমিল্লায় পূজামণ্ডপে হামলার ঘটনায় করা মামলার বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে করা হবে।
শনিবার (২৩ অক্টোবর) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের কার্নিভাল হলে নবাগত সাব-রেজিস্ট্রারদের বরণ এবং রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস এসোসিয়েশন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, ভিডিও দেখে আসামি শনাক্ত করা হয়েছে। ভিডিও এভিডেন্স গ্রহণ করার একটা ধারা আছে। সে ধারায় কোনো অসুবিধা হবে না। মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে যাবে।
রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস এসোসিয়েশনের সভাপতি মো. জিয়াউল হকের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় বক্তব্য রাখেন লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সচিব মো. মইনুল কবির, আইন ও বিচার বিভাগের সচিব মো. গোলাম সারওয়ার, নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক শহীদুল আলম ঝিনুক,এসোসিয়েশনের মহাসচিব জাহিদ হোসেন প্রমুখ।
কুমিল্লার ইকবাল সাত দিনের রিমান্ডে
কুমিল্লায় পূজামণ্ডপে কোরআন রাখার ঘটনায় গ্রেফতার ইকবাল হোসেনের উদ্দেশ্য কী ছিল, তা জানতে তাকে সাত দিন ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করবে পুলিশ।
কক্সবাজার থেকে গ্রেফতার ইকবালকে কুমিল্লায় নেয়ার পর শনিবার দুপুরে জেলা আদালতে হাজির করা হয়।
কুমিল্লার বিচার বিভাগীয় জ্যেষ্ঠ হাকিম মিথিলা জাহান নিপার আদালতে তুলে ইকবালকে ১০ দিনের জন্য হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন জানায় পুলিশ।
কুমিল্লা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) এম তানভীর হোসেন জানান, ইকবালকে সাত দিনের রিমান্ডের আদেশ দিয়েছেন বিচারক।
ইকবাল ছাড়াও আরও তিনজনকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাতদিনের জন্য হেফাজতে পেয়েছে পুলিশ।
তারা হলেন- ইকরাম হোসেন রেজাউল, হাফেজ হুমায়ুন ও ফয়সাল আহমেদ।
কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় দায়ের করা কোরআন অবমাননার মামলায় তাদের সবাইকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার ফারুক আহমেদ জানান, কুমিল্লায় পূজামণ্ডপে কোরআন রাখার ঘটনায় এ পর্যন্ত নয়টি মামলা হয়েছে এবং মোট ৫০ জনকে আটক করা হয়েছে।
ইকবালের (৩৫) বাড়ি কুমিল্লা শহরেরই সুজানগরের খানকা মাজার এলাকায়। ওই এলাকার নূর মোহাম্মদ আলমের ছেলে ইকবাল পেশায় রঙমিস্ত্রি।
দুর্গাপূজার মধ্যে গত ১৩ অক্টোবর ভোরে নানুয়া দীঘির পাড়ে দর্পন সংঘের পূজামণ্ডপে হনুমানের মূর্তির কোলে মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কুরআন রাখা দেখে এলাকায় উত্তেজনা ছড়ায়। হামলা, ভাংচুর চালানো হয় অন্তত আটটি মন্দিরে।
তার জের ধরে সেদিনই চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে মন্দিরে হামলা হয়, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয় পাঁচজন।
এর পরের কয়েকদিনে নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ কয়েকটি জেলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলা হয়। তাতে নোয়াখালীতে নিহত হয় দুজন।
