ঢাকা   , ,     

সর্বশেষ সংবাদ

শ্রম আইনের কয়েকটি ধারার বৈধতা জানতে রুল জারি করেছে হাইকোর্ট

বেসরকারি খাতের ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক ও তদারকি পদে নিযুক্ত ব্যক্তিদের “মালিক” হিসেবে গণ্য করে “শ্রমিক”-এর সংজ্ঞা থেকে বাদ দিয়ে তাদেরকে শ্রম আইনের সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করা কেন সংবিধানের  মৌলিক অধিকার পরিপন্থী এবং বাতিল ঘোষণা করা হবে না জানতে চেয়ে হাইকোর্টের রুল।
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ২(৪৯)(খ) এবং ধারা ২(৬৫)-এর শর্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিটের (Writ Petition No. 10819 of 2026) পরিপ্রেক্ষিতে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। রোববার (২৩ আগস্ট ২০২৬) বিচারপতি আহমেদ সোহেল এবং বিচারপতি এস. এম. ইফতেখার উদ্দিন মাহামুদ এর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালত রুল জারি করে সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের আগামী ৪ সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।

রুলে বিবাদীদের প্রতি জানতে চাওয়া হয়েছে, কেন ধারা ২(৪৯)(খ) এবং ধারা ২(৬৫)-এর শর্ত, যার মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনামূলক, প্রশাসনিক বা তদারকির দায়িত্বে লিখিতভাবে নিযুক্ত ব্যক্তিদের “মালিক” হিসেবে গণ্য করে “শ্রমিক”-এর সংজ্ঞা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তা সংবিধানের ৭, ২৭, ২৮, ৩১, ৩২ ও ৪৪ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বেআইনি ঘোষণা করা হবে না।

আবেদনে বলা হয়েছে, উক্ত বিধানের মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনামূলক, প্রশাসনিক বা তদারকির দায়িত্বে লিখিতভাবে নিযুক্ত ব্যক্তিদের “মালিক” হিসেবে গণ্য করে “শ্রমিক”-এর সংজ্ঞা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যার ফলে তারা শ্রম আইনের অধীন কোন ধরনের আইনি সুরক্ষা, সুবিধা, প্রাপ্তি ও প্রতিকার থেকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন।

আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ ও ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৬৫ থেকে ৮০ লাখ বেসরকারি খাতের কর্মী এই বিধানের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, যা দেশের মোট কর্মশক্তির ১০ শতাংশেরও বেশি। রিট আবেদনকারীগন বলছেন, এত বিশাল সংখ্যক নাগরিককে এভাবে আইনি সুরক্ষার বাইরে রাখা সাংবিধানিক মৌলিক অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

আবেদনে বলা হয়েছে, সংবিধানের ২৭, ২৮, ৩১ ও ৪৪ অনুচ্ছেদের আলোকে আইনের সমান সুরক্ষা ও আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। এই বিধানের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির বেসরকারি কর্ম কর্মজীবীকে  শ্রম আদালতের এখতিয়ারের বাইরে রেখে দেওয়া হয়েছে, ফলে তারা তাদের চাকরি সংক্রান্ত অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কোনো উপযুক্ত ফোরামই খুঁজে পাচ্ছেন না।

আদালতে রিট আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব এবং তাকে সহযোগিতা করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ কাওছার, মাকসুদুর রহমান এবং মারুফ হাসান তমাল।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ ও ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৬৫ থেকে ৮০ লাখ বেসরকারি খাতের কর্মী যা দেশের মোট কর্মশক্তির ১০ শতাংশেরও বেশি, এই বিধানের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে রিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

