কর্মক্ষেত্রে হিজাব বা যে কোনো ধর্মীয়, রাজনৈতিক কিংবা দার্শনিক বিশ্বাসের প্রকাশ ঘটানো পরিধেয়র ওপর ‘ক্ষেত্রবিশেষে’ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যাবে বলে রায় দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ আদালত।
বৃহস্পতিবার এই রায়ে ইউরোপিয়ান কোর্ট অব জাস্টিস বলেছে, চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান যদি মনে করে যে, ভোক্তা, ক্রেতা বা সেবাগ্রহীতার সামনে নিজেদের ‘নিরপেক্ষভাবে’ উপস্থাপন করার জন্য কিংবা কোনো ধরনের ‘সামাজিক বিতর্ক’ এড়ানোর জন্য হিজাব বা ধর্মীয় বিশ্বাসের চিহ্নসূচক যে কোনো পরিধেয়র ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা প্রয়োজন, তাহলে তা আরোপ করা যেতে পারে।

তবে আদালত এও বলেছে, নিষেধাজ্ঞা আরোপের ‘প্রয়োজন’ সত্যিই আছে কিনা, চাকরিদাতা কর্তৃপক্ষকে সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে। আর ইউরোপী ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আদালত এ ধরনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো জাতীয় পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় নিতে পারে। ধর্মচর্চার সাংবিধানিক অধিকারকে সুরক্ষা দিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে আরও উদার অবস্থানও দেখাতে পারে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কাজের সময় হিজাব পরার কারণে জার্মানিতে দুই মুসলমান নারীকে বরখাস্ত করার ঘটনার জেরে এই মামলা ইউরোপিয়ান কোর্ট অব জাস্টিসে আসে।
ওই দুই নারীর একজন হামবুর্গে একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের ‘শিশুযত্ন কেন্দ্রে’ কাজ করতেন। অন্যজন কাজ করতেন ওষুধের দোকানে।
চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় তারা হিজাব পরতেন না। কিন্তু কয়েক বছর পর মাতৃত্বকালীন ছুটি থেকে কাজে ফেরার সময় তারা হিজাব পরা শুরু করেন।
প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তাদের তখন বলা হয়, হিজাব পরে কাজে আসা চলবে না। তা না মানায় তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বলা হয়, এ নিয়ম না মানলে তারা অন্য কাজ খুঁজে নিতে পারে।
রায় দিতে গিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আদালতকে দুটো বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়েছে। হিজাব পরায় নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে কর্মীর ধর্ম চর্চার স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কি না এবং কর্তৃপক্ষের দিক থেকে ‘ধর্মীয় নিরপেক্ষতা’ বজায় রেখে ব্যবসা পরিচালনার স্বাধীনতা কতটা থাকছে।
আদালত তার সিদ্ধান্তে বলেছে, প্রতিষ্ঠানের ‘নিরপেক্ষ’ ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য যদি ‘সত্যিই প্রয়োজন হয়’, তাহলে এরকম নিষেধাজ্ঞা দেওয়া যায়।
কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক, দার্শনিক কিংবা ধর্মীয় বিশ্বাস প্রকাশ পায়- এমন দৃশ্যমান কোনো কিছু কর্মক্ষেত্রে পরার ওপরই এরকম নিষেধাজ্ঞা দেওয়া যেতে পারে।
শিশুযত্ন কেন্দ্রের কর্মীর মামলায় আদালত জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞার ওই নির্দেশনা সাধারণভাবে এবং নির্বিশেষে সবার ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য ছিল। ওই দাতব্য সংস্থা একজন খ্রিস্টান কর্মীর ক্রুশও সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিল। অর্থাৎ এক্ষেত্রে তারা কোনো বৈষম্য করেনি।
ইউরোনিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউরোপীয় আদালত এটা স্পষ্ট করেছে যে, কর্মক্ষেত্রে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা যদি সব ধর্মের বিশ্বাসীদের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হয়, তাহলে সেখানে বৈষম্য হয়েছে বলা যাবে না।
কিন্তু কেবল হিজাব, মাথা ঢাকা স্কার্ফ বা এরকম দৃশ্যমান কোনো বস্ত্রখণ্ড বা চিহ্নের ওপর যদি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়, তাহলে তাতে সরাসরি বৈষম্য করা হবে এবং ওই ধরনের নিষেধাজ্ঞা যৌক্তিক হবে না, কারণ তাতে শুধুমাত্র ধর্মবিশ্বাসের কারণে কোনো কোনো কর্মীকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে দেখা হবে।
আবার, কেনো চাকরিদাতা হয়ত ধর্মীয়, রাজনৈতিক কিংবা দার্শনিক বিশ্বাসের প্রকাশ ঘটানো সব কিছু তার কর্মক্ষেত্রে নিষিদ্ধ করতে চাইতে পারেন, সেটা করার আইনগত অধিকারও হয়ত তার থাকতে পারে, কিন্তু এক্ষেত্রে শুধু তার ‘ইচ্ছাই’ যথেষ্ট নয়। আদালত বলেছে, ওই নিষেধাজ্ঞা তখনই দেওয়া যৌক্তিক হবে, যদি সেটা ‘সত্যিই প্রয়োজন’ হয়।