এর মধ্যে কুমিল্লা পুলিশ বুধবার নানুয়া দীঘির পাড়ের দুটি সিসি ক্যামেরার ভিডিও বিশ্লেষণ করে ইকবাল নামে ওই যুবককে শনাক্তের কথা জানায়।
একটি সিসি ক্যামেরার ভিডিওতে এক যুবককে রাত ২টার পর স্থানীয় দারোগাবাড়ী শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.) এর মাজার থেকে বেরিয়ে পূজামণ্ডপের দিকে যেতে দেখা যায়, তখন তার হাতে বই জাতীয় কিছু ছিল।
এরপর ৩টা ১২ মিনিটের দিকে তাকে পূজামণ্ডপের দিক থেকে ফিরে আসতে দেখা যায় আরেক ভিডিওতে, তখন তার হাতে ছিল একটি ‘গদা’।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৩ অক্টোবর ভোরে নানুয়া দীঘির ওই পূজামণ্ডপে থাকা হনুমানের মূর্তির কোলে মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কুরআন রাখা ছিল। তখন হনুমানের মূর্তির হাতে থাকা গদাটি পাওয়া যায়নি।
এরপর বৃহস্পতিবার ইকবালকে কক্সবাজার থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
রংপুরের সাম্প্রদায়িক হামলার হোতা সৈকত ও রবিউল গ্রেফতার
সৈকত মণ্ডলের ফেইসবুক পাতায় ‘ধর্মীয় অবমাননার’ পোস্ট দেখে রংপুরের পীরগঞ্জে মানুষ জড়ো হয়ে মাঝিপাড়ায় হিন্দুদের উপর হামলা করেছিল বলে র্যাব দাবি করেছে।
আর সৈকতের বিষয়ে র্যাব বলেছে, ফেইসবুকে অনুসারীর সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্যে তিনি ‘ধর্মীয় উস্কানিমূলক’ পোস্ট দিয়েছিলেন।
পীরগঞ্জে সাম্প্রদায়িক হামলায় জড়িত অভিযোগে সৈকত মণ্ডল (২৪) ও রবিউল ইসলামকে (৩৬) গাজীপুর থেকে গ্রেপ্তারের পরদিন শনিবার সংবাদ সম্মেলন করে র্যাব।
সৈকতের নির্দেশে রবিউল পাশের মসজিদের মাইক থেকে লোকজনকে জড়ো হওয়ার জন্য প্রচার চালিয়েছিলেন বলে র্যাব জানিয়েছে।
র্যাবের মুখপাত্র কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, “সৈকত তার ব্যাক্তিগত ‘ইমেজ’ প্রচার এবং তার ফেইসবুকে ‘ফলোয়ার’ বাড়াতে উস্কানিমূলক পোস্ট দিয়ে লোকজন জড়ো করে।”
ফেইসবুকে সৈকত গত ১৭ অক্টোবর রাতে পোস্ট দিয়েছিলেন- ‘এ মুহূর্তে গ্রাম পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া সংবাদ, হিন্দুদের আক্রমণে এক মুসলিমকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে’।
দুর্গাপূজার মধ্যে কুমিল্লায় সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের পর সেই রাতে পীরগঞ্জে হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্তত ২৩টি বাড়িঘরে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
র্যাব কর্মকর্তা জানান, সৈকত পোস্ট দেয়ার পর লোকজন জড়ো হলে একটি উঁচু ঢিবির উপর দাঁড়িয়ে লোকজনকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ও রবিউল আত্মগোপনে চলে যান।
সৈকত স্থানীয় একটি কলেজের স্নাতক শ্রেণির শিক্ষার্থী, রবিউল স্থানীয় মসজিদের মুয়াজ্জিন।
এর আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছিল, হিন্দু এক তরুণের ফেইসবুকে ইসলাম ‘অবমাননাকর’ মন্তব্য দেখে স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়েছিল।
হিন্দু ওই তরুণকে ইতিমধ্যে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তার সঙ্গে দ্বন্দ্বে থাকা স্থানীয় এক মুসলমান তরুণকেও আটক করা হয়েছে।