রুল চূড়ান্তভাবে মঞ্জুর হলে ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক ও তদারকি পদের বেসরকারি কর্মজীবীরা যেসব সুফল পেতে পারেন:-
আইনজীবীরা বলছেন, রুল যদি চূড়ান্তভাবে (absolute) মঞ্জুর হয় এবং আদালত শ্রম আইনের ধারা ২(৪৯)(খ) ও ধারা ২(৬৫)-এর শর্ত অবৈধ ঘোষণা করেন, তাহলে বেসরকারি খাতের প্রায় ৬৫-৮০ লাখ ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক ও তদারকি পদে চাকুরীরত কর্মজীবীগন নিম্নলিখিত সুরক্ষা ও সুবিধাগুলো পাবেন:
•কর্মঘণ্টা ও ওভারটাইম: শ্রম আইনের চতুর্থ অধ্যায় অনুযায়ী দৈনিক ও সাপ্তাহিক সর্বোচ্চ কর্মঘণ্টার সীমা এবং নির্ধারিত হারে ওভারটাইম ভাতা পাওয়ার আইনি অধিকার পুনর্বহাল হবে, যা বর্তমানে এই শ্রেণির কর্মীদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
ছুটি ও অবকাশ সুবিধা: বার্ষিক ছুটি (সবেতন), উৎসব ছুটি, নৈমিত্তিক ছুটি, অসুস্থতাজনিত ছুটি এবং সাপ্তাহিক ছুটির আইনি নিশ্চয়তা ফিরে পাবেন, যা বর্তমানে সম্পূর্ণভাবে নিয়োগকর্তার একতরফা সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
চাকরিচ্যুতি ও ক্ষতিপূরণ সুরক্ষা: অন্যায্য বরখাস্ত বা ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষা, যথাযথ নোটিশ পিরিয়ড, চাকরির স্থায়িত্বের ভিত্তিতে গ্র্যাচুইটি ও ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির অধিকার পুনরুদ্ধার হবে।
মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা: নারী ব্যবস্থাপক, প্রশাসনিক ও তদারকি কর্মীরা সবেতন মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং সংশ্লিষ্ট সুরক্ষা আইনগতভাবে পুনরায় দাবি করতে পারবেন।
•বিরোধ নিষ্পত্তির উপযুক্ত ফোরাম: শ্রম আদালত ও শিল্প ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়েরের অধিকার ফিরে পাবেন — যেখানে কোনো কোর্ট ফি লাগে না, বিচারক-শ্রমিক প্রতিনিধি-মালিক প্রতিনিধির ত্রিপক্ষীয় কাঠামোয় বিরোধ দ্রুত ও বিশেষজ্ঞভাবে নিষ্পত্তি হয় — যা সাধারণ দেওয়ানি আদালতের তুলনায় ঢের সহজলভ্য ও কম ব্যয়বহুল।
প্রভিডেন্ট ফান্ড ও কল্যাণ তহবিল সুবিধা: প্রতিষ্ঠানের প্রভিডেন্ট ফান্ড, কল্যাণ তহবিল এবং শ্রম আইনের অধীন অন্যান্য আর্থিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের বৈধ অধিকার নিশ্চিত হবে।

পোশাক, ব্যাংকিং, টেলিকম, ওষুধসহ ব্যাপক খাতে প্রভাব: তৈরি পোশাক খাতের ফ্লোর সুপারভাইজার ও কোয়ালিটি কন্ট্রোলার থেকে শুরু করে ব্যাংকিং খাতের মধ্যম সারির কর্মকর্তা, টেলিকম ও ওষুধ শিল্পের প্রশাসনিক কর্মী — এই রায়ের সুফল ছড়িয়ে পড়বে দেশের প্রায় প্রতিটি বেসরকারি খাতে, বিশেষত যারা লিখিত পদবি পেলেও প্রকৃতপক্ষে প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রাখেন না।

এ প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব এবং ব্যারিস্টার মোহাম্মদ কাওছার বলেন, “অত্র মামলার বিষয়টি দেশের বেসরকারি কর্মজীবীদের আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বেসরকারি খাতের লাখ লাখ ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক ও তদারকি কর্মজীবী— যারা প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিকানার কোনো অংশীদার নন, অথচ নিছক একটি লিখিত পদবির কারণে তাদের সমস্ত শ্রম অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন — তাদের জন্য এটি আশার আলো। রুল চূড়ান্তভাবে মঞ্জুর হলে এই বিশাল কর্মীগোষ্ঠী কর্মঘণ্টা, ছুটি, চাকরিচ্যুতি সুরক্ষা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা এবং সর্বোপরি শ্রম আদালতে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার পাবেন।”
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ কাওছার, এডভোকেট বায়েজিদ হোসেন, অ্যাডভোকেট রাসেল হোসেন, অ্যাডভোকেট মো. মাকসুদুর রহমান এবং অ্যাডভোকেট মারুফ হাসান তমাল যৌথভাবে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ২(৪৯)(খ) এবং ধারা ২(৬৫)-এর শর্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট বিভাগে জনস্বার্থে রিটটি দায়ের করেন ।
বিগত ৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব এবং কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) প্রধান পরিদর্শককে বিবাদী করে রিট পিটিশনটি দায়ের করা হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সবচেয়ে আলোচিত