যে ধরনের পেশা বা কাজের ক্ষেত্রে সবার সামনে প্রতিষ্ঠানকে নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করার বৈধ তাগিদ থাকে, সেসব ক্ষেত্রে এরকম নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার যৌক্তিক কারণ ঘটতে পারে। যেমন শিক্ষাক্ষেত্রে। অভিভাবকরা চাইতে পারেন যে তার সন্তানকে এমন কেউ পড়াক, যার ধর্মীয় বিশ্বাস শিক্ষার্থীর সামনে দৃশ্যমান হবে না।
ইউরোপিয়ান কোর্ট অব জাস্টিস বলেছে, চাকরিদাতা কর্তৃপক্ষকে এটাও প্রমাণ করতে হবে যে, ওই ধরনের নিষেধাজ্ঞা না দিলে তা তার প্রতিষ্ঠানের ক্ষতির কারণ হবে।
এ ধরনের নিষেধাজ্ঞার বিষয়গুলো যৌক্তিক হচ্ছে কি না, তা জাতীয় নীতির ভিত্তিতে বিবেচনা করবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলো।
এ দুটো মামলার ক্ষেত্রেও কর্মীদের হিজাব পরার ওপর ওই নিষেধাজ্ঞা বৈষম্যমূলক ছিল কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জার্মানির আদালতকেই দিতে হবে।
এর আগে ২০১৭ সালেও এক রায়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আদালত বলেছিল, হিজাব বা অন্যান্য দৃশ্যমান ধর্মীয় প্রতীক পরার ক্ষেত্রে কোনো কোম্পানি ‘বিশেষ পরিস্থিতিতে’ নিষেধাজ্ঞা দিতে পারবে। ওই রায় নিয়ে ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছিল সে সময়।
জার্মানিতে ৫০ লাখেরও বেশি মুসলমানের বসবাস। কর্মক্ষেত্রে ‘হিজাব নিষিদ্ধ’ করা নিয়ে কয়েক বছর ধরেই দেশটিতে উত্তপ্ত বিতর্ক চলছে।
ইউরোপের অন্যান্য দেশেও কর্মক্ষেত্রে ‘হিজাব পরায়’ নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার বিষয়ে আদালতকে বিভিন্ন সময়ে নির্দেশনা দিতে হয়েছে।
২০১৪ সালে ফ্রান্সের শীর্ষ আদালত কঠোর নিরপেক্ষতার দাবি জানিয়ে একটি ডে কেয়ার সেন্টারের মুসলিম নারীকে ‘হিজাব’ পরার কারণে বরখাস্ত করার আদেশ বহাল রাখে।
তার আগে ২০০৪ সালে স্কুলে মেয়েদের মাথা ঢাকার কাপড় হিসেবে হিজাব ব্যবহার নিষিদ্ধ করে ফ্রান্স, যেখানে ‘সংখ্যালঘু’ হিসেবে ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুসলমানের বসবাস।
তবে অস্ট্রেলিয়ার সাংবিধানিক আদালত এক রায়ে জানিয়েছে, স্কুলে ১০ বছরের বেশি বয়সী মেয়েদের হিজাব পরায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার নির্দেশনা ‘বৈষম্যমূলক’। বিডি নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
ক্ষেত্রবিশেষে হিজাব বা ধর্মীয় প্রতীকে নিষেধাজ্ঞা দেয়া যাবে, তবে কোনো বৈষম্য করা যাবে না, ইউরোপিয়ান কোর্ট অব জাস্টিসের রায়
আইনের শাসন ছাড়া কোনো দেশ এগিয়ে যেতে পারে না, বিচারালয় যেন বাণিজ্যালয়ে পরিণত না হয়: শেষ কর্মদিবসে বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকী
আপিল বিভাগের বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকী বলেছেন, আইনের শাসন ছাড়া কোনো দেশ এগিয়ে যেতে পারে না। বিচারালয় কোনো অবস্থাতেই যাতে বাণিজ্যালয়ে পরিণত না হয়—এটি বার ও বেঞ্চ উভয়কে শক্তভাবে রুখতে হবে। বিচারিক জীবনের শেষ কর্মদিবসে বৃহস্পতিবার তিনি ভার্চ্যুয়াল এক বিদায়ী বক্তব্যে এসব কথা বলেন। অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে তাকে বিদায় সংবর্ধনা জানানো হয়।
২৮ জুলাই ৬৭ বছর পূর্ণ হবে আপিল বিভাগের এই বিচারপতির। সুপ্রিম কোর্টের রুলস অনুযায়ী আগামী ১৮ থেকে ২৯ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন ছুটি নির্ধারিত। আর আগামী দুইদিন (শুক্র ও শনিবার) সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় বৃহস্পতিবার ছিল বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকীর শেষ কর্মদিবস। এর মধ্য দিয়ে এই বিচারপতির ৪১ বছরের বিচারিক কর্মজীবনের ইতি ঘটতে যাচ্ছে। প্রথা অনুসারে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রথমে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন ও পরে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে সমিতির সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস বিদায়ী বিচারপতির কর্মময় জীবন তুলে ধরে বক্তব্য দেন। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, আপিল বিভাগের বিচারপতিরা ও সিনিয়র আইনজীবীরা এতে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত ছিলেন।
বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকী বলেন, ‘বিচারকাজ সম্পাদন মূলত আইনজীবী ও বিচারকের রসায়ন, পাখির দুটি ডানার মতো, একটি ডানা দিয়ে উড়তে পারে না। যৌথ প্রচেষ্টার এই অভিযাত্রার মূল উদ্দেশ্য একটাই, তা হলো সাংবিধানিক সংরক্ষণ, প্রতিপালন ও সমর্থন করা। বিদায়ক্ষণে সবাইকে আহ্বান জানাই আসুন একটি সুস্থ, সরল, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক বিচার বিভাগের অবকাঠামো আমরা রচনা করে যাই,…জনমনে আমাদের ভাবমূর্তির দুর্ভিক্ষ দূরীভূত হয়।’