র্যাব মুখপাত্র আল মঈন বলেন, “তাদের মধ্যে বৈরী সম্পর্ক ছিল। একবার হিন্দু তরুণ তার ফেইসবুকে ইসলাম সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করে মুসলামান তরুণের সঙ্গে দেখা করে ‘কেমন লাগে’ বলেছিল। পরে হিন্দু তরুণ একটা পোস্ট্ দিয়ে তুলে ফেললেও মুসলমান ওই তরুণ তা সেভ করে প্রচার করে দেয়।”
আর ওই মুসলমান তরুণের ফেইসবুক বন্ধু হিসেবে সৈকত ওই পোস্টটি নিয়ে নিজের ফেইসবুকে পোস্ট করেন বলে জানান আল মামুন।
পীরগঞ্জের সেই হামলার জন্য সৈকতের ‘উস্কানিমূলক প্রচার’কেই দায়ী করেন র্যাবের এই কর্মকর্তা।
সৈকতের রাজনৈতিক কোনো দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, সেই প্রশ্নে আল মঈন বলেন, তেমন কিছু তারা পাননি। সৈকত নিজেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দলের লোক পরিচয় দিলেও কোনো সংগঠনের কোনো পদে কখনও ছিলেন না। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুত বিচার,‘সংখ্যালঘু’ সুরক্ষায় আইনের দাবিতে শাহবাগে অবরোধ বিক্ষোভ
ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় আইন প্রণয়ন ও কমিশন গঠন করতে সরকারকে দুই সপ্তাহের সময় বেঁধে দিয়ে শাহবাগ ছেড়েছেন বিক্ষোভকারীরা। শুক্রবার বিকেল ৪টা থেকে প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টা শাহবাগ মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন বাংলাদেশ হিন্দু পরিষদের নেতৃত্বে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা।
সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে সেখান থেকে মশাল মিছিল নিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবে গিয়ে তাদের কর্মসূচি শেষ করা হয়।
এর আগে শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে সকাল থেকে সাম্প্রদায়িক হামলায় জড়িতদের বিচার ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচির আয়োজন করে বাংলাদেশ হিন্দু পরিষদ।
শাহবাগে বিক্ষোভ কর্মসূচি থেকে পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সাজন কুমার মিশ্র বলেন, “সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ও কমিশন গঠন করতে আমরা সরকারকে দুই সপ্তাহের আল্টিমেটাম দিচ্ছি। এই দুই সপ্তাহের মধ্যে সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়নের তৎপরতা না দেখলে আমরা প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় বরাবর পদযাত্রা কর্মসূচি ঘোষণা করব।”
অবরোধ কর্মসূচি থেকে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুত সময় সাম্প্রদায়িক হামলা বিচার, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতিটিকে ৫০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ, সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন এবং জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠনের দাবি জানানো হয়।
শাহবাগে বিক্ষোভ চলাকালে বাংলাদেশ হিন্দু আইনজীবী পরিষদের সভপতি অ্যাডভোকেট সুমন কুমার রায় বলেন, “আপনারা জানেন দেশব্যাপী সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উপর কী নারকীয় হামলা হয়েছে। প্রশাসন সেখানে তাদের দ্বায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। রাষ্ট্র সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ। সাম্প্রদায়িক হামলায় জড়িতররা বার বার পার পেয়ে যাচ্ছে।
