অর্থনীতির প্রাণশক্তি হলো আস্থা। ব্যবসায়ীরা যখন ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী থাকেন, তখন তারা নতুন কারখানা গড়েন, বিনিয়োগ করেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন। বিপরীতে, যখন অনিশ্চয়তা বাড়ে, তখন অর্থনীতির চাকা ধীর হয়ে যায়। আজ বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে তাকালে এমনই এক বাস্তবতা চোখে পড়ে। বাজারে অর্থের প্রবাহ কমেছে, নতুন বিনিয়োগের গতি শ্লথ, শিল্পকারখানার সম্প্রসারণ থমকে আছে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক শিল্প কারখানা। এই পরিস্থিতি কেবল ব্যবসায়ীদের সংকট নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্যও একটি গুরুতর সতর্কবার্তা।
বাংলাদেশ গত দুই দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এক উল্লেখযোগ্য যাত্রা অতিক্রম করেছে। তৈরি পোশাক শিল্প, প্রবাসী আয়, কৃষি উৎপাদন এবং বেসরকারি খাতের উদ্যোগ দেশের উন্নয়নের ভিত্তি শক্তিশালী করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই গতিতে দৃশ্যমান ভাটা পড়েছে। ব্যবসায়ীদের বড় একটি অংশ নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী নন। অনেকেই বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখাকেই এখন প্রধান লক্ষ্য হিসেবে দেখছেন।
এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। মানুষ এখন বিলাসী বা অপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার পরিবর্তে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসেই ব্যয় সীমাবদ্ধ রাখছেন। ফলে বাজারে চাহিদা কমে যাচ্ছে। চাহিদা কমলে উৎপাদন কমে, উৎপাদন কমলে বিনিয়োগও কমে—এটাই অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়ম।
ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার ব্যবসায়ীদের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন শিল্প স্থাপন কিংবা ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন অপরিহার্য। কিন্তু ঋণের ব্যয় বেড়ে গেলে উদ্যোক্তারা স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকি নিতে চান না। অন্যদিকে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন, কারণ তাদের পুঁজি সীমিত এবং বিকল্প অর্থায়নের সুযোগও কম।
বৈদেশিক মুদ্রার বাজারের চাপও ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কাঁচামাল আমদানিতে জটিলতা, এলসি খোলার সমস্যা এবং ডলারের উচ্চমূল্য উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। ফলে রপ্তানি খাতেও চাপ তৈরি হচ্ছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ শিল্প উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ খাতে সামান্য অনিশ্চয়তাও উৎপাদন ব্যাহত করে, ব্যয় বাড়ায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কমিয়ে দেয়। বিদেশি ক্রেতারা সময়মতো পণ্য না পেলে বিকল্প উৎস খুঁজে নেন। একবার বাজার হারালে তা পুনরুদ্ধার করা সহজ নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিনিয়োগকারীদের আস্থা। একজন উদ্যোক্তা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করেন। তিনি জানতে চান, আগামী কয়েক বছরে নীতিগত পরিবেশ কেমন থাকবে, করনীতি পরিবর্তিত হবে কি না, জ্বালানির দাম স্থিতিশীল থাকবে কি না এবং ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে অপ্রত্যাশিত ঝুঁকি কতটা থাকবে। যখন এসব বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই বিনিয়োগের গতি কমে যায়।
ব্যবসায় স্থবিরতার সরাসরি প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থানের ওপর। নতুন শিল্প না হলে নতুন চাকরিও সৃষ্টি হয় না। অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন নিয়োগ বন্ধ রেখেছে। কোথাও কোথাও কর্মী ছাঁটাইও হচ্ছে। এর প্রভাব বিশেষ করে তরুণদের ওপর বেশি পড়ে। কর্মসংস্থান সংকুচিত হলে সামাজিক অস্থিরতা ও হতাশাও বাড়তে পারে।
তবে সংকট যত গভীরই হোক, সমাধানের পথও রয়েছে। প্রথমত, নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবসায়ীরা যেন দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পনা করতে পারেন, সে পরিবেশ সৃষ্টি জরুরি। দ্বিতীয়ত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে। তৃতীয়ত, উৎপাদনমুখী শিল্পের জন্য ঋণপ্রাপ্তি সহজ ও ব্যয়সাশ্রয়ী করতে হবে। চতুর্থত, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা এবং আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমাতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অবকাঠামো খাতে নির্ভরযোগ্য সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এখানকার উদ্যোক্তারা। নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তারা দেশের শিল্পায়নকে এগিয়ে নিয়েছেন। সেই উদ্যোক্তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারলে অর্থনীতির চাকা আবারও গতি পাবে। কারণ সরকারি ব্যয় দিয়ে একটি অর্থনীতি দীর্ঘদিন সচল রাখা যায় না; টেকসই প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হলো বেসরকারি বিনিয়োগ।
<span;>অর্থনীতির ভাষায় একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ—Confidence breeds investment, and investment creates growth. অর্থাৎ আস্থা বিনিয়োগ সৃষ্টি করে, আর বিনিয়োগ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে তোলে। তাই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আস্থার পরিবেশ পুনর্গঠন।
ব্যবসা-বাণিজ্যের বর্তমান স্থবিরতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে তার প্রভাব রাজস্ব আদায়, কর্মসংস্থান, শিল্পোৎপাদন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর পড়বে। তাই সময় থাকতেই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসায়ী সমাজ—সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কারণ ব্যবসা বাঁচলে কর্মসংস্থান বাঁচবে, কর্মসংস্থান বাঁচলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, আর সেই পথ ধরেই অর্থনীতি আবার নতুন গতিতে এগিয়ে যাবে।