‘মনীষীরা বলেন, পৃথিবীতে তিনটি বেহেশতি জায়গার মধ্যে একটি বিচারালয়’ উল্লেখ করে বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকী বলেন, ‘আজ বিচারিক জীবনের ইতি টানছি। এই মুহূর্তে আমি আপনাদের কাছে একটি দাবি রেখে যেতে চাই, বিচারপ্রার্থীদের এই স্বর্গীয় আশ্রয়স্থল, এই বিচারালয় কোনো অবস্থাতেই যাতে বাণিজ্যালয়ে পরিণত না হয়। এটি বার ও বেঞ্চের উভয়কে শক্তভাবে রুখতে হবে।’
বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকী বলেন, ‘বিচারিক জীবনের ৪১ বছরের দায়িত্বের হিসাব আর থাকছে না। দায়িত্ব ছিল এই দেশের প্রতি, জনগণের প্রতি আমি কতটুকু দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি, তা বিচারের ভার আপনাদের ওপর ন্যস্ত। বিচারিক জীবনের শেষ সময়ে সবাইকে আবারও মনে করিয়ে দিতে চাই, ‘আইনের শাসন ছাড়া কোনো দেশ এগিয়ে যেতে পারে না। বাংলাদেশের উন্নয়নের যে অগ্রযাত্রা চলছে, তার সফল অংশীদার হবে এই বিচার বিভাগ।’
শুরুতে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, ‘সর্বোচ্চ আদালতে যে কজন মুক্তিযোদ্ধা বিচারপতি আছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকী। ২০১৮ সালের ৯ অক্টোবর তিনি আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে উন্নীত হন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি অনন্য নজির স্থাপিত হয়।
যেখানে দুজন সহোদর ভাই একই সঙ্গে আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর কনিষ্ঠ ভাই আপিল বিভাগের বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।’
বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকী ১৯৫৪ সালের ২৯ জুলাই কুষ্টিয়া জেলার খোকসা উপজেলার রমানাথপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি ও এলএলবি পাস করেন। ১৯৭৯ সালে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়ে কুষ্টিয়ায় আইন পেশা শুরু করেন। ১৯৮০ সালের ২৩ এপ্রিল জুডিশিয়াল সার্ভিসে তৎকালীন মুনসেফ হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৯৭ সালের ৭ মে তিনি জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে পদোন্নতি পান। পরবর্তী সময়ে তিনি সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালের ৩০ জুন হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। ২০১১ সালের ৬ জুন তিনি হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি হিসেবে স্থায়ী হন। ২০১৮ সালের ৯ অক্টোবর আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকী।
যাবজ্জীবন মানে ৩০ বছর কারাদণ্ড, মানবতাবিরোধী অপরাধিরা এ সুযোগ পাবেন না, আপিল বিভাগের রায় প্রকাশ
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মেয়াদ ৩০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। রায়ে যদি আমৃত্যু উল্লেখ না থাকে সে ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হিসেবে ৩০ বছর সাজা খাটতে হবে আসামিকে। গত বছরের ডিসেম্বরে দেয়া আপিল বিভাগের এই রায়টি বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
যাবজ্জীবন কারদণ্ড নিয়ে যে বিভ্রান্তি ও ধোঁয়াশার সৃস্টি হয়েছিলো আপিল বিভাগের এই রায়ের ফলে বিষয়টি স্পষ্ট হলো বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ গত বছরের ১লা ডিসেম্বর এই রায় দিয়েছিলেন । ৭ সদস্যবিশিষ্ট বেঞ্চের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিদের মতামতের ভিত্তিতে আপিল বিভাগেরই একটি রায়ের রিভিউ আবেদন নিষ্পত্তি করে এ রায় ঘোষণা করেছিলেন। ওই রায়ের কপিতে বিচারকদের স্বাক্ষরের পর বৃহস্পতিবার ১২০ পৃষ্ঠার রায়ের অনুলিপি প্রকাশ করা হলো।
রায়ে বলা হয়েছে, প্রাথমিক অর্থে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মানে হলো, দণ্ডিত ব্যক্তি তার স্বাভাবিক জীবনের বাকি সময় কারাভোগ করবেন। দণ্ডবিধির ৪৫ এবং ৫৩ ধারার সঙ্গে দণ্ডবিধির ৫৫ ও ৫৭ ধারা এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫ (ক) মিলিয়ে দেখলে যাবজ্জীবন সাজা হয় ৩০ বছর।