“এর আগেও সাম্প্রদায়িক হামলায় সংখ্যালঘুরা বিচার পায়নি। হামলার কুশীলবরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। আমরা চাই, হামলার নেপথ্যে যারা জড়িত, তাদেরকেও যেন বিচারের আওতায় আনা হয়।”
এরআগে বিক্ষোভ সমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচি থেকে বিক্ষোভকারীরা ‘জাগো রে জাগো, হিন্দু জাগো’, ‘মৌলবাদের আস্তানা ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’, ‘জিহাদিদের আস্তানা ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’, ‘মন্দিরে হামলা কেন, প্রশাসন জবাব চাই’, ‘রংপুরে আগুন কেন, প্রশাসন জবাব চাই’ ইত্যাদি স্লোগান দেন।
শাহবাগের কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন), বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাসংঘ, বাংলাদেশ সনাতন কল্যাণ জোট, শারদাঞ্জালি ফোরাম, বাংলাদেশ হিন্দু লয়ার্স অর্গানাইজেশন (বিএইচএলও), আর্য প্রতিনিধি সভা বাংলাদেশ, জাগো হিন্দু পরিষদ, ঢাকা ওয়ারী রবিদাস হিন্দু কল্যাণ সংঘ, ভক্ত সংঘ, হিন্দু সংরক্ষণ ও বাস্তবায়ন পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু ফোরাম ও হিন্দু ছাত্র ফোরাম, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু সমাজ সংরক্ষণ সমিতি, ইন্টারন্যাশনাল শ্রী শ্রী হরি গুরুচাঁদ মতুয়া মিশন, ঢাকা বিভাগীয় কমিটি, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট সংহতি জানিয়ে অংশ নেয় ।দুর্গাপূজার মধ্যে গত ১৩ অক্টোবর ভোরে কুমিল্লা নানুয়া দীঘির পাড়ে দর্পন সংঘের পূজামণ্ডপে মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কুরআন রাখা নিয়ে ধর্ম অবমানানার অভিযোগ তুলে হামলা চালানো হয়। এরপর তা কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। এতে মন্দির ও পূজামণ্ডপে হামলা ও ভাংচুরের পাশাপাশি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। এসব ঘটনার পর থেকেই প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করছে হিন্দু পরিষদসহ আরও বেশ কয়েকটি সংগঠন। বিডি নিউজ।
সাম্প্রদায়িক হামলা: ভারতের সতর্ক প্রতিক্রিয়া নিয়ে বিবিসি যা বলছে
বাংলাদেশে গত কয়েকদিনে বিভিন্ন জেলায় হিন্দুদের মন্দির, পূজামন্ডপ ও ঘরবাড়িতে একের পর এক হামলার পরও প্রতিবেশী ভারতের প্রতিক্রিয়া রীতিমতো সতর্ক ও সাবধানী থেকেছে।
অথচ অতীতে একই ধরনের ঘটনায় ভারত ঘটনাস্থলে দূতাবাসের প্রতিনিধি পাঠিয়ে খোঁজখবর নিয়েছে, ভারতীয় কর্মকর্তারা গিয়ে স্থানীয় হিন্দুদের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন – কিন্তু এবারে তার কোনওটিই করা হয়নি।
বরং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শেখ হাসিনা সরকারের নেওয়া পদক্ষেপে তাদের আস্থা আছে, ভারত আপাতত এটুকু বলেই তাদের দায় সেরেছে।
দিল্লিতে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই সঙ্কটের মুহুর্তে প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে আরও বিব্রত করা সমীচীন হবে না – এই ভাবনা থেকেই ভারত এমন সংযত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।
হাসিনার ওপর দিল্লির ভরসা