এতে বলা হয়, কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল অথবা ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে গঠিত ট্রাইব্যুনাল যদি কোনো আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়, সেক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫ (ক) ধারা অনুযায়ী সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি সুবিধা (রেয়াত) পাবেন না।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালে সাভারে জামান নামে এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় ২০০৩ সালের ১৫ অক্টোবর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল এক রায়ে আতাউর মৃধা ওরফে আতাউর ও আনোয়ার হোসেন নামে দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়। আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) ও আপিলের শুনানি শেষে ২০০৭ সালের ৩০ অক্টোবর হাইকোর্টের রায়ে দু’জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে। হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা আপিল করলে ২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তখনকার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার (এস কে সিনহা)নেতৃত্বে গঠিত আপিল বিভাগ দুই আসামির মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। পাশাপাশি যাবজ্জীবন মানে ‘আমৃত্যু কারাবাস’সহ সাতটি অভিমত দেয় সর্বোচ্চ আদালত।
২০১৭ সালের ২৪ এপ্রিল পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার পর আপিল বিভাগের দেওয়া ওই রায়ের বিরুদ্ধে আসামি আতাউর মৃধা রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করেন। রিভিউ আবেদনে আসামি পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন। তার সঙ্গে ছিলেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন প্রয়াত অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।
আসামিপক্ষের আইনজীবীদের যুক্তি ছিল, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মূল লক্ষ্য দণ্ডিত ব্যক্তির সংশোধন ও সংস্কার। দণ্ডবিধিতে আমৃত্যু কারাদণ্ড নামে কোনো দণ্ড নেই। প্রচলিত ফৌজদারি আইন ও কারাবিধি অনুযায়ী যাবজ্জীবন মানে ৩০ বছর সাজা। আসামি রেয়াত পেলে ওই সাজা কমে হয় সাড়ে ২২ বছর। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অর্থ ‘আমৃত্যু কারাদণ্ড’ হলে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫ (এ) এবং জেলকোডের সংশ্লিষ্ট বিধান অকার্যকর হয়ে যায়।
পরে এ বিষয়ে মতামত জানতে সর্বোচ্চ আদালত পাঁচ জন অ্যামিকাস কিউরির (আদালতের বন্ধু) বক্তব্য শোনে। তারা হলেন অ্যাডভোকেট আব্দুর রেজাক খান, ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ, অ্যাডভোকেট মুনসুরুল হক চৌধুরী, এ এফ হাসান আরিফ ও অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিন।
আইনজীবী তালিকাভুক্তির মৌখিক পরীক্ষা স্থগিত
করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যু ঊর্ধ্বগতিতে থাকায় সরকার ঘোষিত লকডাউন ও বিধিনিষেধের কারণে আইনজীবী তালিকাভুক্তির মৌখিক পরীক্ষা স্থগিত করেছে বার কাউন্সিল।
বৃহস্পতিবার বার কাউন্সিলের সচিব মো. রফিকুল ইসলামের সাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ৩০ জুন জারি করা বিজ্ঞপ্তির ধারাবাহিকতায় সংশ্লিষ্ট সকলের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, কোভিড-১৯ মহামারির কারণে সরকার ঘোষিত কঠোর লকডাউন ও এই সংক্রান্ত বিধিনিষেধ চলমান থাকার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের আসন্ন ২৫ জুলাই থেকে অনুষ্ঠেয় অ্যাডভোকেটশিপ তালিকাভুক্তির মৌখিক পরীক্ষা স্থগিত করা হলো। আরও উল্লেখ্য, যারা বার কাউন্সিলের সর্বশেষ অনুষ্ঠিত দুইটি এনরোলমেন্ট মৌখিক পরীক্ষার যে কোনোটিতে (নভেম্বর, ২০১৮ ও এপ্রিল, ২০১৬ অনুষ্ঠিত) অনুত্তীর্ণ হয়েছেন/অংশগ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের রি-অ্যাপিয়ার ফরম ফিলাপ কার্যক্রমও বর্ণিত কারণে স্থগিত করা হলো। মৌখিক পরীক্ষার তারিখ ও রি-অ্যাপিয়ার ফরম ফিলাপের সময়সূচি পরবর্তীতে ঘোষণা করা হবে। মৌখিক পরীক্ষা সংক্রান্ত সকল বিজ্ঞপ্তি বার কাউন্সিলের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে।
ফেইসবুকে প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ চেয়ে পোস্ট দেয়ায় আইনজীবীকে আপিল বিভাগের তলব, আইন পেশায় বিরত থাকার নির্দেশ
প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের পদত্যাগ দাবি করে ফেইসবুকে ‘অবমাননাকর’ মন্তব্য করায় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আশরাফুল ইসলাম আশরাফকে তলব করেছে আপিল বিভাগ।
ফেইসবুকে অবমাননাকর পোস্ট দেওয়ার কারণে তার বিরুদ্ধে কেন আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হবে না, আপিল বিভাগে হাজির হয়ে সেই ব্যাখ্যা দিতে হবে তাকে।

(ফেইসবুকে যা লিখেছিলেন আইনজীবী আশরাফুল ইসলাম)
আগামী ৮ অগাস্ট সকাল সাড়ে ৯টায় আপিল বিভাগে (এক নম্বর বিচার কক্ষে) সশরীরে হাজির হয়ে তাকে ব্যাখ্য দিতে বলা হয়েছে।
সেই সঙ্গে ওইদিন পর্যন্ত তাকে আইন পেশা থেকে বিরত থাকতে বলেছে সর্বোচ্চ আদালত।
আর বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) আইনজীবী আশরাফের ওই ফেইসবুক পোস্ট অপসারণ করে তার সবগুলো ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বৃহস্পতিবার আইনজীবী আশরাফুল ইসলাম আশরাফের ফেইসবুক পোস্টটি নজরে আনলে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন ছয় বিচারকের আপিল বেঞ্চ এ আদেশ দেয়।
আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারক মোহাম্মদ ইমান আলী আদেশে বলেন, “আইনজীবী মো. আশরাফুল ইসলাম আশরাফের ফেইসবুক স্টেটমেন্ট মারাত্মক অবমাননাকর। তার এই স্টেটমেন্ট সরাসরি প্রধান বিচারপতি এবং সুপ্রিম কোর্টকে আঘাত করেছে।”

(ব্যারিস্টার আশরাফুল ইসলাম)
পরে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, “মাননীয় প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ ও উনার সমালোচনা করে গতকাল পোস্ট দিয়েছিলেন আইনজীবী আশরাফুল ইসলাম আশরাফ। কয়েকজন আইনজীবী সেটা আমাকে দেখিয়েছেন। আজ আমি এটা আদালতের নজরে আনলে বিচারপতি মহোদয়রা খুব উষ্মা প্রকাশ করেছেন এই ধরনের কার্যকলাপে।”
তিনি বলেন, “উনাকে (আশরাফ) তলব করা হয়েছে। আগামী ৮ অগাস্ট সকাল সাড়ে ৯টায় তাকে সশরীরে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিতে হবে, কেন তার বিরুদ্ধে আদালত অবমানার অভিযোগ এনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না। তাকে আইন পেশা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। আপাতত কোনো কোর্টে সে কোনো মামলা করতে পারবে না। আর বিটিআরসিকে আদালত বলেছেন, তার ফেইসবুক অ্যাকাউন্টগুলো ব্লক করতে।”
আইনজীবী আশরাফুল ইসলাম আশরাফ বলেছেন, সর্বোচ্চ আদালতের আদেশ তিনি ইতোমধ্যে জেনেছেন।
“আমি দেশের সাধারণ আইনজীবীদের স্বার্থের কথা চিন্তা করেই ফেইসবুকে পোস্ট দিয়েছি। এই পোস্ট দিয়ে আমি মোটেও হীনমন্য নই, আমি গর্বিত। আদালতের সামনে এসে আমি আমার ব্যাখ্যা দেব।”
অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বিষয়টি আদালতের নজরে আনার সময় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস কাজলও আদালতে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন। সূত্র- বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
বৃহস্পতিবার থেকে ভার্চুয়ালি চলবে হাইকোর্ট ও নিম্ন আদালতে বিচারকাজ
চলমান কঠোর বিধিনিষেধ শিথিলের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার (১৫ জুলাই) থেকে হাইকোর্ট ও নিম্ন আদালতে বিচারকাজ ভার্চুয়ালি চলবে। হাইকোর্টে বিচার কাজ পরিচালানার জন্য ৩৮ বেঞ্চ গঠন করে দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। আর সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. আলী আকবর জারি করা সার্কুলারে বলা হয়েছে, ১৫ জুলাই থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত শারীরিক উপস্থিতি বাদ রেখে তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভার্চুয়াল উপস্থিতির মাধ্যমে অধস্তন আদালতে বিচারকাজ চলবে।
বুধবার (১৪ জুলাই) হাইকোর্টে ৩৮ বেঞ্চ গঠনের বিষয়ে প্রধান বিচারপতির আদেশ সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
আদেশে বলা হয়, শারীরিক উপস্থিতি ছাড়া শুধু আগামী ১৫ জুলাই সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল সোয়া ৪টা পর্যন্ত ভার্চুয়াল উপস্থিতির মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগের বিচার কাজ পরিচালনার জন্য বেঞ্চগুলো গঠন করা হলো। অবকাশকালীন ছুটি শুরুর আগের দিন এই ৩৮টি বেঞ্চে ভার্চুয়ালি বিচার কাজ চলবে। এরপর শুক্রবার (১৬ জুলাই) ও শনিবার (১৭ জুলাই) সাপ্তাহিক ছুটির কারণে বিচারকাজ বন্ধ থাকবে। তারপর আগামী ১৮ জুলাই (রোববার) থেকে ২৯ জুলাই (বৃহস্পতিবার) পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন ছুটি চলবে।
এদিকে অবকাশকালে বিচারকাজ পরিচালনার জন্য হাইকোর্টে চারটি বেঞ্চ গঠন করে দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। বেঞ্চগুলো হলো- অতি জরুরি সব রিট মোশন ও দেওয়ানি মোশন আবেদন গ্রহণ করবেন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম। অতি জরুরি সব ফৌজদারি মোশন আবেদন গ্রহণ করবেন বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আশরাফুল কামাল। আর কোম্পানি ও অ্যাডমিরালিটি সংক্রান্ত আবেদন গ্রহণ করবেন বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের।
নিম্ন আদালত সম্পর্কে নির্দেশনা:
বৃহস্পতিবার থেকে সারাদেশের নিম্ন আদালতে বিচারকাজ চলবে ভার্চুয়ালি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শারীরিক উপস্থিতিতেও পরিচালনা করা যাবে বিচারকাজ।

বুধবার (১৪ জুলাই) প্রধান বিচারপতির নির্দেশক্রমে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. আলী আকবর এ বিষয়ে সার্কুলার জারি করেছেন।