বস্তুত সাম্প্রতিক অতীতে বাংলাদেশের নাসিরনগর, সিলেট বা মুরাদনগর-সহ বিভিন্ন স্থানে যেখানেই হিন্দুরা আক্রান্ত হয়েছেন, প্রায় সব ক্ষেত্রেই ভারত বেশ কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল।
এমন কী, বহু জায়গায় ভারতীয় কর্মকর্তারা গিয়ে প্রকাশ্যে বাংলাদেশের হিন্দুদের অধিকারের পক্ষেও কথা বলেছেন।
সেই তুলনায় গত সপ্তাহে কুমিল্লা, চাঁদপুর, ফেনী, চট্টগ্রামে ব্যাপক হামলা ও হিন্দুদের প্রাণহানির পরও দিল্লির প্রতিক্রিয়া কিন্তু ছিল বেশ সাবধানী।
এ পর্যন্ত ভারত রাষ্ট্র হিসেবে ওই ঘটনায় একটিই মন্তব্য করেছে – দিনপাঁচেক আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচী তার নিয়মিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে শুধু বলেছেন, “ধর্মীয় জমায়েতে হামলার ওই অপ্রীতিকর ঘটনাগুলোর বিচলিত করার মতো খবর আমাদেরও নজরে এসেছে।”

তবে শেখ হাসিনা সরকার যে পরিস্থিতি মোকাবিলায় খুব দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করেছে এবং সরকার ও সুশীল সমাজের সহযোগিতায় দুর্গাপুজো সম্পন্ন হতে পেরেছে – সেটাও তিনি একই সঙ্গে মনে করিয়ে দিয়েছেন।
বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর হামলা নিয়ে ভারতের শাসক দল বিজেপির নেতা বা এমপি-রা যেখানে লাগাতার প্রতিবাদ করে যাচ্ছেন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতেও আগুন ঝরাচ্ছেন – সেখানে তাদের দলের সরকারের এই ধরনের সংযত প্রতিক্রিয়া কিছুটা বেমানান অবশ্যই।
ভারত উদ্বিগ্ন
দিল্লির গবেষণা প্রতিষ্ঠান ভিআইএফের সিনিয়র ফেলো শ্রীরাধা দত্ত কিন্তু মনে করেন কূটনৈতিক বাস্তবতা অনুধাবন করেই ভারত সরকার প্রকাশ্যে অন্তত এধরনের একটা অবস্থান নিয়েছে।
তিনি বলছিলেন, “শেখ হাসিনা তথা বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে এই মুহুর্তে দিল্লির যা সম্পর্ক, তাতে ফোন তুলে যে কোনও সময় সব কথাই বলা যায়, এবং বলাও হয়। কমিউনিকেশন চ্যানেলগুলো সব চালুই আছে।”
“বাংলাদেশের ঘটনায় ভারতের উদ্বেগ অবশ্যই আছে, কিন্তু তা নিয়ে প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে সে দেশের সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলাটা আমাদের উদ্দেশ্য নয়।”
গোয়েন্দা তথ্যর অভাব :
“উনি তো ইতিমধ্যে বলেইছেন এই সব ঘটনায় দোষীরা কেউ ছাড় পাবে না … কিন্তু সেটা বাদ দিলেও ভারতের একটা উপলব্ধি আছেই যে এটা যদি কেউ অ্যাড্রেস করতে পারেন তো সেটা শেখ হাসিনাই পারবেন।”
“ফলে এই মুহুর্তে তাঁকে আরও কোণঠাসা না-করাই ভারতের লক্ষ্য। কিন্তু বিবৃতি না-দিলেও যতদূর জানি, ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশে তাঁদের পর্যায়ে বিষয়টা নিয়ে নিয়মিত যোগাযোগে আছেন।”
এর পাশাপাশি হিন্দুদের ওপর হামলা যেভাবে খুব অল্প সময়ের ভেতর বাংলাদেশের একটা বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল, সেই ঘটনার ব্যাপকতাও অপ্রত্যাশিত ছিল, ছিল না তেমন গোয়েন্দা তথ্যও।
আর সেটাই দিল্লিকে বেশ কিছুটা হতচকিত করে দিয়েছিল – বিবিসিকে বলছিলেন শ্রীরাধা দত্ত।
তাঁর কথায়, “আমাদের থিঙ্কট্যাঙ্ক লেভেলেও বিষয়টা নিয়ে খুব সমালোচনা হচ্ছে। কীভাবে এত বড় হামলা হতে পারল, কেই আগেভাগে কিছু জানতেই পারল না – এটা নিয়েও নানা রকম প্রশ্ন উঠছে।”
পরিকল্পিত হামলা?