সার্কুলারে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসজনিত পরিস্থিতিতে আগামী ১৫ জুলাই থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত শারীরিক উপস্থিতি বাদ রেখে তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভার্চুয়াল উপস্থিতির মাধ্যমে দেশের অধস্তন দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত এবং ট্রাইব্যুনালসমূহ কর্তৃক ‘তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার আইন ২০২০’ এবং এই কোর্ট কর্তৃক জারিকৃত এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি অনুসরণপূর্বক সব দেওয়ানি ও ফৌজদারি দরখাস্ত/আপিল/রিভিশন/বিবিধ মামলাসহ শুনানি গ্রহণও (সাক্ষ্য গ্রহণ বাদে) নিষ্পত্তি করবেন।
আরও বলা হয়, স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণপূর্বক শারীরিক উপস্থিতিতে অধস্তন দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত এবং ট্রাইব্যুনালসমূহে মামলা দায়ের করা যাবে। স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনপূর্বক সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে শারীরিক উপস্থিতিতে সাক্ষ্যগ্রহণপূর্বক সাকসেশন ও অভিভাবকত্ব নির্ধারণ বিষয়ক মামলা শুনানি ও নিষ্পত্তি করা যাবে।
‘ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তি/ব্যক্তিগণ অধস্তন ফৌজদারি আদালত এবং ট্রাইব্যুনালসমূহে শারীরিক উপস্থিতিতে আত্মসমর্পণ আবেদন দাখিল করতে পারবেন। এক্ষেত্রে শুনানি কার্যক্রমের পদ্ধতি ও সময়সূচি এমনভাবে নির্ধারণ ও সমন্বয় করতে হবে যাতে আদালত প্রাঙ্গণে এবং আদালত ভবনে জনসমাগম না ঘটে। আত্মসমর্পণ দরখাস্ত শারীরিক উপস্থিতিতে শুনানির সময় অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং তার পক্ষে নিযুক্ত আইনজীবী ছাড়া অন্য কোনো আইনজীবী এজলাস কক্ষে অবস্থান করবেন না। একটি আত্মসমর্পণের শুনানি শেষে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী এজলাসকক্ষ ত্যাগ করার পর বিচারক/ম্যাজিস্ট্রেট পরবর্তী আত্মসমর্পণের দরখাস্ত শুনানির জন্য গ্রহণ করবেন।’
সার্কুলারে বলা হয়েছে, অধস্তন আদালত ও ট্রাইব্যুনালে জামিন শুনানিকালে এবং মামলার অন্যান্য কার্যক্রমে হাজতি আসামিদের কারাগার থেকে প্রিজনভ্যান বা অন্য কোনোভাবে আদালতকক্ষে হাজির না করার নির্দেশ দেওয়া হলো। হাজতি আসামির রিমান্ড শুনানির ক্ষেত্রে কারাগারে ভিডিও কনফারেন্সের লিংক প্রেরণ করে শুনানি গ্রহণকারী ম্যাজিস্ট্রেট আসামিকে কারাগার কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় ভার্চুয়ালি দেখে রিমান্ড শুনানি করতে পারবেন।
সার্কুলারে বলা হয়, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় প্রত্যেক চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট/চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এক বা একাধিক ম্যাজিস্ট্রেট যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণপূর্বক শারীরিক উপস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করবেন।
ফুড কারখানায় আগুনে মৃত্যু: ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর ভূমিকায় অসন্তোষ হাইকোর্টের, নারায়ণগঞ্জ আদালতে ২ আসামির জামিন
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজের কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনায় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর ভূমিকা নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট।
বুধবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের বিশেষ হাইকোর্ট বেঞ্চ এই অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এর আগে শ্রমিকদের বকেয়া বেতনের বিষয়টি হাইকোর্টের নজরে আনেন আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন। শুনানিতে অংশ নেন ব্যারিস্টার অনিক আর হক।

হাইকোর্ট বলেন, এতজন শ্রমিক মারা গেলেন, এফবিসিসিআইসহ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো কোনো শোক জানাল না। শোক জানিয়ে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর কোনো বিবৃতি চোখে পড়ল না। কোনো বিবৃতি দেখি নাই। তাদের ন্যূনতম দায়বদ্ধতা নেই। তারা আছেন শুধু সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় আর ব্যাংকের ঋণ লোন কীভাবে মওকুফ পাওয়া যায় সে চেষ্টায়।
হাইকোর্ট আরও বলেন, এফবিসিসিআই শ্রমিকদের মৃত্যুর বিষয়ে শোক জানাল না। তাদের কোনো প্রতিনিধি দল সেখানে গেল না। আমার মনে হয় এফবিসিসিআইসহ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর রোল প্লে করার প্রয়োজন এসব ক্ষেত্রে। ঠিকমতো ফ্যাক্টরিগুলো রান করছে কি না। কোথায় কী দুর্বলতা এগুলো তাদের দেখা উচিত।
বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম বলেন, ব্যক্তিগতভাবে আমি পত্রপত্রিকা ফলো করার চেষ্টা করি। তাদের (ব্যবসায়ী সংগঠন) কোনো পজিটিভ ভূমিকা দেখি না। আমার মনে হয় যে আমাদের এই জায়গাগুলোতে কাজ করার সুযোগ আছে।
২ ছেলের জামিন, বাবাসহ কারাগারে ৬ :
সেজান জুস কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় দুজনকে জামিন দিয়েছেন আদালত। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান আবুল হাসেমসহ গ্রেপ্তার ৮ জনের মধ্যে বাকি ৬ জনের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
চার দিনের রিমান্ড শেষে বুধবার বিকালে তাদের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফাহমিদা খাতুনের আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় আসামিপক্ষ সব আসামির জামিনের আবেদন করলে আদালত শুনানী শেষে দুই জনের জামিন মঞ্জুর করেন।
জামিন প্রাপ্তরা হলেন, আবুল হাশেমের ছেলে তাওসীব ইব্রাহীম (৩৩) ও তানজীম ইব্রাহীম (২১)। কারাগারের পাঠানো আসামিরা হলো- সজীব গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. আবুল হাসেম (৭০), তার ছেলে হাসীব বিন হাসেম ওরফে সজীব (৩৯), তারেক ইব্রাহীম (৩৫), প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহান শাহ আজাদ (৪৩), হাসেম ফুড লিমিটেডের ডিজিএম মামুনুর রশিদ (৫৩) ও এডমিন প্রধান সালাউদ্দিন (৩০)। নারায়ণগঞ্জ কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক আসাদুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
গত ১০শে জুলাই গ্রেপ্তার হওয়া ৮ জনকে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফাহমিদা খাতুনের আদালতে হাজির করে ১০ দিন করে রিমান্ডের আবেদন করলে আদালত প্রত্যেকের ৪ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
উল্লেখ্য, গত ৮ জুলাই সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টার দিকে রূপগঞ্জ উপজেলার কর্ণগোপ এলাকায় অবস্থিত সেজান জুস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের ১৮টি ইউনিটের চেষ্টায় ২৯ ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এ ঘটনায় অন্তত ৫২ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। এখনো বেশ কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন।
এরশাদের জাতীয় পার্টিতে গৃহবিবাদ তুঙ্গে, মা-ভাইদের নিয়ে নতুন কমিটি দিলেন এরিক এরশাদ
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টিতে গৃহবিবাদ আরেক দফা বাড়লো। এরশাদের মৃত্যুর দ্বিতীয় বার্ষিকীতে তাঁর পুত্র এরিক এরশাদ জাতীয় পার্টির নতুন কমিটি ঘোষণা করেছেন। এতে এরশাদের স্ত্রী সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদকে চেয়ারম্যান করা হয়েছে। কো-চেয়ারম্যান করা হয়েছে এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশা সিদ্দিক এবং এরশাদের ছেলে সংসদ সদস্য রাহগীর আল মাহি সাদকে। আর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হয়েছে এরশাদ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান কাজী মামুনুর রশীদকে।
বুধবার রাজধানীর বারিধারায় এরশাদের বাড়ি প্রেসিডেন্ট পার্কে এই নতুন কমিটির ঘোষণা দেন এরশাদ ও বিদিশার ছেলে এরিক এরশাদ। এরশাদের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠিত মিলাদ মাহফিল শেষে এই কমিটি ঘোষণা করা হয়।
এই কমিটি প্রসঙ্গে প্রতিক্রিয়ায় এরশাদের ছোট ভাই জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘রাজনৈতিক দল করার অধিকার সবারই আছে, তবে একসঙ্গে দুটি দল করা যায় না। এ ছাড়া দল করতে হলে নির্বাচন কমিশন থেকে নিবন্ধনও নিতে হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘কে, কাকে, কী ঘোষণা দিয়েছে তা জানি না। যে কেউ যেকোনো ঘোষণা দিতে পারে।’
এরশাদের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট পার্কের অনুষ্ঠানের ব্যানারে প্রধান অতিথি হিসেবে রওশন এরশাদের নাম লেখা থাকলেও তিনি উপস্থিত ছিলেন না। এরিক বলেন, ‘আমার বাবা যখন অসুস্থ, তখন রাতে আমার বাবাকে জিম্মি করে আমার চাচা জি এম কাদের দলের চেয়ারম্যান পদ লিখেয়ে নিয়েছেন। জাতীয় পার্টি আজ ধ্বংসের মুখে। তিনি অবৈধভাবে চেয়ারম্যান পদটি নিয়েছেন আমরা তাকে মানি না।’
এরশাদের মৃত্যুবার্ষিকীর মিলাদ মাহফিলে রওশন উপস্থিত না থাকলেও তার ছেলে সাদ এরশাদ ছিলেন। এ ছাড়া এরিকের মা বিদিশাও ছিলেন। জাতীয় পার্টিকে ‘জঞ্জালমুক্ত’ করার কথা উল্লেখ করে সাদ এরশাদ বলেন, ‘বেশি পলিটিক্যাল কথা বলতে আসিনি। আজ আমার আব্বার মৃত্যুবার্ষিকী। সবাই আমাদের দলের প্রতিষ্ঠার জন্য দোয়া করবেন। আমার আম্মা বিরোধীদলীয় নেতা, উনার বয়স হয়েছে। উনার জন্য দোয়া করবেন। আজকে আসতে পারেননি।’