“বাংলাদেশে বিচ্ছিন্নভাবে হিন্দুদের ওপর হামলা আগেও হয়েছে, কিন্তু এবারের হামলার ধরন দেখে মনে হচ্ছে খুব পরিকল্পিতভাবে একটা যেন সংগঠিত আক্রমণ চালানো হয়েছে।”
“দুর্গাপুজোর মন্ডপে হামলা বা মন্দিরে ভাঙচুরের ঘটনাও নতুন কিছু নয় – কিন্তু এইবারে যেটা হয়েছে তা নজিরবিহীন!”, মন্তব্য শ্রীরাধা দত্তর।
ঢাকায় ভারতের প্রাক্তন হাই কমিশনার ও সাবেক কূটনীতিবিদ পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী আবার মনে করছেন, বাংলাদেশে যা ঘটেছে তা একটা বৃহত্তর হাসিনা-বিরোধী ষড়যন্ত্রের অংশ বলেই ভারতের বিশ্বাস, আর এই পরিস্থিতিতে দিল্লি সর্বতোভাবে তাঁর পাশে দাঁড়াতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক।

হাসিনা-বিরোধী ষড়যন্ত্র?
মি চক্রবর্তী বিবিসিকে বলছিলেন, “এর পেছনে যে গভীর ষড়যন্ত্র আছে, সেটা ভারত ভালই বুঝতে পেরেছে। আর সেই ষড়যন্ত্রের লক্ষ্য হল সাম্প্রদায়িক তাস ব্যবহার করে শেখ হাসিনাকে অপ্রস্তুত করা।”
“এখন যদি ভারত এই ঘটনার কঠোর নিন্দা করে বিবৃতি দিতে যায় সেটা তো প্রকারান্তরে হাসিনা সরকারেরই নিন্দা করা হয়ে যাবে। কিন্তু তাতে ভারতের কোনও উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে না।”
“কিন্তু ভারত শেখ হাসিনাকে এই বার্তাটা অবশ্যই পাঠাচ্ছে যে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনুন – এবং তাঁকে আমরা যতটুকু চিনি, তাতে এটাও জানি যে তিনি অবশ্যই সেটা করবেন।”
তালেবান ও পাকিস্তানের প্রভাব?
এর পাশাপাশি আফগানিস্তানের ক্ষমতায় তালেবানের প্রত্যাবর্তন ও পাকিস্তানের ভূমিকাও বাংলাদেশের এই সব ঘটনায় প্রভাব ফেলেছে বলে পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তীর বক্তব্য।
তিনি বলছিলেন, “কাবুলে যা ঘটেছে তাতে বাংলাদেশের ইসলামপন্থীরা যে উৎসাহিত বোধ করছে তা তো অস্বীকার করা যাবে না। ইসলামী নেটওয়ার্ক যেগুলো আছে, তাতেও পাকিস্তানের হাত আছে এবং সেখান থেকে রোজ গরম গরম কথা বলা হচ্ছে।”
“এরা যেমন লাগাতার ভারত-বিরোধী প্রচার চালাচ্ছে, তেমনি হাসিনাকেও ভারতের চাটুকার হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হচ্ছে। এর কোনওটাই অবশ্য নতুন কথা নয় – কিন্তু বাংলাদেশে ইদানীং এরা আবার নতুন করে মাথা চাড়া দিচ্ছে”, মন্তব্য মি চক্রবর্তীর।
পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের বাড়বাড়ন্ত ঠেকানো ভারতেরও প্রায় ঘোষিত লক্ষ্যের মধ্যে পড়ে – আর সেই উদ্দেশ্য পূরণে শেখ হাসিনা ছাড়া আর কারও ওপর ভরসা রাখা ভারতের পক্ষে সম্ভবই নয়।
সে কারণেই সম্ভবত, গত দশ দিনে বাংলাদেশে শত শত হিন্দু আক্রান্ত হলেও তার জন্য সে দেশের সরকারের মৃদু সমালোচনা করেও ভারত একটি কথাও বলেনি। শুভজ্যোতি ঘোষ, বিবিসি বাংলা।