মিলাদ মাহফিলে জাতীয় পার্টির বর্তমান চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদেরকে ‘অবৈধ’ দাবি করে এরিক বলেন, ‘তার কাছ থেকে দলকে বাঁচাতে হবে। আমার মা রওশন এরশাদকে পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে এবং কো-চেয়ারম্যান হিসেবে আরেক মা বিদিশা এরশাদ ও ভাই রহগীর আল মাহি সাদ ওরফে সাদ এরশাদের নাম ঘোষণা করছি। আর দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে ঘোষণা করছি এরশাদ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান কাজী মামুনুর রশীদের নাম।’
এরিকের এই ঘোষণার সময় তার পিঠ চাপড়ে উৎসাহ দেন বিদিশা। তিনি বলেন, ‘এরিকের প্রস্তাবিত নতুন কমিটি কাজ শুরু করবে। আমার দুই ছেলে সাদ ও এরিককে নিয়ে এরশাদের স্বপ্নের দেশ গড়তে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করব আমরা।’
এইচ এম এরশাদের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এই আলোচনা সভা ও মিলাদ মাহফিলে জাতীয় পার্টির সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য দেলোয়ার হোসেন খানও উপস্থিতি ছিলেন।
পাকিস্তানে চীনা ইঞ্জিনিয়ার বহনকারী বাসে বোমা, সৈন্যসহ নিহত ১৩
পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলে কোহিস্তানে নামে একটি শহরে চীনা ইঞ্জিনিয়ার বহনকারী একটি বাসে বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় দেশটির সৈন্যসহ ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিবিসি এ তথ্য জানিয়েছে।
খবরে বলা হয়, কোহিস্তানে একটি বাস যাত্রী নিয়ে সেখানকার একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে যাচ্ছিল। বাসটিতে কয়েকজন চীনা প্রকৌশলী ছিলেন। এ ছাড়া দেশটির দুজন সেনা ছিলেন। বোমা হামলায় ৯ চীনা নাগরিক এবং ওই দুই পাক সেনা নিহত হয়েছেন। মোট ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে সেখানে।
বোমা হামলার ঘটনায় নিজ দেশের নাগরিকের মৃত্যুতে নিন্দা জানিয়েছে চীন সরকার। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রদের মধ্যে একজন ঝাও লিজিয়ান জানান, পাকিস্তান এ হামলার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি এবং সে দেশে চীনা নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে বলে তারা আশা করেন।
পাকিস্তান সরকারের এক মুখপাত্র এ হামলাকে কাপুরুষোচিত বলে বর্ণনা করেছেন।
বোমা হামলার ঘটনার পর হামলাস্থল নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে পুলিশ। তবে, এখন পর্যন্ত বোমাটি কীভাবে বিস্ফোরণ হয়েছে তা নির্ণয় করতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা। বোমাটি রাস্তার পাশে পেতে রাখা হয়েছিল, না কি বাসের মধ্যেই ছিল তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পাকিস্তানী কর্মকর্তারা বলছেন, বিস্ফোরণের পর বাসটি রাস্তার পাশে খাদে পড়ে যায়। বাসটিতে কয়েক ডজন যাত্রীর মধ্যে চীনা প্রকৌশলীরাও ছিলেন যারা কোহিস্তানের ঐ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করতেন।
রাজধানীতে ডিবি পরিচয়ে ডাকাতি, গ্রেপ্তার ৪ ডাকাত রিমান্ডে
রাজধানীতে ডিবি পরিচয়ে ডাকাতি করে আসা চার ডাকাতের দুই দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। বুধবার ঢাকা মহানগর হাকিম রাজেশ চৌধুরী এ রিমান্ডের আদেশ দেন।
রিমান্ডে যাওয়া আসামিরা হলেন- জাহিদ হাসান ওরফে রেজাউল, মানিক ব্যাপারী ওরফে দারোগা মানিক, ফারুক হোসেন ওরফে নাসির উদ্দিন ও রুবেল সিকদার ওরফে রুস্তম। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির তেজগাঁও জোনাল টিমের পরিদর্শক মাহবুবুল হক আসামিদের আদালতে হাজির করে ডাকাতির প্রস্তুতির মামলায় প্রত্যেকের সাত দিন করে রিমান্ড আবেদন করেন। এছাড়া অস্ত্র আইনের মামলায় আসামি মানিক বেপারীর আরও সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন।
শুনানি শেষে আদালত ডাকাতির প্রস্তুতির মামলায় প্রত্যেকের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তবে খেলনা পিস্তল হওয়ায় অস্ত্র মামলায় মানিকের রিমান্ড আবেদন নামঞ্জুর করেন আদালত। শুনানিকালে আসামিদের পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না।
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার বসিলা এলাকায় অস্ত্র ও পুলিশের সরঞ্জামসহ ডিবির জ্যাকেট পরে চেকপোস্টের মাধ্যমে ডাকাতি করার প্রস্তুতিকালে তাদের গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ডিবির তেজগাঁও জোনাল টিম। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি বন্দুক, একটি চাপাতি, দুটি ছোরা, তিনটি ডিবি লেখা জ্যাকেট, একটি খেলনা পিস্তল ও কভার, একটি ওয়্যারলেস সেট, সেলাইরেঞ্চ চাবি ও এক জোড়া হ্যান্ডকাফসহ নগদ এক লাখ ৮০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। পরে তাদের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় মামলা দায়ের করা হয়।









